ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দেশে বর্তমান সময়ে রাজনীতি আর দুর্নীতি একে অপরের সম্পূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি বর্তমান সময়ের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনেকেরই ধরাণা, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা যদি দুর্নীতিতে না জড়ান বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেন, সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের দুর্নীতি প্রায় অধিকাংশই বন্ধ হয়ে যাবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন রাজনীতিবিদরা। তাই মন্ত্রী সাংসদ এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পর্যন্ত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। যদি ধরি একজন মন্ত্রীর কথা কোন একজন মন্ত্রী যদি দুর্নীতি সঙ্গে সম্পৃক্ত না হন সেক্ষেত্রে ঐ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পক্ষে দুর্নীতি করা তেমন সম্ভব হবে না, আর সচিবের পক্ষে যদি দুর্নীতিকরা সম্ভব না হয় তার অধীনস্ত কোন কর্মকর্তা-কর্মচারিরই সাহস হবে না দুর্নীতি করার।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে তাহলে কি আমাদের রাজনীতিতে পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ যারা তারাই আছেন? এক বাক্যেই উত্তর আসেবে, না, আজ আমাদের রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। আমাদের দেশের রাজনীতি আজ কুক্ষিগত হয়ে হয়ে আছে ব্যবসায়ীদের হাতে, হাতেগনা দুই-চার জন পেশাদার রাজনীতিবিদ রাজনীতির সাথে আছেন তারা ও অর্থ বিত্তের লোভে ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ীদের সহযোগীতে পরিণত হয়েছেন। বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী। প্রত্যেক সাংসদই কোটিপতি, কেউ কেউ অতিকায় ধনী। শুধু এবারের সংসদই নয়, বিগত কয়েকটি সংসদেই চিত্র ছিল অভিন্ন। অথচ স্বাধীনতা-পূর্ববর্তীকালের চিত্র পুরোটাই উল্টো। পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ যাঁরা, তাঁরাই নির্বাচন করতেন এবং নির্বাচিত হতেন। সত্তরের নির্বাচনের দিকে লক্ষ্য করেলেই দেখাযায় তখন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনায়ন পাওয়া প্রার্থীরা নানান পেশা থেকেই এসেছিলেন তাদের মধ্যে স্কুলের শিক্ষক পর্যন্ত ছিলেন যারা সবাই পেশাদার রাজনীতিবিদ। ঐ নির্বাচনে ও কিন্তু আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছিল।

বিএনপি কখনোই আদর্শভিত্তিক দল ছিল না। তবু জিয়ার আমলে বেশ কিছু বামপন্থী ও ন্যাপের নেতারা এই দলে যোগদান করেছিলেন। তবে তারা বিএনপিতে এসে নীতিগতভাবে পরাজিত হয়েছেন তেমনি পরাজিত হয়েছিলেন আদর্শের কাছে। এরপরও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনীময় দলকে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করে বিশেষ জনসমর্থন আদায়ে স্বার্থক হয়েছিলেন। তার ফলশ্রুতিতে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলটি রাষ্ট্রীয় গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমান নেতৃত্বে আসার পর দলটি তেমন ক্রমাগত ভাবেই রাজনৈতিক আদর্শ থেকে অনেক দুরে সরে যেয়ে দলের ভিতর পেশাগত রাজনীতি বিদদের থেকে প্রাধান্য পেয়েছেন অতিকায় ধনীরা। যাঁরা দেশ, জনগণ, কর্মসূচি, আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে সামান্যতম মাথা ঘামান না।

আওয়ামী লীগের চিত্র ও এর বাহিরে নয় ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তরুণ কর্মীদের মধ্যে একধরনের জাতীয়তাবাদী আদর্শ কাজ করত। তারা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন কিন্তু নীতির কাছে পরাজয় স্বীকার করেনি। তারা ছিলেন পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ। এখন এই দলে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য, যাদের মুখে “বঙ্গবন্ধুর আদর্শ”, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” সহ নানান নীতির কথা শোনা যায় বাস্তবে তারাও রাজনীতিকে নিয়ে রাজনীতি দিয়ে ব্যবসা করছেন। নিজেদের আখের ভালোভাবেই গোছিয়ে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের কোন এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “আমরা রাজনীতিকরা যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকি, তবে দেশের দুর্নীতি অটোমেটিক্যালি অর্ধেক কমে যাবে।” এ বছরের জানুয়ারির প্রথমে ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্ট অনুষ্ঠানে দুদক কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। রাজনীতিবিদরা যদি সত্যিকার অর্থে চান তাহলে যে কোনও মুহূর্তে দুর্নীতি রোধ করা যায়।”

তাই স্বাভাবিকভাবেই বলতে চাই, আজ আমাদের দেশের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যে দুর্নীতির রক্তপ্রবাহিত হচ্ছে তার বিশেষ আশ্রয় ও প্রশ্রয় দাতা ও লাভবান আমাদের দেশের তথাকথিত রাজনীতিবিদরা । কিন্তু রাজনীতি যে আজ আর রাজনীতিবিদদের হাতে নাই এটাও সত্য। রাজনীতির কাণ্ডারি আজ বানিয়ারা। আর এই বানিয়ারাই আজ রাজনীতিকে করে বিকৃত করে সমাজকে করেছে কলুষিত, রাষ্ট্রের কপালে লেপন করেছে কালিমা। তাই দেশের উন্নয়ন ধারাকে এগিয়ে নিতে হলে দরকার দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর সেটি করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই। দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের দিয়ে কখনো দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব নয়।