ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

হুমায়ুন আহমেদকে সমাহিত করা হয়েছে কাল। চিরবিদায় নিলেন এই দেশের সবচাইতে আলোচিত, অসংখ্য মানুষের প্রিয় মানুষটি – শেষ হল এই দেশের সাহিত্যের এক বিশাল অধ্যায়ের।

এটাই হবার কথা ছিল হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরে – পুরোটা দেশ হুমায়ূনময় হয়ে আছে গত কয়েকটা দিন। প্রত্যাশিতভাবে দেশের সব পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, সামাজিক যোগাযোগ সাইট, ব্লগ হুমায়ুনে সয়লাব। আমাদের দেশের সব সেক্টর মিলিয়ে সবচাইতে বড় তারকাটির মৃত্যু প্রত্যাশিত সব কিছুই দেখিয়েছে।

আমাদের ব্লগের প্রায় সব নিয়মিত লেখকই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। আমি অন্য ব্লগগুলোতেও ঢুঁ মেরে দেখতে চেয়েছি মানুষের অনুভূতি কেমন, কেমনই বা তার প্রকাশ। কী দেখতে পারি অনুমান ছিলই মোটামুটি – দেখলাম মোটামুটিভাবে সেটাই ঘটেছে।

পত্রিকার লিখা, টিভির আলোচনা, ব্লগের পোষ্ট দেখে খ্রিষ্টানদের রোমান ক্যথলিক মতে কাউকে অফিসিয়ালি সেইন্ট এর মর্যাদা দান করার প্রক্রিয়া canonization এর কথা মনে পড়ল। মনে পড়ে প্রায় এক দশক আগে ভ্যাটিকান মাদার টেরেসাকে canonize করার পথে মানুষের সাহায্য চেয়েছিলেন। ওটার শর্ত হিসাবে মৃত্যুর পরে কমপক্ষে ২ টি অলৌকিক ঘটনার প্রমাণের দরকার। তাঁরা মানুষের কাছে আহ্বান করেছিলেন কারো এমন কোন অলৌকিকতার ঘটনা জানা থাকলে জানানোর জন্য। তখন নানা দিক থেকে নানা অলৌকিকতার ঘটনা মানুষ জানাতে শুরু করে। অসংখ্য ঘটনা আসতে থাকে মানুষদের পক্ষ থেকে। যাচাই বাছাই করে দেখা গিয়েছিল প্রায় সব ঘটনা আদৌ সত্য ছিল না। তবে পরবর্তীতে নাকি সেটা পাওয়া গিয়েছিল (!?)। আর হ্যাঁ যারা টেরেসার অজস্র ‘মিথ্যে’ অলৌকিক ঘটনার কথা বলেছিলেন তাঁরা কিন্তু সেটা তাঁকে ভালবেসেই করেছিলেন। কিন্তু এটা তাদের বোঝা উচিত ছিল এটা করে ‘মা’ টেরেসাকে সন্মান করা হল না অসন্মান।

হুমায়ুনকে নিয়ে আমাদের সব রকম মিডিয়ার লিখার ধরন দেখে আমার ঐ শব্দটি মনে পড়ল – প্রায় সবাই হুমায়ুনকে শিল্প-সাহিত্যের সেইন্ট (মানুষ সেইন্ট নয়) বানানোর চেষ্টা করছে – সবাই তাঁকে এই ক্ষেত্রে canonize করছেন। আবার ছোট একটা পক্ষ তিনি আস্তিক ছিলেন, না নাস্তিক ছিলেন, তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামণা করা যাবে নাকি যাবে না, শাওনকে বিয়ে করে তিনি কতটুকু অন্যায় করেছেন, তাঁরা লাম্পট্য কতটা – এসব আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে। এই পক্ষটা ছোট – এদের এসব ফালতু, অহেতুক আলোচনা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে অচিরেই।

কিন্তু আমাকে ভাবিয়েছে আর সব লিখাগুলো। আমি আসলে সাহিত্যিক, বা পরিচালক হিসাবে হুমায়ুনের মূল্যায়নের জন্য এই পোষ্ট লিখছি না। তবে নানা জনের নানা মূল্যায়ন পড়তে পড়তে এটা আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে অন্তত আমাদের এই প্রজন্ম সাহিত্যের জগতে এই মানুষটার সঠিক অবস্থান নির্ধারন করতে পারবে না। কারণ আমরা তাঁকে সাহিত্যের জগতের একজন মানুষ হিসাবে মুল্যায়ন করছি না; আমরা সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছি তাঁকে সেইন্ট বানাতে।

আগেই বলেছি এই পোষ্টে হুমায়ুনের সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করার কোন উদ্দেশ্য নেই আমার। তবে মানুষের আলোচনা কোন পর্যায়ে গেছে সেটা জানানোর জন্য অন্তত দুইটি তথ্য দেয়া দরকার বলে মনে করছি। হুমায়ূন কিছু নাটক-সিনেমা পরিচালনা করেছেন। তো সেগুলোর আলোচনায় আমি টিভিতে দেখেছি কিছু ‘বোদ্ধা’ তাঁকে অত্যন্ত উঁচু, বিশ্বমানের পরিচালক বলে ঘোষণা করেছেন। ফিল্ম এবং ভিস্যুয়াল মিডিয়া নিয়ে আমার একাডেমিক এবং ব্যক্তিগত পড়াশোনা আছে। কেউ চাইলে এই ব্যাপারে আমি তর্কে নামতে রাজী আছি যে, হুমায়ূন পরিচালক হিসাবে অতি সাধারণ ছিলেন। আসলে তাঁর নাটক-সিনেমাতে তাঁর জাদুকরী ক্ষমতার গল্প, স্ক্রীপ্ট এবং মজার সব সংলাপ আছে। তাই ওগুলো আমাদের অনেকেই অনেক উপভোগ করেছেন। কিন্তু ওটা মানেই সিনেমা নয়।

আমি কাউকে কাউকে লিখতে দেখেছি, বলতে শুনেছি, এই দেশের মানুষের প্রথম পাঠাভ্যাস তৈরির কৃতিত্ব নাকি তাঁর। কোন সন্দেহ নেই, আমাদের দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস তৈরিতে তাঁর বিরাট অবদান আছে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের একচেটিয়া বাজারকে সরিয়ে আমাদের লেখকদের বাজার তৈরিতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এই দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস প্রথম তিনি তৈরি করেছেন, এটা ভীষণ ভুল বলে আমি মনে করি। আমি এই কৃতিত্ব দিতে চাই (অনেকেই স্বীকার করবেন সেটা) কাজী আনোয়ার হোসেন এবং তাঁর সেবা প্রকাশনীকে।

আমি অবশ্যই এটা জানি আমাদের অতি প্রিয় মানুষটার মৃত্যুতে আমরা অনেক আবেগাপ্লুত। এই সময় আমাদের আবেগের বাড়াবাড়ি খুব অস্বাভাবিক না। কিন্তু আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটা খারাপ দিক হল একবার শুরু হলে আমাদের ভাবাবেগগুলো চলতেই থাকে। সেটা রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই হোক বা শিল্পী-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই হোক। আমি চাই এই আবেগের প্রাথমিক ধাক্কাটা শেষ হয়ে আমরা কিছুটা ধাতস্থ হলে যেন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, সমালোচনা হোক তাঁর সৃষ্টি নিয়ে।

আমাদের বের করে আনতে হবে তাঁর সাহিত্যের মূল শক্তি কোথায়, দুর্বলতাই বা কী। চেতনে বা অবচেতনে তিনি কী দর্শন রেখে গেছেন তাঁর সাহিত্যে। তাঁর সাহিত্য মানুষের মননে, চেতনায় কী প্রভাব রাখে। অসাধারণ আনন্দ দেবার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্য কি আমাদের অবচেতন মনে কোন খারাপ প্রভাব রেখে গেছে? কিংবা ভাল কিছু? ভাল কিংবা খারাপ যাই হোক না কেন সেটা কী? তাঁর রাজনৈতিক সামাজিক দর্শন কী ছিল? সেটার কোনটা আমরা নেব, বা কোনটা নেব না?

জনপ্রিয়তার মোহ কি তাঁকে অনেক সময়ই সঠিক কথা বলা থেকে বিচ্যুত করেছে? তিনি যা লিখেছেন তিনি আসলেই কী সেটাই বিশ্বাস করতেন? নাকি তিনি জানতেন মানুষের চিন্তার ধরনটা কেমন এবং সেটা নিয়েই লিখতেন? একজন লেখক হিসাবে কি শুধু সেটাই করা উচিৎ ছিল, নাকি মানুষের চিন্তার পরিবর্তনের চেষ্টা করাও তাঁর উচিৎ ছিল? সেই সুত্র ধরে আবার শুরু হতে পারে অনেক পুরনো (কিন্তু অমীমাংসিত) সেই আলোচনা – শিল্প কি শুধু শিল্পের জন্য, না শিল্প জীবনের জন্য। আলোচনা হতে পারে তাঁর অসাধারণ রসবোধ নিয়ে, সাথে এটাও আলোচনা হতে পারে ওটার প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাঁর লিখার অন্তর্নিহিত দর্শন সাধারণ পাঠক ধরতে ব্যর্থ হয়েছে কিনা। আলোচনা হওয়া উচিত তাঁর সহজ অথচ অসাধারন ভাষার কাজ নিয়ে। আমাদের খুঁজে বের করা উচিৎ হবে তাঁর সবচাইতে মুল্যবান লিখাগুলো; ব্যাখ্যা করা উচিত কেন সেগুলো মূল্যবান। আমাদের বের করে আনতে হবে তাঁর সিনেমাগুলো কতটা ‘সিনেমা’ আর কতটা ‘বই’।

সুন্দরভাবে এই মানুষটার সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করে আমাদের উচিত হবে আমাদের সাহিত্যে, মননে তাঁর সঠিক অবস্থানটা নির্নয় করা। আর এভাবেই পারি আমরা এই মানুষটার প্রতি আমাদের সঠিক সন্মান দেখাতে। ভাবাবেগে ভেসে গিয়ে কারো ওপর দেবত্ব আরোপ করে তাঁকে ভক্তি করতে শুরু করা সেই মানুষটার প্রতি অসম্মান।

শেষে এসে শিরোনাম নিয়ে কিছু কথা। আমি ঠিক জানি না শিরোনামটা খুব কর্কশ হয়ে গেল কিনা। আসলে শিরোনামের কথা মাথায় আসল হুমায়ূন আজাদের একটা প্রবচন থেকে; তাঁর একটা প্রবচন এরকম – নজরুলের সাহিত্যের আলোচকেরা সমালোচক নন, তাঁরা নজরুলের মাজারের খাদেম। অন্ধ ভক্তি নিয়ে আমরা আমাদের অনেক বড় মানুষের (সাহিত্যিকেরও) প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারনি। আমি চাই আমাদের সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে যেন আমরা এই ভুল না করি – আমরা যেন হুমায়ূনের ‘মাজার’ এর ‘খাদেম’ না হয়ে উঠি।

পূনশ্চঃ
আমি আসলে একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম এই পোস্টটি লিখার জন্য এই সময়টা একটু তাড়াতাড়ি হয়ে গেল কিনা। আমি মানুষের আবেগের ব্যপারটা অনুমান করে তাঁর মৃত্যুর দিনই এই পোষ্টটি দেইনি; অপেক্ষা করলাম কিছুটা – তাঁর সমাহিত হওয়া পর্যন্ত। আমি বিশ্বাস করি এই পোস্টে হুমায়ূন ভক্তদের আহত হবার মত কিছু নেই। তারপরও কেউ আহত বোধ করে থাকলে তাঁর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।