ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

এই পোস্টটা লিখতে শুরু করে অনেকদিন আগে শোনা একটা সিনেমার নাম মনে পড়ল; সিনেমার নাম টা ছিল “মেয়েরাও মানুষ”। তখন খুব হাসাহাসি, বিদ্রুপ করেছিলাম নামটা নিয়ে – এখন আর করি না। কেন এই সিনেমার নাম মনে পড়ল, আর কেনইবা এই সিনেমার নামটা এখন আর মনের মধ্যে বিদ্রুপ তৈরি করে না পোষ্টের শেষে সেটা বলব।

আমাদের ব্লগের এই মুহুর্তের ফিচার পোষ্টটি (মানবাধিকার সংগঠনগুলো কাদের জন্য লড়ছে?) বেশ কৌতুহলুদ্দীপক। সত্যি বলতে, এমন পোষ্ট ফিচার হওয়াতে কিছুটা বিস্মিতই হয়েছি। পোষ্টটা চোখে পড়ার পরই আমার এই পোষ্টটা লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে লিখতে কিছুটা দেরী হয়ে গেল। পোষ্টের লেখক শুরুতে নিজেই ঘোষণা করছেন তাঁর পোষ্টটি ‘অতীব জরুরী’। এটা প্রথম দেখলাম এই ব্লগে। যাই হোক পড়ে অবশ্য কিছু ‘অতীব জরুরী’ কথা পেলাম, তবে নতুন না একেবারেই। এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে অসংখ্যবার শুনেছি বিএনপির ‘স্পাইক’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে বাংরেজি ভাষায়, শুনছি গত সাড়ে তিন বছর বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মুখে অত্যন্ত দুর্বল, অশুদ্ধ বাংলায়। আরও শুনছি র‍্যাবের মিডিয়া উইং এর স্মার্ট পরিচালকের মুখে ভাল বাংলায়।

তবে লেখক একটি সততা দেখিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর র‍্যাবের মত অপরাধীকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে ওঁত পেতে থাকা সঙ্গীদের গুলির জবাবে পাল্টা গুলিতে পড়ে অপরাধীর মৃত্যুর সেই অতিপরিচিত ক্রসফায়ারের গল্প বলেননি। এটাকে তিনি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডই বলতে চেয়েছেন (সরকারের লোক আর র‍্যাব ছাড়া সবাই তাই বলে) এবং সেটা সমর্থনে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

দুইটি ঘটনা প্রায় একই সময়ে ঘটল, র‍্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ এ পুরনো ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদের মৃত্যু আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রতিবেদনে র‍্যাবের হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের কথা বলে এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করে দেয়ার পরামর্শ দেয়া।

পুরনো ঢাকায় ডাকাত শহীদের মৃত্যুতে মানুষের দারুন আনন্দের খবর টিভিতে দেখেছি, পত্রিকায় পড়েছি। গত বেশ কিছুদিন থেকেই দেশে বিদেশে নানামুখী চাপের কারণে ক্রসফায়ার নিয়ে সরকার ও র‍্যাব খুব চাপের মধ্যে ছিল। কিন্তু ডাকাত শহীদের মৃত্যুর এই ‘সাফল্য’ আবার ক্রসফায়ারপন্থীদের গলার জোর বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রসফায়ারপন্থী বলতে আমি শুধু সরকার আর র‍্যাবকেই বোঝাইনি, বুঝিয়েছি অনেক সাধারণ মানুষকেও যাঁরা মনে করেন এই সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে র‍্যাব দেবদূত হয়ে এসেছে আর ক্রসফায়ার করে করে সমাজের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’দেরকে মেরে এই সমাজকে পুত পবিত্র করে ছাড়বে।

হিউম্যান রাইট ওয়াচ এর প্রতিবেদনের পর সরকার আর র‍্যাব তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে শুরু করেছে। শুধু তাদেরকেই নয় তুলোধূনো করে ছাড়ছে ঐ সংস্থাকে রিপোর্ট তৈরিতে সাহায্যকারী বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিশ কেন্দ্র (আসক)’ এবং ‘অধিকার’ কে ও – যেন ওগুলো ভুঁইফোড় হেজিপেজি এনজিও! প্রকাশ্যে বলতে শুনিনি, তবে ভেতরে ভেতরে তারা হয়তো বলেছেন ‘আসক’ এর সুলতানা কামাল বিএনপি-জামাতের দালাল হয়ে গেছে, জামাতের টাকা খেয়েছে। যাই হোক, সরকার, র‍্যাব সবার কথার মূল সুর হল এটা বাংলাদেশের ‘অভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ’; বাংলাদেশের ‘দেশপ্রেমিক’ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।

সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী হিসেবে বাংলাদেশ কি কোনভাবে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাকে ‘অভ্যন্তরীন’ বিষয়, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিতে পারে। একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান তার একটা অংশে (পূর্ব পাকিস্তানে) ‘বিদ্রোহ/বিচ্ছিন্নতাবাদ’ দমনে যা যা করেছিল তা তো তাদের অভ্যন্তরীন ব্যাপার ছিল – সারা পৃথিবী এটা নিয়ে এতো উচ্চবাচ্চ করলো কেন? এটা কি তাহলে পাকিস্তানের ওপর অন্যায় হয়নি? মজার কথা ততকালীন পাকিস্তান সরকারও তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে, চাপকে তাদের ‘অভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।

আলোচ্য পোষ্টটিতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বলা ফালতু কথাটাও (এটা আমি যুক্তি বলতে নারাজ; এটা কোনভাবেই ‘দুর্বল যুক্তি’ও বলা যায় না) বলা হয়েছে – “অপরাধী যখন মানুষ হত্যা করে তখন কোথায় থাকে মানবাধিকার?” কথাটা শুনে হাসি পায়, কিন্তু অবাক হয়ে দেখি এই ক্ষেত্রে গোয়েবলসের তত্ত্ব কিন্তু কাজে লেগে যাচ্ছে – বার বার বলার ফলে সমাজের সাধারণ মানুষদের একটা অংশ এটাকে যুক্তি হিসাবে দেখাতে শুরু করেছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমি এটা নিজেই দেখেছি। কী চমৎকার কথা! একজনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার (যদিও অপরাধীদের কর্মকান্ড মানবাধিকার লংঘন নয়; ‘অপরাধ’) প্রতিশোধ নেয়া হবে মানবাধিকার লংঘন করেই – তাও আবার সেটা করবে রাষ্ট্র স্বয়ং!

আচ্ছা তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম এভাবে ক্রসফায়ার করে অপরাধী/সন্ত্রাসী মেরে ফেলাই সমাধান। তো ডাকাত শহীদ বা কালা জাহাঙ্গীররাই কি এই দেশের সবচাইতে বড় অপরাধী? এদের কি কোন গডফাদার নেই? তারা কারা? র‍্যাব-সরকার জানে না? তাদের ক্রসফায়ার করা হচ্ছে না কেন? এই দেশের ‘বড়’ দুই দলের অজস্র নেতা, অজস্র উচ্চপদস্থ আমলার অপরাধের তুলনায় ডাকাত শহীদ, আর কালা জাহাঙ্গীররা একেবারে পূত চরিত্রের মানুষ বলে আমি মনে করি। এক ডাকাত শহীদ মরবে আজ, কাল আরেক ‘গলাকাটা অমুক’ দাঁড়িয়ে যাবেই, কারণ ডাকাত শহীদদের সৃষ্টিকর্তা কিন্তু ক্রসফায়ার হন না – হবেনও না কোনদিন। আমাদের যাবতীয় ঘৃণা, থুতু ডাকাত শহীদদের জন্যই বরাদ্ধ। করুণা বোধ করছি ডাকাত শহীদের জন্য – সে মরে এভাবে; আর তার চাইতে হাজারগুন বড় অপরাধী এই দেশে মন্ত্রী হয়, পতাকাশোভিত গাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়!

আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কিছু সমস্যার কথা শুনি বহুদিন থেকেই – তার জন্যই নাকি ক্রসফায়ারের ব্যবস্থা। আমার অবাক লাগে আইনের সংস্কার করে না কেন সরকার? এমনকি আগের বিএনপি সরকার, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে; তো তারা প্রয়োজনীয় সব সংস্কার করছে না কেন? যেখানে এই দেশের সরকারগুলো সর্বোচ্চ আদালতকে নিজের মর্জিমত চালায় (কথাটা কি আদালত অবমাননা হয়ে গেল?), সেখানে আইনের দুর্বলতার কথা বলা হাস্যকর। সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে যে সবকিছু আইনের মাধ্যমেই সম্ভব তাঁর সবচাইতে বড় উদাহরণ আইনী প্রক্রিয়ায় এরশাদ শিকদারের ফাঁসি।

আসলে সমস্যাটা হল আমাদের সমাজ জানে না, কে মানুষ আর কে মানুষ না। একজন খুনী, ধর্ষক, ডাকাত, ছিনতাইকারী, এসিড নিক্ষেপকারীর নাম আমরা মানুষের খাতা থেকে কেটে দেই – তাই তাকে ক্রসফারার করলে তো সমস্যা নেইই, আমরাও মওকামত পেলে পিটিয়ে মেরে ফেলি। তবে হ্যাঁ, লিমনের মত নিরপরাধ মানুষ যদি ভুক্তভগী হয় তবে আমাদের মানবতা জাগে। আমি এর জন্য সাধারণ মানুষকেও খুব বেশী দোষ দেই না – সরকার, সমাজপতি, এমনকি হালে ব্লগ লেখকরাও আমাদেরকে এই শিক্ষা দেন যে – অপরাধীর জন্য মানবাধিকার কিসের? সে তো মানুষই না।

আসি শুরুতে বলা সিনেমাটার নামের কথায়। ‘মেয়েরাও মানুষ’ সিনেমাটার নাম শুরুতে মনে মনে হাসালেও পরে আর হাসায়নি। কারণ যে সমাজে মেয়েদেরকে পূর্ণাংগ মানুষ মনে করা হত না, হয় না সেই সমাজে সিনেমার নাম এমনই তো হবার কথা ছিল। মানুষকে শেখানো দরকার ছিল মেয়েরাও আসলে মানুষ। এই পোষ্ট লিখতে গিয়ে সিনেমাটার নাম মনে পড়েছিল, কারণ সেই সিনেমার নামের অনুকরণে বলতে ইচ্ছে করছে “ডাকাত শহীদরাও মানুষ” – মানবাধিকার ওই হতভাগাদের জন্যও।

এই ব্লগে লিখা আমার সর্বপ্রথম পোষ্টটি এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি – ধরে নিলাম ওরা ভয়ঙ্কর ডাকাত…