ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

সোমা (ছদ্মনাম) চলচ্চিত্র জগতে এসেছে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। দু একটি কাজও করেছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ৫ বছরে লক্ষ্য অনুযায়ী এগুতে পারেনি। কেন? তার জবানিতে কাজের যথেষ্ট প্রস্তাব আসছে। কিন্তু প্রথমেই জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষ শর্ত মনোরঞ্জন করতে হবে। প্রস্তাবটি একেবারেই অনৈতিক। নিজের যোগ্যতা দিয়ে শিল্পী হব। কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেব। এটিই তো নিয়ম। কিন্তু এ ধরনের প্রস্তাব কেন? ব্যাপারটি মানতে পারিনি বলেই স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে।

মিথিলা (ছদ্মনাম) সে মোটামুটি অনেকগুলো কাজ করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। তার কথায় প্রথম প্রথম আমার কাছেও এ ধরনের প্রস্তাব আসত। কিন্তু কৌশলে কাটিয়ে গিয়েছি। তারপরও যে একেবারেই রক্ষা পেয়েছি তা কিন্তু নয়। দেখা গেছে সিকোয়েন্স বুঝিয়ে দেওয়া, মেকআপ করানো, পোশাক ঠিক করার নাম করে কিংবা অভিনয়ের সময় সহশিল্পী শরীরে কৌশলে হাত দিয়েছে। করার কিছুই থাকে না। প্রতিবাদ করতে গেলে কাজ থেকে বাদ পড়তে হবে। এখন এগুলো সহনীয় হয়ে গেছে। সব কিছু মেনে নিয়েই নিজেকে যতটুকু বাঁচানো যায় কৌশলে তাই করে যাচ্ছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র মহিলা শিল্পী বলেন, আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে শুধু চলচ্চিত্র জগৎ কেন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই মেয়েরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। তারা প্রতিবাদ করতে পারে না মূলত দুটি কারণে মানসম্মানের ভয় ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আইনের দ্বারস্থ হতে না পারায়। এ বিষয়ে এডভোকেট এলিনা খান বলেন, এটি সত্য, যারা চলচ্চিত্রে নতুন কাজ করতে আসে তাদের নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। পুরনোদের সুবিধা হচ্ছে তাদের পায়ের নিচে শক্ত মাটি। নতুনরা প্রতিবাদ করতে পারে না দুটি কারণে। মান-সম্মান হারানোর ভয় ও সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে। কিন্তু নতুন শিল্পীরা যদি সাহস করে প্রতিবাদ করে এবং মনে করে যোগ্যতার বলে প্রতিষ্ঠা পাবে তাহলে হয়তো তাদের প্রতি এ ধরনের আচরণ কমে আসবে। আসলে ভিকটিমরা এগোয় না তখনই যখন দেখে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব যৌন হয়রানি ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে। এর শাস্তি সর্বোচ্চ দশ বছরের জেল।

তিনি আরও জানান, শিশু ও নারী নির্যাতন আইন ২০০৩ অনুযায়ী যৌন হয়রানি দু ধরনের। সরাসরি ও ইশারা-ইঙ্গিতে। সরাসরির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সাত বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল। আর ইশারা-ইঙ্গিত অর্থাৎ গায়ে হাত দেওয়া, চোখ দিয়ে ইশারা করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাই এ আইন সম্পর্কে মেয়েদের জানা দরকার এবং প্রতিবাদী হওয়া উচিত। তাহলে এসব অপরাধ দ্রুত কমবে।

চলচ্চিত্র পরিচালক নার্গিস আক্তার বলেন, নতুন নায়িকাদের এ অভিযোগ মানতে নারাজ। কারণ যারা এসবের শিকার হয় তারা সম্মতিতেই করে। এসব মেয়ে যদি শিল্পী হতে আসে তাহলে তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই টিকে থাকবে। এসব করতে যাবে কেন। ১০ বছর ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছি, আমার ইউনিটে কখনো তো এসব হয়নি। তবুও বলব শুধু চলচ্চিত্র কেন কোথাও এসব অনৈতিক কাজ হওয়া উচিত নয়।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার শহীদুল ইসলাম খোকন বলেন, ভালো-খারাপ মানুষ সব পেশায়ই আছে। স্কুল শিক্ষকও অনৈতিক কাজ করে। যেসব নতুন নায়িকা কাজ করতে এসে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়ছে তাদের উচিত ভালো এবং প্রকৃত নির্মাতার কাছে যাওয়া। কারণ সে যদি সৎ ও দক্ষ হয় তবে নিজগুণেই প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন মুখ উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রকার ক্যাপ্টেন এহতেশামের পর আমার অবস্থান। আমাদের ইউনিটের বিরুদ্ধে তো আজ পর্যন্ত কেউ এ ধরনের অভিযোগ আনতে পারেনি। একজন প্রকৃত নির্মাতা চাইবে পারফরম্যান্স, অন্যকিছু নয়।

চলচ্চিত্রকার সোহানুর রহমান সোহান বলেন, একটা কথা আছে নিজে ভালো তো জগৎ ভালো। কেউ বাজে প্রস্তাব দিলে গ্রহণ করতে হবে কেন? আসলে যারা যোগ্যতা দেখাতে পারে না তাদের দুর্বলতার কারণে হয়তো কেউ এ ধরনের সুযোগ নেয়। পরে নিজের দুর্বলতা ঢাকতে নির্মাতা বা অন্য কারও ওপর দোষ চাপায়। মৌসুমী, শাবনূর, পপি, পূর্ণিমা কি নিজের যোগ্যতা দিয়ে প্রতিষ্ঠা পায়নি? তারা কি কখনো এ ধরনের অভিযোগ করেছে। তারপরও বলব, কেউই যেন এ ধরনের অপ্রীতিকর অবস্থার
মুখে না পড়ে।