ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিটিভি তে প্রচারিত সৈয়দ বোরহান কবীর এর উপস্থাপনায় ‘পরিপ্রেক্ষিত’ নামের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠানের কথা আমাদের অনেকেরই মনে আছে। ১৯৯৬-৯৭ এর দিকে ‘পরিপ্রেক্ষিত’ নামের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী কিংবা খুলনার কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের কথা দেশবাসী জানতে পেরেছিল বিটিভি তে প্রচারিত এই ‘পরিপ্রেক্ষিত’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই। যার ফলশ্রুতিতেই সরকার তাদের আইনের অওতায় আনতে পেরেছিল কিংবা জয়নাল হাজারিরা রাজনীতির মূলধারা থেকে ছিটকে পরতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানেও আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট ভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে, সেই সাথে অন্যান সংবাদমাধ্যমও নানান অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে, যার জনপ্রিয়তা মোটেও কম নয়। এসব অনুষ্ঠান দেখে একদিকে আমরা সাধারণ যেমন সতর্ক হতে পারছি, তেমনি সরকার তথা প্রশাসনও অপরাধীদের দমনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে বলে আমার ধারণা।

তথ্য-প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সংশোধনী- ২০১৩ এর ৫৭ ধারা, যা আমাদের স্বাধীন মত প্রকাশের অন্তরায়। তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ দাবি জানিয়ে আসছিল। আর এই দাবির প্রেক্ষিতে সরকার তথ্য-প্রযুক্তি আইনের কালো ধারা ৫৭ বাতিল করলেও ৫৭ ধারার বিষয়গুলিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারটি ধারায় মিলিয়ে দিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ও আতঙ্কের বিষয় হলো, সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮”। এই আইনের ৩২ ধারা দেশ ও জাতির জন্য এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ হিসেবে অপেক্ষায় আছে। এই আইনের ৩২ ধারা নিয়ে দেশের প্রায় প্রতিটি বিবেকবান মানুষই আজ চিন্তিত।

প্রস্তাবিত “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮” এর ৩২ ধারায় বলা হয়েছে “যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।”

জাতি হিসেবে আজ আমাদের কপালের দুর্নীতির তামাকা অনেক পুরোনো। জাতির জনকের সেই ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসা, “সাত কোটি বাঙালির সাড়ে সাত কোটি কম্বল, আমার কম্বল কই?”। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সাত কোটি মানুষের জন্য সাড়ে সাত কোটি কম্বলের ভেতরে নিজের কম্বলখানাই খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোন অপরাধ বা দুর্নীতির জন্য বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ কি জড়িত ছিলো? না কি রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের বেসরকারি দোসররাই জড়িত? কোন দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন দিনই কোন সংবাদ মধ্যমকে সহযোগিতা করবেনা তার দুর্নীতি প্রচারের জন্য। তাই কোন ভাবেই প্রকাশ্যভাবে তাদের কাছ থেকে দুর্নীতির সঠিক তথ্য পাওয়া কি সম্ভব?

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতি করে সরকারি কর্তাব্যক্তিদের পদোন্নতি, বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা পদকে সোনা জালিয়াতি, সরকারি কর্মকর্তার গুনে গুনে ঘুষ খাওরার চিত্র সহ অনেক রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা চোরাকারবারিদের তথ্য জানতে পেরেছি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে, যার পুরোটাই ছিল গোপনে ধারণ করা। শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই না দুনিয়ার কোথাও দুর্নীতিবাজরা তাদের নূন্যতম তথ্য সংবাদ মাধ্যমকে সঠিক ভাবে প্রদান করেছে এমন প্রমাণ নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশেও ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির তথ্য মার্কিনীরা জানতে পেরেছিল ডেমোক্র্যাট দলের সদর দফতরে বাসানো আড়িপাতার যন্ত্রের মাধ্যমেই।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন তৈরি করেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারার রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আইন তৈরি করে থাকেন আমাদের জাতীয় সংসদের সদস্যরা। অথচ তোফায়েল আহমেদের মত এক জন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা ও সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী যখন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য বলতে পেরেছেন যে, “আপনারা গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। এ আইনের বলে এখন হয়তো এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।” তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই এধরনে বির্তকিত আইন দেশের মানুষকে কিছুটা হলে চিন্তিত করে। কারণ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ শুধুমাত্র সাংবাদিক বা সংবাদ মাধ্যমের উপর নামছে না এটা পুরো রাষ্ট্রের স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও বিরাট চ্যালেঞ্জ।

একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকেরই স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আছে। আর পেশাগতভাবে একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব সমাজের সন্ত্রাস দুর্নীতি সহ নানান অবক্ষয় তুলে ধরা। সত্য তুলে ধরার কারণে কারো সম্মানের হানি হলে সেই দায় শুধুমাত্র সন্ত্রাস দুর্নীতি সহ আপকর্মের সাথে জড়িতদের। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য কোন কালো আইন কখনোই কোন সভ্য সমাজ তথা রাষ্ট্রের সভ্য মানুষ মেনে নিতে পারে না। তাই আমরাও চাইবো না কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে ৫৭ ধারা বা ৩২ ধারা যুক্ত কোন কালো আইন প্রণয়ন করে আমাদের সুস্থ স্বাধীন মত প্রকাশের পথ রোধ করা হোক।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, লেখক ও কলামিস্ট।