ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

‘কাগজের ফুল’ সিনেমার লোকেশন দেখতে যেয়ে আর ঢাকায় ফেরা হয়নি ‘মাটির ময়না’ খ্যাত চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরের। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই প্রতিভাদ্বয় সহ পাঁচ জন। মর্মান্তিক ঐ সড়ক দুর্ঘটনার পর সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, সাধারণ মানুষ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুর্ঘটনার নামে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। ঐ ঘটনার পরে সবাই ধারণা করেছিলো যে, এরপর থেকে সড়কে এই ধরনের তথাকথিত দুর্ঘটনার হাত থেকে জাতি হয়তো কিছুটা রক্ষা পাবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখালো তার উল্টো চিত্র।

 

 

গত ৩ এপ্রিল কারওয়ান বাজারে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষির এক পর্যায়ে বাস চাপায় ডান হাত হারান কলেজ ছাত্র রাজীব হোসেন। একই সাথে মাথায়ও মারাত্মক আঘাত পান সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী। এরপর দীর্ঘ ১৩ দিন মৃত্যুর সাথে লড়ে হার মানেন রাজীব।

অভাগা কপালধারী রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার ছোট আরো দুটি ভাই রেখে দুনিয়া ত্যাগ করেন প্রিয় মা। স্ত্রীর শোকে তার বাবাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মারা যান ২০১১ সালে, যখন রাজীব আষ্টম শ্রেণির ছাত্র। খালার বাসায় থেকে লেখাপড়া করে নিজের এবং ছোট দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পূরনের পথে হাঁটছিলেন রাজীব। টিউশনি, কম্পিটারের গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ, আর লেখাপড়া- সবই ভালোভাবে চলছিলো রাজীবের। কিন্তু এই পথচলা থমকে গেল একটি মাত্র ‘দুর্ঘটনায়’।

যদিও রাজীবের এই বিয়োগে কান্নার জন্য পৃথিবীতে তার কোন আপনজন নেই, তবুও আমার অনুভব, দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনের ভিতরে রাজীবের জন্য কান্না হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা রাষ্ট্রের পরিচালকদের অন্তরে আদৌ কোন দাগ কেটেছে কিনা কিংবা সাধারণ মানুষের এই চাপা কান্না তাদের অন্তর ছুয়েছে কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

এক রাজীব তো নিজের আর ছোট দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে চলে গেছেন পরোপারে, কিন্তু তথাকথিত এই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিন আরো কতজন রাজীবের স্বপ্ন যে কবরে পাঠায় তার হিসেব কি আছে কারো কাছে? বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে। আর সড়ক মন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ২ হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ২ হাজার ১৩৪ জন। ২০০৯ সালের হিসেবে ৩ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৮ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৮৬ জন আহত হন।

 

 

গত ৫ এপ্রিল ভোরে নিজ চোখেই দেখেছি রাজধানীর চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে বিকাশ পরিবহনের দুই বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। ছয় বছর বয়সী মেয়ের জীবন বাঁচাতে দুই বাসের চাপায় পরে মেরুদণ্ডের হাড় গুড়া গুড়া হয়ে জীবন-মৃত্যুর মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছেন ২৬ বছর বয়সী আয়েশা খাতুন। একই দিনে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মগটুলা এলাকায় ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। বেপরোয়া চালকের নিষ্ঠুরতা ছেলের চোখের সামনে চাকায় পিষ্ট করে মারলো জন্মদাত্রী মাকে। যখন মায়ের শরীরের উপর বাসের চাকা তখন গায়ের সব শক্তি দিয়ে বাসটাকে ঠেলে সরাতে চেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে তুহিন। কিন্তু তুহিনের ব্যর্থ চেষ্টা বাঁচাতে পারেনি মা শিউলি আক্তারকে। আর তুহিনের সেই বাস ঠেলে সরানোর ছবি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল।

গত ১১ এপ্রিল রাজধানীর ফার্মগেটে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে পা হারাতে বসেছেন র‍্যাংগস প্রপার্টিজের অভ্যর্থনাকারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনি আক্তার। আজ যখন রাজীবের দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়ে মন খারাপ তখনই খবরের কাগজে দেখতে হলো গোপালগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক খালিদ হাসান হৃদয়ের হাত হারানোর সংবাদ। কাজ শেষে বাসে করে বাড়ী ফেরার পাথে বাসের পাশ ঘেঁষে বেপরোয়া গতিতে একটি ট্রাক অতিক্রমের সময় হাত হারান হৃদয়। তার ভাগ্যে কি আছে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।

একটি দুর্ঘটনা একটি জীবনের, একটি পরিবারের আজীবনের কান্না। আমি আবারও জোর গলায়ই বলছি, এসব কান্না কখনোই রাষ্ট্রের পরিচালকদের কানে পৌঁছায় না। যদি তারা এই কান্না অনুভবই করতে পারতেন তাহলে সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল লোক কখনোই বলতে পারতেন না যে, কেবল গরু-ছাগল চিনতে পারলেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।

বর্তমান যোগাযোগ মন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পরে মনে পরেছিল ভারতীয় চলচিত্র ‘নায়ক’ এর কথা। হয়তো অনিল কাপুরের মত ওবায়দুল কাদেরও পরিবহন সেক্টরের মাফিয়াদের কালো হাত গুড়িয়ে দিবেন। না, আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এতসব ঘটনা পর তথাকথিত দুর্ঘটনার নামে এত মানুষ খুন করেও রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবহন ব্যবসার মাফিয়ারা বিনা দ্বিধায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। জানিনা আর কত রাজীব খুন হলে, আর কত হৃদয় বা আয়েশা পঙ্গু হলে, আর কত তুহিন মা হারা হলে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? কবে এদেশে সাধারণ মানুষ পরিবহন মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পাবে? সড়ক দুর্ঘটনার নামে চলা এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে কবে?

 

 

পূর্ব প্রকাশিত