ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

রমজান শুরুর পর থেকে ঢাকা প্রায় লোডশেডিং মুক্ত। পত্রিকায় দেখেছি ঢাকার বাইরের অবস্থাও প্রায় ঢাকারই মত। মানুষ ভীষণ খুশি। নিয়মিত টিভির খবর না দেখা বা পত্রিকা না পড়া কিছু পরিচিত মানুষ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় খুব তৃপ্তি দেখালেন যে ভয়ংকর লোডশেডিং বোধ হয় শেষ হল! আবার বর্তমান সরকারি দল সমর্থন করা কিছু পরিচিত মানুষকে দেখেছি গদগদ হয়ে সরকারের প্রশংসা করছেন। তাঁদের এমন চিন্তা দেখেই শিরোনামের ঐ নোয়াখাইল্যা প্রবচনটা মনে পড়ল।

আমি (নাকি আঁই) নোয়াখাইল্যা। ওখানে থাকা হয়নি খুব একটা – বাবার চাকুরীর সুত্রে আমি জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি অন্য জেলায়। কিন্তু দাদী, নানা-নানী বেঁচে থাকতে মাঝে মাঝে গ্রামে যাওয়া হত। তো ওখানেই একবার ঐ প্রবচনটা শুনেছিলাম। প্রবচনটা একটু বোঝা যাক। পুরো প্রবচনটা হল – ছাঁন দেই খুশি ওইচ্ছা, রোজায় আক করাইবো – এটার ‘বাংলা’ তরজমা হতে পারে এমন “চাঁদ দেখে খুশী হয়ো না, রোজা তোমাকে হা করাবে, অর্থাৎ কষ্ট দেবে”। আপাতভাবে সুখের কোন কিছু (যার সাথে কষ্টের কোন কিছু সরাসরি জড়িত) দেখে খুশী হয়ে যাওয়া মানুষকে দেখে এই প্রবচনটা ব্যবহৃত হয়।

ফিরে আসি আমাদের বর্তমানের আপাত লোডশেডিংমুক্ত জীবনের আপাত সুখের ব্যাপারটায়। এই আপাত সুখের পেছনেই আছে বিরাট সমস্যা। তবে তার আগে বাংলাদেশের একটি ‘পাপেট’ প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্পর্কে দুই একটি কথা। ২০০৪ সাল থেকে কাজ করতে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি নাকি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যদিও এটা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অঙ্গীভূত। এটার কাজ হল বিদ্যুৎ সহ অন্যান্য জ্বালানীর ‘যৌক্তিক’ মূল্য নির্ধারণ করা। এটা করতে গিয়ে তাদের শুধু উৎপাদকেরই নয়, ভোক্তার স্বার্থও দেখার কথা। তো তারা এই মূল্য নির্ধারণের সময় গণশুনানী নামে এক প্রহসনের আয়োজন করে থাকে। কিছু ভোক্তা থাকে, আর থাকে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। নানান লোক দেখানো কথা হয়; কিন্তু আখেরে সিদ্ধান্ত হয় সরকার যা চায় তাই। প্রতিষ্ঠানটিকে ‘পাপেট’ বলেছি এজন্য যে এই প্রতিষ্ঠানটা এই মুহূর্তে জনাব তৌফিক ই ইলাহীর একটা পাপেট হিসাবে কাজ করছে।

গত ১৬ জুলাই এমন এক প্রহসন আয়োজিত হয়েছিল যেখানে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বৃদ্ধি খুচরা পর্যায়ে হবে প্রায় ৫০ শতাংশ। এটা যদ্দুর মনে পড়ে গত এক বছরে অষ্টম মূল্যবৃদ্ধি। দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েই দেয়া হচ্ছিল প্রায়, কিন্তু এক ধূর্ত চিন্তা করে সেটা দেয়া হয়নি এতদিন।

পত্রিকায় দেখেছিলাম সরকারের পরিকল্পনা হল যেহেতু এটা রমজান মাস, তাই এই মাসে অনেকগুলো কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্র চালিয়ে মানুষকে একটু স্বস্তি দেয়া। আর এটা করতে পারলে ঈদের পর ‘নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ’ দেয়া হয়েছে – এই কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়া হবে। তাদের অনুমান মতে এতে জন-অসন্তোষ কম হবে।

কিন্তু এর মধ্যে আছে জনগনের সাথে ভয়ংকর প্রতারণা। মোটামুটি নিয়মিত বৃষ্টির কারণে ঠাণ্ডা আবহাওয়া এখন দেশে, তাই চাহিদাও অনেক কম – ‘নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ’ দেয়া যাচ্ছে মোটামুটি সহজে। দাম বাড়ানোর কিছুদিনের মধ্যে বৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে, চাহিদা আবার বেড়ে যাবে অনেক, তখন সেই চাহিদা পুরো মেটানোর জন্য যে পরিমাণ সময় কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো চালাতে হবে সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। আবার শুরু হবে লোডশেডিং; এই ফাঁকে বিদ্যুতের আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। আর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও তার দাম কি আকাশ ছোঁয়া উচিৎ?

বর্তমানের লোডশেডিংমুক্ত জীবন পেয়ে যারা অতি সুখে আপ্লুত হচ্ছেন, যেসব সরকার দল সমর্থক সরকারের গুনকীর্তন করতে করতে পেরেশান হচ্ছেন তাদের প্রতি ঐ নোয়াখাইল্যা প্রবচনটা পেশ করছি – ছাঁন দেই খুশি ওইচ্ছা, রোজায় আক করাইবো।

এই মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যক্তিজীবন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর ভয়ংকর হবে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ধ্বংস করে লুটপাটের যে মহোৎসব চলছে সেটার মূল্য আমাদেরকে আর কী কী দিয়ে যে দিতে হবে! আর সবচাইতে মর্মবেদনার কথা হচ্ছে এসবই হচ্ছে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে (কারণ এই মন্ত্রণালয় তাঁর অধীনে)।

পত্রিকার রিপোর্টে দেখেছি ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ মন্ত্রীরা বলেছেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ নিয়ে কথা বলা যায় না; প্রধানমন্ত্রী নাখোশ হন। কথাই যেহেতু বলা যায় না, বিদ্যুৎ সেক্টরের সব ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে মাথায় নিয়ে যে বিদ্যুৎমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিৎ সেই কথা কেউ বলবে এটা আশা করা বাতুলতা। যদিও আমার মত নাদান সেই বাতুলতাটা করেছিল আগের একটা পোস্টে –
বিদ্যুৎমন্ত্রীর (পড়ুন প্রধানমন্ত্রী) পদত্যাগ চাইছে না কেন কেউ?