ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বেশ কিছু বছর আগের কথা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করছি আমি। আমার পরিবার তখন ঢাকায় থাকতো না – আমি উঠেছিলাম আমাদের ডাঃ ফজলে রাব্বী হলে। বুয়েট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত এই কথাটা আসল আসলে প্রসঙ্গক্রমে।

আমাদের হলের ৪০/৫০ ফুটের মধ্যেই ছিল বুয়েটের নজরুল হল। মাঝে শুধু একটা দেয়াল – আমাদের হল থেকে নজরুল হলের অনেক রুমের ভেতরে কী হচ্ছে সেটাও দেখা যেত। একদিন রাতে অদ্ভুত এক কান্ড ঘটলো – লোডশেডিং এর সময় প্রচন্ড হৈ হট্টগোল শুরু হল। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম – মারামারি লেগে গেল না তো? কিছুক্ষন পর রুমে ধাক্কার শব্দ – আমাদের প্রথম বর্ষের ছাত্রদেরকে সিনিয়ররা এসে একত্র করে নিয়ে গেল ছাদে। বেরোনোর সময় খেয়াল করলাম নজরুল হলের দিক থেকে একই রকম শোরগোল আসছে।

ছাদে পৌঁছার পর দেখি আমাদের হলের অজস্র ষ্টুডেন্ট, আর ওদিকে সামান্য দূরত্বে নজরুল হলের ছাদে ওদের অজস্র ছাত্র। এরপর শুরু হল যুদ্ধ – যুদ্ধের অস্ত্র স্রেফ গালি। এত সব অকথ্য, ভয়ঙ্কর গালি গালাজ চলতো ওই সময়! আমি নিশ্চিত, এমন কোন খারাপ গালি পাঠক শোনেননি যেগুলো ওখানে দেয়া হত না – এমনকি আবিষ্কৃত হত নতুন সব গালিও। কেউ সেটা শুনলে খুব অবাক হয়ে ভাবতে পারে যে কোন রাগ-ক্ষোভ ছাড়া শুধু মজার জন্য এমন গালিগালাজ কেউ করতে পারে! বলা বাহুল্য এই গালির যুদ্ধ ছিল লোডশেডিং এর সময় এক নিয়মিত ঘটনা।

এই তথ্যটা হয়তো আমাদের জন্য অবমাননাকর; তবুও আজ মনে পড়ল বলে লিখলাম। আর এটার একটু দরকারও ছিল। তো সেই গালিগালাজের সময় আমরা একটা হাস্যকর তর্ক করতাম আবার ওইসময় – বুয়েটের মিস্ত্রীরা (আমাদের ভাষায়) ভাল, না ডিএমসির কবিরাজরা (ওদের ভাষায়) ভাল। এই হাস্যকর তর্ক আমরা এমনকি সামনাসামনিও করতাম (বিশেষ করে প্রথম বর্ষে) যখন আমরা ওদের হলে যেতাম, বা ওরা আমাদের হলে আসতো। বলা বাহুল্য এই তর্ক ছিল অন্তহীন, সমাধান দূরে থাকুক প্রায়শই সেটা রূপ নিত নির্জলা ঝগড়াঝাটিতে।

বুয়েটে অনেক বন্ধু পড়তো। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় অসস্রবার গিয়েছি বুয়েটে, বুয়েটের হলে। ওদের একাডেমিক ষ্ট্রাকচার দেখেছি, দেখেছি ওদের অসাধারন সব সিষ্টেম। আমি আমার মেডিক্যাল জীবনে বিএনপি, আওয়ামী লীগের দুটো সরকার দেখেছি – বুয়েটের সিষ্টেমে কেউ হাত দিতে যায়নি। বুয়েট চিলেছে নিজের মত করেই অসাধারণভাবে। কোন সন্দেহ নেই এই একটা দিকে অন্তত আমার প্রতিষ্ঠান বুয়েটের চাইতে পিছিয়ে ছিল নিশ্চিতভাবেই। আমাদের রথী-মহারথী সব প্রফেসরদেরকে ড্যাব আর স্বাচিপের (যার যার রাজত্বের সময়) নেতাদের মোসাহেবি করতে নিজের চোখে দেখেছি। এমনকি আমাদের ‘নেতা’ বন্ধুদের সাথেও তাঁরা কথা বলতেন সমীহের স্বরে। এটা নিয়ে মনের মধ্যে হিংসা ছিল বুয়েটের ‘মিস্ত্রি’দের প্রতি। মনের কোনে ছিল দারুণ গর্বও – বুয়েট তো আমার দেশেরই প্রতিষ্ঠান। বলাই বাহুল্য এসব হিংসা বা গর্ব বুয়েটের বন্ধুদেরকে তখন দেখাইনি – চোখের সামনে বুয়েটের ‘মিস্ত্রি’দের বুকের ছাতি ফুলতে দেখা ওই বয়সে ছিল ভীষণ মর্মান্তিক ঘটনা।

গত কিছুদিন ধরে বুয়েটের ভিসি আর প্রোভিসির পদত্যাগের দাবীতে বুয়েটের প্রায় সব শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন আর তার বিরুদ্ধে সরকারের একগুঁয়েমি দেখে এটা এখন নিশ্চিত যে বুয়েটের ওই ভীষণ গৌরবের যায়গাটাও আজ ধ্বংসের পথে। তাই বুয়েটকে, বুয়েটের বন্ধুদেরকে একসময় যে কারণে হিংসা করতাম, সেই কারণটির মৃত্যু ঘটল। না এই কারণে সুখী বোধ করছি না; কষ্ট হচ্ছে ভীষণ – এই দেশের এমন ঐতিহ্যের একটা প্রতিষ্ঠানও আর বাঁকী থাকল না এই দেশের নোংরা রাজনীতিবিদদের হিংস্র থাবা থেকে!

বুয়েটের এই ঘটনার একটা বড় তাৎপর্য আছে বলে আমি মনে করি – এই সরকার তার নির্লজ্জ দলীয়করণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনকিছুর তোয়াক্কা করছে না আর। আর বুয়েটের প্রায় সব শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারী আর সারা দেশের সচেতন মানুষের (কিছু অন্ধ আওয়ামী লীগার ছাড়া) যৌক্তিক দাবীকে দুই পয়সার মূল্য না দিয়ে সরকারের নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা – এটা পরিষ্কার ফ্যাসীবাদ।

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আজাদের একটা কবিতার কথা মনে পড়ছে – “সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”। আমি কবি নই; হলে লিখতাম নতুন কবিতা – “সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে”।

পুনশ্চ:
বুয়েটে কী ঘটেছে, ঘটছে, কেন ঘটছে সেটা পত্রিকার পাতায়, টিভিতে অনেক আসছে। এই ব্লগের সহব্লগার মঞ্জুর মোর্শেদ ভাই বুয়েট সঙ্কট নিয়ে তথ্যপূর্ণ দারুণ একটা পোষ্ট দিয়েছেন। যদি কারো চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকে পড়ুন সেটা – বুয়েটে দরকার… আশু সমাধান…