ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দুর্নীতি সহ যেকোন অপরাধেরই বিচার হবে এটাই এটাই একটা সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোই প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে ‘জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়’ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার ছেলে তারেক রহমান সহ আরো কয়েকজনকে দশ বছর করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড করা হয়। বাংলাদেশে এই প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন সাবেক রাষ্ট্র প্রধানকে দুর্নীতি মামলায় জেলে যেতে হলো। বেগম খালেদা জিয়ার মামলায় রায় নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ নানান সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। একেক জন একেক দৃষ্টিকোন থেকে মন্তব্য করছেন, আর এটাই স্বাভাবিক।

চলিত বছরের শেষ নাগাদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকলে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এটাই সমগ্র দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। ঠিক নির্বাচনী বছরের শুরুতেই বিএনপির মতো একটি শক্তিশালী দলের প্রধানের দুর্নীতি মামলায় সাজা দেশবাসীর মনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে বা আদৌ কোন প্রভাব পরবে কি না এটাই আজ বড় প্রশ্ন?

দুর্নীতি সহ যে কোন অপরাধেরই বিচার সভ্য মানুষের কাম্য। আর বেগম জিয়া যদি এ ধরনের অপরাধ করে থাকেন তাহলে আদালতে তার শাস্তি অবশ্যই সমর্থন যোগ্য। তবে এ বিচার যদি রাজনৈতিক কোন স্বার্থ হাসিলের জন্য হয়ে থাকে তা হলে তা কি আদৌ দেশের কোন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে?

 

 

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলের মাধ্যমে আমরা যতটুকু জানেছি তা হলো, বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ১৯৯১ সালে কুয়েতের আমির সৌদি আরবের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যম প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে এতিমের স্বার্থে রক্ষার জন্য এই অনুদান এসেছিল। প্রধানমন্ত্রীর যে ক্ষমতা আছে সে ক্ষমতা অনুসারে তিনি বাংলাদেশের সকল তহবিল সংরক্ষণ করবেন। ১৯৯৩ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে তিনি একটা ট্রাস্ট গঠন করেন। তার ঠিকানা ছিল তার বাসভবন। ওই তহবিলের টাকা দুই ভাগ করে একভাগ তার দুই পুত্রকে সেটেলার ট্রাস্টি বানিয়ে সেখানে দিলেন।

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০০৯ সালে মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এর মাঝে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদলতের নির্দেশে স্থগিত ছিল।

এই মামলা নিয়ে আমি প্রথমেই বলবো, যেহেতু অনিয়মটি হয়েছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বেগম জিয়ার প্রথম ক্ষমতা ভার গ্রহণের পর, এরপর ১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেন সেই সময়ের মধ্যে কেন তার সরকার ব্যর্থ হয়েছিল উক্ত বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নিতে? কেন ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হলো? যদি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের সেই মামলাই সঠিক হয় তবে কেন অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বিচারকার্য বন্ধ আছে? আর কেনই বা অনেক রাজনৈতিক নেতার মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়?

যেকোন অপরাধীর অপরাধ প্রমান হলে তাকে জেল হাজতে যেতেই হবে সে যেই হউক না কেন। বেগম খালেদা জিয়াও আদালতের রায়ের পর জেলে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর এবং মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার দণ্ড নিয়ে। সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও তারা কিভাবে বহাল তবিয়তে আছেন? আজ বেগম জিয়ার দুর্নীতির মামলার রায়ে আমাদের সাধারণ মানুষের মনে যতটুকু প্রভাব পরার কথা ছিল, আমরা কিন্তু তেমনটি লক্ষ্য করছি না। তার মূল কারণ, বর্তমান আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও যে দুর্নীতি কম হয়েছে তা কিন্তু নয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা সব হারিয়ে পথের ফকির হওয়ার পরও এর কোন বিচার হয়নি। বরং ২০০৯ সালে আওয়ামী জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আাবার ২০১০-২০১১ স্মরণকালেরর সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয় শেয়ার বাজারে, যার বিচার তো দূরের কথা নাম প্রকাশে পরও মূল হোতাদের টিকিটি পর্যন্ত ধরতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সেই সাথে সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, ফার্মাস ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক সহ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক গুলির আর্থিক খাতে যে বড় বড় দুর্নীতির কথা সাধারণ মানুষের মুখে আজ যেভাবে প্রচারিত, তাতে বেগম খালেদা জিয়ার ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের’ ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের মামলায় সাজার বায় অনেকটাই ঢেকে যাবে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাভার গ্রহণের পরই কেমন যেন উদাসীন হয়ে যান। তারা ক্ষমতার দাপটে অনেক কিছুই ভুলে যান। তাবে তাদের স্মরণ রাখা উচিত, ক্ষমতা কারোই চিরস্থায়ী নয়, আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই যে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার মালিক এটাও তারা ভুলে যান। বেগম জিয়া, তার পরিবার ও তার দলের কেউ অন্যায় করলে অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিচার হবে- এটা যেমন আমাদের সাধারণ মানুষের দাবি, সেই সাথে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও যারা আজ বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি সহ নানা অন্যায় অনিয়মে জরিত তাদেরও বিচার দেখতে চাই। তাহলেই প্রমাণিত হবে যে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।