ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কোন্‌ দিকে যাচ্ছে এনিয়ে ক্ষমতাসীন ও ২০-দলীয় জোটের মধ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের মূল্যায়ন করছে। ক্ষমতাসীন দল আশা করছে অল্প দিনের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে আর ২০-দলীয় জোট আশা করছে আন্দোলনে মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাসীন দলকে উৎখাত করবে। এই দু’পক্ষের টানাটানিতে ভোগান্তিতে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। দেশের এই রাজনৈতিক অবস্থা দেখে কৈশোরে আমার শালবনে পথ হারিয়ে ফেলার কথা মনে পড়লো। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় সাত-আট কিলোমিটার দূরে ধর্মপুর শালবন।

একবার আমার শখ হলো ধর্মপুর শালবন দেখতে। মাকে বললাম, মা প্রথমে যেতে দিতে রাজি হলো না কিন’ আমাদের গ্রামের কয়েকজন রাখাল প্রায় যাতায়াত করতো, তাদের কয়েকজন যখন মাকে অভয় দিলো এবং আমাকে তারা দেখে রাখবে বলে মা’কে আশ্বস’ করলো তখন মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, যাবি তাহলে?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

আমি তাদের সঙ্গে গেলাম। এক সঙ্গে দশ বারো জনের একদল কিশোর এবং তরুণ। তাদের কাজ জঙ্গল থেকে শালপাতা নিয়ে আসা আর আমি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়ে কিশোর। তারা শালপাতার অবস’া জানে তাই এক জায়গায় এতো শালপাতা পাওয়া যাবে না জেনে তার দু’টি দলে ভাগ হলো।
আমি যে দলের সঙ্গে থাকলাম সে দলে যে নের্তৃত্ব দিচ্ছিলো তার তুলনামূলকভাবে জঙ্গলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কম। নাম আনারুল। আর আপর দলের নেতা বেশ ঝানু, তার জঙ্গলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক। নাম বেলাল।

সবাই তাদের পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়লো আর আমি তাদের সঙ্গে জঙ্গল ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। অনেকক্ষণ পর যখন আমরা জঙ্গল থেকে বের হবো তখন দূপুর গড়িয়ে গেছে। কিন’ জঙ্গল থেকে বের হতে গিয়ে পড়লাম বিপত্তিতে। আমাদের দল নেতা আমাদের যেভাবে পথ দেখিয়ে দিচ্ছিলো আমরা সেভাবে তাকে অনূসরণ করছিলাম। কিন’ প্রায় এক ঘণ্টা তাকে অনূসরণ করার পরও আমরা জঙ্গল থেকে বের হতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত আনারুল আমাকে জিজ্ঞেস করলো, দুলাল (আমার ডাক নাম দুলাল), তুই তো ভালো ছাত্র, তুই একটু দেখ না উত্তর কোন্‌ দিকে?
আমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে একদিক দেখিয়ে দিলাম। আমাদের উত্তর দিকে বের হওয়ার কথা। কিন’ আমরা অনেকক্ষণ উত্তর দিকে হাঁটার পরও জঙ্গল থেকে বের হতেই পারলাম না।
তখন আনারুল বললো, নাহ্‌, তুই যেটাকে উত্তর দিক বলছিস্‌। সেটা আসলে উত্তর দিক না। আমি কয়েকবার সূর্যের দিকে তাকালাম কিন’ উত্তর দিকে বুঝতে পারলাম না।

এরপর শুরু হলো আবার আনারুলের পথ অনূসরণ করা। কিন’ কোনো লাভ হলো না। আনারুলের দেখানো পথেও আমরা জঙ্গল থেকে বের হতে পারলাম না। আমার তখন প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। শুধু আমার না, আসলে সবাই তখন যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমরা এক জায়গায় বসলাম, দূপুরে খাওয়ার জন্য কেউ চাউল ভাজা, কেউ মুড়ি নিয়ে এসেছিলো সেগুলো খেতে শুরু করলাম। আমিও তখন অনেকটা চিন্তিত। সবার মধ্যে তখন একটা অজানা আশঙ্কা, এই জঙ্গল থেকে আমরা বের হবো কীভাবে?

এমনসময় বেলালের ডাক আমাদের কানে ভেসে এলো। বেলাল আনারুলের নাম ধরে ডাকছে, আনারুল। বেলালের ডাক শুনে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো, এবার আমরা জঙ্গল থেকে বের হতে পারবো।

বেলাল জোরে জোরে আনারুলের নাম ধরে ডাকলো, আনারুল।

আনারুল বেলালের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের অবস্থান জানালো। একসময় আমরা আবার দু’টি দল একসঙ্গে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলাম।
দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও এখন অনেকটা জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলার মতো। ক্ষমতাসীন দল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় বিরোধীদের দমনের কৌশল অবলম্বন করেছে আর বিরোধীরা সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য আন্দোলন করছে। এসবের শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, অর্থনীতি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ। দেশে এখন এমন একজন মানুষ প্রয়োজন যে বেলালের মতো সঠিক পথ দেখাবে। গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার বলে চিৎকার করতে করতে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঁচু করে এগিয়ে আসবে আর জনগণ তার সঙ্গে সঙ্গে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলে সমর্থন দিবে। দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার।
সমাপ্ত।