ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

গত কয়েকদিন চট্টগ্রাম আর পার্বত্য জেলাগুলোতে ভীষণ ভারী বৃষ্টি হয়েছে। প্রায় পুরো চট্টগ্রাম শহর তলিয়ে গেছে পানির নীচে। এমনকি চট্টগ্রামের সাথে দেশের অন্যান্য যায়গার রেল এবং আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মনের মধ্যে একটা আশংকা উঁকি দিচ্ছিল এই ভয়ংকর বৃষ্টির খবর শুনে।

আমি জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছিলাম রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই থানার চন্দ্রঘোনায়। চন্দ্রঘোনার অনেক পাহাড়ে বেশ কিছু মানুষ ‘অবৈধ’ ভাবে বাস করত। এরকম ভয়ংকর এক বৃষ্টিতে একবার পাহাড় ধস হয়েছিল – ঐ পাহাড় ধ্বসে জীবন্ত কবর হয়ে গিয়েছিল আমার পরিচিত এক মানুষের পরিবারের চার সদস্যের। কী মর্মান্তিক সে দৃশ্য! কী ভয়ংকর সেই অনুভূতি! আমি এখনো ভুলিনি স্ত্রী আর তিন সন্তান হারানো সেই মানুষটার শুন্য দৃষ্টি – দুনিয়ার সব হাহাকার মিশে ছিল তার চোখে।

চন্দ্রঘোনায় ঐ একটি ঘটনার কথা আমি জানি। কিন্তু প্রতি বছরের বর্ষায় চট্টগ্রাম আর পার্বত্য জেলাগুলোতে ভূমি ধ্বস আর পাহাড়ী ঢলে মারা যায় অনেক মানুষ। এটা এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ঐ এলাকায় এমন অবিরাম বর্ষণের খবর দেখলে বুকের মধ্যে সেই ভয়ংকর আশংকা মাথা চাড়া দেয়। এবারের এই বর্ষনে নানা কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলাগুলোতে মারা গেছে প্রায় শত মানুষ – যার বেশীরভাগ মারা গেছেন পাহড়ী ঢল আর পাহাড় ধ্বসে – কী ভয়ঙ্করভাবেই না সত্যি হল আমার আশংকাটা!

ঐ এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে হতদরিদ্র মানুষেরা পাহাড়ের গায়ে কুঁড়েঘর বানিয়ে কোনরকমে জীবনযাপন করে; মৃত্যুর ঝুঁকি ভীষণভাবেই আছে, জানে তারা, তারপরও থাকে। আর প্রতিবছর রুটিন করে মরে। গত দুই দিন যারা মারা গেল তার বেঁচে গিয়েছিল গত বছর, আর যারা এ বছর বেঁচে গেল তাঁরা হয়তো মরবে আগামী বা তার পরের বছর। চলছে এভাবেই; চলতেই থাকবে এসব – এটা তো বাংলাদেশ।

প্রতিবার এমন মৃত্যুর পর নানা কথা বলা হয়, কাল ও হচ্ছিল। এইসব লোকজনকে পাহাড়ের গায়ে এমন ‘অবৈধ’ ভাবে বাস করতে দেয়া হল কেন? কেন ওদেরকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না? চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আর মেয়রকে এসব মৃত্যু নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা বলেছেন তাঁরা বৃষ্টি বাড়ার পর থেকে মাইকিং করে লোকজনকে ওইসব বাসা থেকে সরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা যায়নি। প্রশাসনের দারুন পদক্ষেপ বটে!

আমরা যারা এদেরকে উচ্ছেদ করার কথা বলি জোর গলায় তারা একবারও ভেবে দেখি না প্রায় নিশ্চিত মৃত্যঝুঁকি থাকার পরও কেন এই মানুষগুলো এভাবে বসবাস করছে। কাল রাতের বিবিসি বাংলার খবরে ভূমিধ্বসে পড়েও বেঁচে যাওয়া একজন বলছিলেন এভাবে থাকা ছাড়া তাঁদের আর কোন উপায় নেই। বিকল্প আবাসনের ব্যয় নির্বাহ করা তাঁদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না। তিনি বলছিলেন মারা যেহেতু একদিন যেতেই হবে, সেটা না হয় একটু আগেই হবে। কী ভীষণ ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়লে মানুষ এমন কথা বলতে পারে, ওসব ভেবে দেখার সময় আমাদের কোথায়?

আমি জানি না এমন বিপর্যয়কর বৃষ্টির মধ্যে আমাদের প্রশাসন শুধু মাইকিং করে কেন দায়ীত্ব শেষ করলেন? জানিও তাঁরা বাসা ছেড়ে যেতে চান না, কিন্তু কেন পুলিশ দিয়ে এদেরকে জোর করে ঘর থেকে বের করে কোন স্কুলঘরে নিয়ে যাননি? আসলে এঁদের মৃত্যুতে কার কী আসে যায়, এঁদের মৃত্যু মানে তো জাষ্ট কতগুলো সংখ্যা।

দুর্যোগ এবারের মত হয়তো শেষ। এবারও কি আমরা যাব এই সমস্যাটার স্থায়ী সমাধান করতে? পাহাড় কি বৃষ্টি হলেই ধ্বসে যায়? হ্যাঁ এমন একটা সম্ভবনা আছে; কিন্তু সব সরকারের সময় কিছু সরকারী টাউট যে নির্বিচারে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে যায় তার একটা বড় দায় আছে এসব ধ্বসের পেছনে – এটা বিশেষজ্ঞদেরই কথা। তো বন্ধ হবে পাহাড় কাটা? জানি সবচাইতে ভাল সমাধান এই মানুষগুলোকে এসব এলাকায় বাস করতে না দেয়া। কিন্তু সেটা করতে চাইলে এঁদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে কি আমাদের রাষ্ট্র রাজী আছে? নাকি এমনি উচ্ছেদ করে দেয়া হবে বস্তি উচ্ছেদের মত করে?

আমার ধারনা সব চলতে থাকবে যেমন আছে তেমন – বছরে মাত্র কয়েকশত মৃত্যু পাহাড় চাপায় হলে কী সমস্যাই বা আর হবে এই ১৬ কোটি মানুষের দেশে। তাও আবার মরছে সব ‘নীচুজাত’। আর এসব মৃত্যুর পর সরকারী কর্তব্য করতে তো খুব বেশি সমস্যা/খরচও নেই – এবার পাহাড় ধ্বসে প্রতিটি মৃত মানুষের পরিবারকে বি-শ হা-জা-র টাকা করে দেয়া হচ্ছে। মনে পড়ছে এবারকার দুর্ঘটনার দুইটি পরিবারের কথা, যার একটির ছয় সদস্য, আর আরেকটির চার সদস্য মারা গেছে – ওরা তো রীতিমত ‘বড়লোক’ হয়ে যাচ্ছে!

বিশ লক্ষ টাকা দিয়ে ১০০ মৃত্যু প্রতি বছর সামাল দেয়া গেলে আর কোটি কোটি টাকা খরচ করে এঁদের পুনর্বাসনের দরকার কি? আমাদের ট্যাক্সের টাকা ‘অপচয়’ না করার জন্য সরকারকে বরং আন্তরিক মোবারকবাদ জানানো উচিৎ।

এই ঘটনায় মনে পড়ে গেল সবার জানা পুরনো একটি কৌতুক …………

একটা জাহাজের রেলিং এর পাশে এক আমেরিকান, এক জাপানী আর এক বাংলাদেশী দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলতে বলতে আমেরিকান হঠাৎ ইচ্ছে করে তার হাতের মোবাইল ফোনটি সমূদ্রে ফেলে দিল। এটা দেখে বাংলাদেশী অবাক হয়ে গেল। এটা দেখে আমেরিকান তাকে আশ্বস্ত করে বলল – আরে সমস্যা নেই, এসব তার দেশে অনেক আছে। কিছুক্ষন পর জাপানীটি তার হাতের ল্যাপটপটি ফেলে দিল সমূদ্রে। বাংলাদেশী আবার অবাক। জাপানীরও একই উত্তর – সমস্যা নেই এসব তার দেশে অনেক আছে।

এবার বাংলাদেশী তার পাশ থেকে একজন মানুষকে ধরে সমূদ্রে ফেলে দিতেই আমেরিকান আর জাপানী হায় হায় করে উঠল। কারণ জানতে চাইতেই বাংলাদেশী নির্বিকারভাবে বলে উঠল – সমস্যা নেই, ওসব আমার দেশে অনেক আছে।