ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ভাস্কর্য শিল্পকলায় পৃথিবীর আদিমতম একটি অধ্যায় । আদিব যুগ থেকেই শিল্পকর্মের পিপাসুদের অনেকেই এই ভাস্কর্য শিল্পের সাথে জড়িত ছিল আজ ও আছে । মাঝে মাঝেই আমাদের দেশে বিভিন্ন ভাস্কর্য নিয়ে নানা ধরনের বিতর্কের জন্ম হয় যা পরবর্তীতে যা তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আন্দোলনে পরিনত করার চেষ্টা করে দেশের কিছু ইসলাম পন্থি রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তি। সম্প্রতি আমাদের সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের সামনের চত্বরে একটি ভাস্কর্য নিয়ে তেমন কিছু বির্তকের জন্ম দিয়ে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের পায়তারা করছে হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কিছু ইসলাম পন্থি রাজনৈতিক দল।

হাইকোর্টের সামনের স্হাপিত ভাস্কর্যটি

প্রথমেই একটু পরিস্কার হওয়া দরকার মুর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে আর্দশিক পার্থক্য। ভাস্কর্যের মাধ্যমে একটি গোত্র বর্ণ জাতি বা রাষ্ট্রের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। আর স্বাভাবিক ভাবে আমরা মূর্তি বলতে বুঝি কোন ধর্মের দেবদেবীর প্রতিচ্ছবিকে যাকে ধর্মীয় স্বার্থে বা ধর্মীয় বিশ্বাসে পূজা করা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে স্হাপিত ভাস্কর্যটি হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠিরা মূর্তি বলেই সাধারন মানুষের মাঝে প্রচার করে আসছে সেই সাথে যোগ করেছে গ্রিক দেবীর কথা। সত্যিকারেই কি হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোর দাবি সঠিক? সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে স্হাপিত ভাস্কর্যটি একটু বর্ননা তাহলে দিতেই হয়। শাড়ি পড়া মাথায় লম্বা চুলের এক নারী যার চোখ বাধা এক হাতে দাঁড়িপাল্লা, আরেক হাতে তলোয়ার। এটা আসলেই যে কোন গ্রীক দেবী মূর্তি নয় তার প্রথম প্রমাণই হলো মহিলাটি শাড়ি পড়া কারণ কোন গ্রীক দেবীই শাড়ি পড়েননি। শাড়ি সাধারনত বাঙালি নারীরই পোষাক। লম্বা চুল তাও সাধারণত বাঙালি নারীর মাথায়ই দেখা যায় বেশি । তাই এটা যে কোন গ্রীক দেবীর মূর্তি না এটা তো সত্য। ঐ নারী ভাস্কর্যটির চোখ বাধা অর্থাৎ নিরপেক্ষতার প্রতীক আর এক হাতে আছে দাঁড়িপাল্লা, আরেক হাতে তলোয়ার । তার মনে দাঁড়িপাল্লা ন্যায় বিচারের প্রতীক আর তলোয়ার বিচারের সাজা কার্যকরেরই প্রতীক। অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা ও কিংবা বিচারের প্রতীক হিসেবে তলোয়ারের ছবি দেখা যায়।

আমাদের শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের দেশের ইসলামিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠির এলার্জি অনেক পুরানো। যে কোন আন্তর্জাতিক বিমান কিংবা আন্তর্জাতিক নৌ বন্দরই একটি দেশের প্রবেশের সিংহদ্বার । তাই ঐ সব স্হানে নির্মাণ করা হয় যে দেশের শিল্প সাংস্কৃতির নানান প্রতিচিত্র । ফকির লালন শাহসহ অন্যান্য বাউলেরাও ছিলেন আমাদের সাংস্কৃতিরই একটি বড় অংশ। তাই আমাদের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সমানের রাস্তার চত্বরে স্হাপন করা হয়েছিল ’অচিন পাখি’ নামের বাউল ভাস্কর্য । এই ভাস্কর্য নিয়েও উগ্র ইসলাম ধর্মীয় মৌলবাদীদের পেটের ব্যাথা কম ছিল না। অবশেষে আমরা দেখেছি উগ্র ইসলামিক মৌলবাদী গোষ্ঠিরা কিভাবে উঠে পরে লেগেছিলেন এই ভাস্কর্যটি নিশ্চিন্ন করতে। পরে অবশ্য সরকার ইসলামিক মৌলবাদীদের ভয়ে ’অচিন পাখি’ নামের বাউল ভাস্কর্য সরাটে বাধ্যে হয়েছিল। আফগানিস্তানের তালেবানেরাও ধর্মের দোহাই দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল বামিয়ান প্রদেশের দেড় হাজার বছরের বছরের পুরনো জোড়া বুদ্ধমূর্তি। এর আগে আমরা ১৯৯২ সালে দেখেছি ভারতের অযোধ্যায় হিন্দু মৌলবাদীদের তাণ্ডব। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাবরি মসজিদ শুধুমাত্র ধর্মীয় উন্মাদনায় মুহূর্তেই সম্পূর্ণরূপে ধুলিস্যাৎ করে দেয় । বাবরি মসজিদ শুধু মাত্র মুসলামদের একটি মসজিদই ছিলনা এটা ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চিহ্নও ছিল বটে ।

ভাস্কর্য শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মীয় প্রধান দেশেই নয় বিশ্বের অনেক ইসলামিক রাষ্ট্রে ও দেখা যায় এমন সৌদি আরবের মত ইসলামিক রাষ্ট্র যেখানে শরিয়া আইন চালু আছে সেখানেও ভাস্কর্য দেখা যায়। গতবছর সৌদি আরবের ৮৬তম জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের ২১৬ বর্গমিটার উচ্চতার সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি উন্মোচন করা হয়েছে যার নির্মাতা ও সৌদি চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ আসিরি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি হিসেবে সালমানের ছবিটিকে স্বীকৃতি দিতে ইতোমধ্যে গিনেজবুক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে সৌদি শিক্ষা বিভাগ। এছাড়াও ইরান, মিসর, ইরাকের জাদুঘরে অসংখ্য ভাস্কর্য এবং প্রাচীন শাসক ও দেব-দেবীর মূর্তি তো রয়েছেই, সেসব দেশে উন্মুক্ত স্থানে রয়েছে অনেক ভাস্কর্য। অথচ আমদের দেশের তথাকথিত ধর্মীয় নেতাদের এই ভাস্কর্য নিয়ে কত না সমস্যা ।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম জনগোষ্ঠি প্রধান হওয়া সত্যেও আমরা দুর্নীতিতে কতবারই না চ্যাম্পিয়ান হলাম। সুদ-ঘুষ-ধর্ষণ-খুন-ডাকাতি-রাহাজানি-ছিনতাই-জমি দখল কোন অপকর্মটি না হচ্ছে বাংলাদেশে অথচ যারা ধর্মে বিশ্বাসী তাদের সবার জন্যই এই ধরনের কাজগুলি হারাম । অথচ এ ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনোই এই ধরনের সংগঠন বা রাজনৈতক দল টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না। অথচ ভাস্কর্য মঙ্গল শোভাযাত্রা ইত্যাদি নিয়ে তাদের কতই না মাথা ব্যাথা এতে নাকি দেশে ধর্মের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যাবে। আসলে সত্য হলো এটাই এই ধরনের উগ্র মৌলবাদি শক্তি কখনোই আমাদের বাংলাদেশকে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারেনি। তাই আমাদের জোড় দাবি হলো আমাদের আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেমন আছে তা টিকে রাখার জন্য বিভিন্ন শিল্পকর্মও থাকবে।