ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

utpol-das

গত ১০ই অক্টোবর ২০১৭ দুপুরে মায়ের সাথে ফোনে কথা হয় তরুণ সাংবাদিক উৎপল দাসের। বিকেলের পর থেকে আর ফোনটি খোলা পাননি সাংবাদিক উৎপলের মা। আজ পর্যন্ত বন্ধই রয়ে গেছে উৎপলের ব্যবহৃত মুঠো ফোনটি। খোঁজ মিলেনি উৎপলেরও। ২৯ বছর বয়সী উৎপল অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম পূর্বপশ্চিমবিডি নিউজের একজন সিনিয়র সাংবাদিক। হঠাৎ করেই ভর দুপুরে মতিঝিলের অফিস পাড়ার অফিস থেকে বের হয়ে হাওয়ার সাথে মিশে যাবে এক জন তরুণ সাংবাদিক ভাবতেই পুরো মাথা নষ্ট!

এভাবে হাওয়ায় মিশে যাওয়া অর্থাৎ গুম হওয়ার গল্প আমাদের দেশে নতুন নয়। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা, স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকেই শিকার হতে হচ্ছে গুম বা অপহরণের। বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে। অপহরণ কাজে ব্যবহার হচ্ছে কালো কাচের মাইক্রোবাস। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা থেকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কাউকে তুলে নিলে সন্ধান মিলেনা বেশির ভাগেরই। কেউ ভাগ্যক্রমে জীবিত আসলেও বেশির ভাগের লাশ পর্যন্ত মিলেনা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই বছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে ৩২৫ টিরও অধিক গুমের ঘটনা ঘটেছে৷ যদিও আমাদের দেশে গুমের ঘটনা প্রতিটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনামলেই ঘটেছে। নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে প্রতিটি সরকারই গুম অপহরণ ও হত্যাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী শক্তি ও সমালোচকদের মনে ভয়ের সৃষ্টি করতে। আমরা দেখেছি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধিদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাকে হত্যার কি জঘণ্য পরিকল্পনাই না করেছিল! তাতে শেখ হাসিনা প্রাণে বাঁচলেও জীবন দিতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী মিসেস আইভী রহমান সহ ২৫ জন নিরীহ মানুষকে।

ভেবেছিলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসলে ক্ষমতার জন্য সংঘাত অনেকটাই কমবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো তার উল্টো। আওয়ামী লীগ জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য রাষ্ট্রে আবারো মাত্রা পেল গুম অপহরণ। ২০১০ সালের ২৫ জুন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে নিখোঁজ হতে হলো বিএনপি নেতা কমিশনার চৌধুরী আলমকে। এরপর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বনানীর বাসার কাছ থেকে ড্রাইভার আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন সাংসদ এম ইলিয়াস আলী। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে উত্তরার একটি বাসা থেকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি। পরে অবশ্য ভারতের শিলং এ সন্ধান মিলে সালাহউদ্দিন আহমেদের।

একে একে কয়েকশত বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী সহ অনেক সাধারণ মানুষের গুমের খবরই আমাদের জানা। পরিবেশবাদী কর্মী রেজোয়ানার স্বামী আবু বকরক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিভার্জ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর দেশের অন্যতম সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট তানভীর হাসান জোহাও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। তবে সৌভাগ্যক্রমে জীবন নিয়ে ফিরতে পেরে ছিলেন তারা। তবে কে বা কারা কি কারণে তাদের অপহরণ করেছিল তা আজো আমাদের কাছে রয়ে গেছে অজানা।

হোলি আর্টিজানে হামলার পর থেকে কোনো তরুণ নিখোঁজ হলেই মনে শঙ্কা জাগে৷ কিছু দিন পরে তো আবার জঙ্গি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে না! আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এ নিয়ে কিছুটা তৎপর হতে দেখেছি৷ কিন্তু অন্য অনেক নিখোঁজের বেলায়ই আমাদের রাষ্ট্র তথা প্রশাসনের ভূমিকা আমাদের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। সাংবাদিক উৎপল দাসের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের ভূমিকা তেমনি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সেদিন হুট করেই খবর পেলাম টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিখোঁজ উৎপল দাসের সন্ধান মিলেছে। উৎপলের পরিবারের আর্তনাদ বন্ধ হবে ভেবে অনেক আনন্দিত হয়েছিলাম। পরোক্ষণেই সংবাদ মিললো পুরোটাই গুজব, আবারও আশাহত হলাম।

42_Utpal+Das_Journalist+Protest_011117_0006

প্রায় মাস ঘনিয়ে এলে একজন সাংবাদিক নিখোঁজ, পুরো সাংবাদিক সমাজ সহ সমগ্র জাতির বিবেক আজ চিন্তিত, কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এর কোনই কুল কিনারাই করতে পারছেন না। এক্ষেত্রে তদন্তকারী পুলিশ গোয়েন্দাদের আন্তরিকতা, সক্ষমতা সাংবাদিক দাম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যার মতই কিন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এটাও ঠিক, দ্রুততম সময়ে অনেক জটিল রহস্যভেদের বা অপরাধী শনাক্ত করার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশের পুলিশ গোয়েন্দাদের আছে। আমরা বিশ্বাস করি, তারা এই রহস্যও উন্মোচন করতে পারবেন। উৎপল দাস তার মায়ের কোলে বন্ধুদের আড্ডায় অতিদ্রুতই ফিরে আসবেন।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, লেখক ও কলামিস্ট