ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

পর পর চতুর্থ দিনের মত ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। রাস্তা অবরোধ সহ নানাভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন তাঁরা; কিছু ক্ষেত্রে ‘সহিংস’ আচরণও দেখাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের দাবীকে অন্যায্য বলছেন গার্মেন্টস মালিকেরা, আবার তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেকে তাঁদের ন্যায্য দাবীর প্রতি সমর্থন জানালেও এই ‘সহিংস’ আচরণের সমালোচনা করছেন, কিন্তু আমি করি না, আমি শ্রমিকদের এই ‘সহিংস’ আচরণের পক্ষে; কেন সেই কথা পরে বলছি।

প্রতিবার শ্রমিকদের এমন আন্দোলনের সময় আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের ভাঙা রেকর্ড বাজে (এবারও বাজছে) – “পরিকল্পিতভাবে” গার্মেন্টস সেক্টরে নাশকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস করে বাংলাদেশের গার্মেন্টসের বাজার কব্জা করার জন্য বাইরের কারো কারো (বিশেষত ভারতের) ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে এমন সব নাশকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। হাসি পায় এমন সব কথা শুনলে, মনে পড়ে যায় ছোট বেলায় পড়া প্রবাদ “উদোর পিন্ডি ভুদোর ঘাড়ে চাপানো”।

ধরে নিলাম গার্মেন্টস মালিকদের বক্তব্যটি সঠিক (এমন সম্ভাবনা যে নেই তা না)। কিন্তু আমরা কি কোনভাবে অস্বীকার করতে পারি যে কোন একটা পরিকল্পিত নাশকতা সফল হওয়ার জন্য একটা ক্ষেত্র তৈরি থাকা লাগে? সেরকম ক্ষেত্র কি এই দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে তৈরি নেই বহুকাল থেকেই? ক্ষোভ-অসন্তোষ জমতে জমতে এই সেক্টর কি আস্ত একটা বোমা হয়ে নেই অনেক দিন যাবত? বাইরের ইন্ধন না থাকলেও এই বোমা কি সহসা বিস্ফোরিত হত না?

আর সব বাজার অর্থনীতিতে যা হয়, তাই হয়েছে এই দেশে – চাহিদার তুলনায় যোগানের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য এই দেশের শ্রমিকের শ্রমের মূল্য ঠেকিয়ে দিয়েছে একেবারে তলানীতে। মজার ব্যাপার হল আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের এই যে শোষণ প্রায় সেরকম পরিস্থিতি ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের সময় হয়েছিল। তাই কোন কোন বাজার অর্থনীতির ‘পন্ডিত’ উদ্বৃত্ত শ্রমিকের বাজারে এই রকম পরিস্থিতিকে ‘অনিবার্য’ বলে দেখানোর চেষ্টা করে থাকেন। তারা বলতে চান মজুরি কম হলেই বা কী? এই কম মজুরীও কি তারা অন্য কোন ক্ষেত্র থেকে উপার্জন করতে পারছিল? তারা বলেন যে এই সস্তা শ্রমিকের ব্যবহারে পুঁজিপতিরা অনেক মুনাফা করবে, এবং সেই মুনাফা ব্যবসা আরো অনেক বড় করে দেশকে করে ফেলবে মহা উন্নত – বাড়বে দেশের জিডিপি, পার ক্যাপিটা জিএনপি। মজার ব্যাপার এই উন্নয়নের এই নির্দেশকগুলোর মধ্যে কিন্তু শুভঙ্করের ফাঁকী আছে – লিখব সেটা নিয়ে আরেকদিন।

একটা ডকুমেন্টারীতে দেখেছিলাম, আমেরিকার ষ্টোরে বিক্রী হওয়া ১০০ ডলারের একটা পোষাকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ সেন্ট পায় এর সেলাই করা শ্রমিকরা। তবে গড় হল ৬০ সেন্ট। অর্থাৎ একটা পোষাকের মূল্যের ১% ও শ্রমিক পায় না। ওই ডকুমেন্টারিতে বলা হয়ে ছিল ক্যারিবিয়ান শ্রমিকদের কথা, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এটা কত হতে পারে? জানি পোষাকের লাভের মূল অংশটা আমেরিকান ব্র্যান্ডগুলোই পায়। কিন্তু আমার কথা হল এর প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে যে মুনাফা (যেটা বাংলাদেশে আসে) তার কত অংশ শ্রমিকরা পায়?

আমি দীর্ঘদিন গার্মেন্টস মালিকদের কথাবার্তা খেয়াল করছি। তাঁদের কথার মূল সুর হল তারা ‘কোনরকমে’ টিকে আছে। এর দোহাই দিয়ে তারা তাদের ট্যাক্স হলিডে, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী না দেয়া বহাল রেখেছে দিনের পর দিন। অথচ তাদের জীবনযাত্রা বলে ভিন্ন কথা। টিভিতে বিজিএমইএ এর অনেক নেতার বাড়ির লিভিং রুম দেখেছি, বেশকিছুদিন আগে শ্রমিকদের মজুরি না বাড়ানোর মিটিং এ আসা মালিকদের বিএমডব্লিউ আর লেক্সাসের রিপোর্ট দেখেছি, মাঝারি মানের এক গার্মেন্টস কারখানা মালিকের ফ্ল্যাটে গেছি, গার্মেন্টসে চাকুরিরত বন্ধুদের কাছে জেনেছি – সব ক্ষেত্রেই দেখেছি তাদের সীমাহীন শানশওকতের গল্প।

শিল্প বিপ্লবের সময় ইউরোপের শ্রমিক শোষণ ধীরে ধীরে কমে এসেছে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের সঠিক চাপ এবং দরকষাকষির কারনে (এর মানে এই না যে ওইসব ‘উন্নত’ দেশে শ্রমিক শোষণ নেই – আছে আজো এবং থাকবে; পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটা এক চিরকালীন সত্য)। আমাদের এই সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়ন এই কাজটা অনেকটাই করতে পারত, কিন্তু না, সেটা হতে দেয়া হয় না এখানে কারখানায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে এই অজুহাতে, যদিও এটা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার।

ট্রেড ইউনিয়ন দূরে থাকুক, শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কিছু সংগঠন কাজ করতে গিয়ে নানা ঝামেলায় পড়েছে। জেল, জুলুম, চাকুরীচ্যুতি তো ছিলই, কিছুদিন আগে ঢাকা সলিডারিটি সেন্টারের সাথে যুক্ত (যারা গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী আর কাজের ভাল পরিবেশের অধিকার নিয়ে কাজ করে) গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম খুন হওয়া তার চুড়ান্ত পরিণতি। গার্মেন্টস মালিকরা ‘বাসর রাতেই বেড়াল মেরেছেন’ – অন্যদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন শ্রমিক অধিকার নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ির ফল কী হয়।

গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের স্বার্থে নিজ থেকে কিছু করবে এমন আশা করা একেবারেই ভুল। পুঁজিবাদী অর্থনীতি, যার মূল নীতিই হল ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজিং’, সেখানে এইসব গার্মেন্টস মালিকদের কাছে নৈতিকতা আশা করার কোন কারণ আমি দেখি না। খেয়াল করলে দেখব গার্মেন্টস সেক্টরে কিছু কিছু ভাল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তবে সেটা হয়েছে বায়ারদের চাপে, কমপ্লায়েন্স রক্ষা করার নামে। তাই বাঁকি কাজটা করাতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে এদের ওপর শক্ত চাপ তৈরি করে। কিন্তু প্রধান সমস্যাটা সেখানেই।

আর সব পুঁজিবাদী দেশের মত আমাদের দেশেও সরকার, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি একাকার হয়ে গেছে। ‘উন্নত’ দেশগুলোতে এটা হয় কিছুটা রেখেঢেকে, পর্দার অন্তরালে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা প্রকাশ্য – বেশীরভাগ সংসদ সদস্য এই দেশে কোন না কোনভাবে গার্মেন্টস ব্যবসার (অন্য ব্যবসাও) সাথে জড়িত। তো আমরা যে বলি সরকারকে এটা করতে হবে ওটা করতে হবে সেটা কি চুড়ান্ত রকম আহাম্মকী না? বিদ্যমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা না পাল্টালে এই দেশের কোন সেক্টরের খেটে খাওয়া মানুষদের অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি সম্ভব বলে যারা মনে করেন তারা হয়তো এটুকু জ্ঞান রাখেননা, অথবা জ্ঞানপাপী।

শিরোনাম আর প্রথম অনুচ্ছেদে আমি বলেছি গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই সহিংসতা আমি সমর্থন করছি, কারন আমি এটাকে মনে করি তাঁদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের মহান সংগ্রাম। এই দেশে মালিকরা সম্পদের পাহাড় গড়লেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে কারো কোন দায়িত্ববোধ জাগে না। তারা মুখে স্বাভাবিকভাবে বহুবার তো বলেছেন, কিন্তু কেউ তো শোনেনি। একবার ভাংচুর, সহিংসতা হলে সরকার আর মালিকদের কিছুটা টনক নড়ে। বেতন কয়টা টাকা বাড়ানো হয়। অথচ গতবার বেতন বাড়ানোর পর দেখা গিয়েছিল ডলারের বিপরিতে বা মূল্যস্ফীতি হিসাব করে সেটা আসলে অনেক কমে গিয়েছিল। এদিকে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির দেশে সেই ‘বর্ধিত’ বেতন এখন কত তার খবর কে রাখে?

আমাদের মত মধ্যবিত্তরা তাদের দাবীর প্রতি নৈতিক সমর্থন দেই, কিন্তু বিষোদগার করি তাদের সহিংস আচরণের বিরুদ্ধে – পেটে ভাত, পরনে হাল ফ্যাশনের কাপড়, মাথার ওপর ছাদ থাকলে নীতি কপচানো অনেক সহজ। রক্ত শুষে শুষে ছিবড়ে বানিয়ে এই লোক গুলোকে যখন আধপেটা খেয়ে থাকার নিশ্চয়তা যখন রাষ্ট্র দিতে পারে না তখন ভাংচুর, আগুন অনিবার্যই হয়ে ওঠে। এই আগুনের ন্যুনতম দায় নেই ওই শ্রমিক ভাই,বোনদের – গার্মেন্টস মালিক, সরকার মিলিতভাবে এর জন্য দায়ী। আমি এই আগুনকে সমর্থন তো করছিই, সাথে কামণা করছি শুধু গার্মেন্টস কেন এই আগুন ছড়িয়ে পড়ুক পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে।

পুনশ্চঃ গার্মেন্টস মালিকদের অমানবিকতা নিয়ে আমার পূর্ববর্তী একটি পোষ্টের লিংক এখানে দেয়াটা প্রাসঙ্গিক মনে করছি –
আমাদের ‘ক্রীতদাসী’রা আর বিজিএমইএ এর একটি চিঠি

১৬ জুন একটি পত্রিকায় গার্মেন্টসে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা গোপন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে; এই সেক্টরের সমস্যা বুঝতে যা সবার পড়া অত্যাবশ্যক –
শ্রমিক অসন্তোষের জন্য মালিক পক্ষের
অন্যায়ই মূলত দায়ী