ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আবার এলো আরেকটি ১৫ আগস্ট। আবার এলো একজন মানুষকে একপক্ষের দিক থেকে দেবতা বানানোর, আর আরেক পক্ষ থেকে ‘কিছু না’ বা ‘শয়তান’ বানানোর উৎকট খেলা। এখন যেহেতু আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তাই এই দেবত্ব আরোপের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে অনেক আগে – আগস্টের শুরু থেকেই। টিভির খবরে আর পত্রিকায় দেখি সরকারের মন্ত্রী আর সরকারী দলের নেতাদের প্রতিযোগীতা – কে কার চাইতে বড় ‘মুজিব সেনা’?

জানি এটুকু পড়েই কেউ আমাকে স্বাধীনতা বিরোধীদের দোসর, আবার কেউ হয়তো সরাসরি ‘জামাতি’ বলে ফেলেছেন – মন্তব্যেও হয়তো লিখে ফেলবেন একটু পরেই (ওগুলো অবশ্য আমার গায়ে লাগে না)। তাঁরা যুক্তি দেবেন জাতির পিতা, হাজার বছরের শেষ্ঠ বাঙালী, বঙ্গবন্ধু (এই খেতাবগুলো দেখলে পীর দের নামের আগে দেয়া খেতাবের কথা মনে হয়) শেখ মুজিবুর রহমান তো আসলেই ‘দেবতা’; তাঁকে দেবতা বানানোর চেষ্টায় আমার গাত্রদাহ হয় কেন? একটা কথা স্বীকার করে নেই, শুধু তিনি কেন, যে কাউকেই দেবতা বানানোর চেষ্টা দেখলেই আমার গাত্রদাহ হয়। কেন হয় সেই কথা বলছি পোষ্টের শেষে।

আমার জন্মই হয়েছে মুজিব এবং তাঁর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে। তবে বেড়ে ওঠার সময় থেকে আজ অব্দি পরিচিত মহলে আলোচনার সময় দেখি একটি পক্ষ তাঁকে এমন এক দেবতা বানানোর চেষ্টা করে যায় যিনি যা করেছেন তাই ছিল সঠিক, কোন ভুল-ভ্রান্তি তাঁর ছিল না। এ আবার এক নতুন কিসিমের দেবতা – পৌরণিক দেবতারা কিন্তু কখনো কখনো ভুল করতেন; কিন্তু ‘দেবতা মুজিব’ ছিলেন ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে! এই পোস্ট লিখাতে শুরু করার আগে আমাদের ব্লগে ১৫ আগস্ট নিয়ে লিখা কিছু পোস্টে চোখ বুলিয়ে দেখলাম সেই একই চিত্র।

আমি জানি একটা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতাটি যখন তাঁর শিশুপুত্রটি সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তখন মানুষের আবেগ লাগামহীন হতে পারে। কিন্তু সেটা কতদিন চলবে? বা চলা উচিৎ? সত্যিকারের শোকও কি জীবন্ত থাকে এতদিন? থাকতে পারে? না পারে না। তাহলে চারদিকে এতো শোকের, কান্নার রোল কেন? অনুমান করি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই শোক কর্তব্য দেখানোর, এই কান্না স্বার্থসিদ্ধির। ঢাকার রাস্তায় ছেয়ে যাওয়া কাল ব্যানারে দেখি লিখা আছে – “কাঁদো বাঙালী কাঁদো” – দেখি প্রতি বছরই। কিছুটা কাব্যিকভাবে বলা হলেও বাক্যটির মধ্যে বাস্তব পরিস্থিতির একটা ইংগিত রয়েই গেছে।

চারদিকের এসব দেখে মনে পড়ল একজন ‘মানুষ’ নেলসন ম্যান্ডেলার কথা। কিছুদিন আগে দক্ষিন আফ্রিকার Sunday Times পত্রিকাকে তিনি বলেছিলেন –
“One issue that deeply worried me in prison was the false image I unwittingly projected to the outside world; of being regarded as a saint”।
তারপর দিয়েছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত ঘোষণা –
“I never was one, even on the basis of the earthly definition of a saint as a sinner who keeps trying.”
তাঁর লিখা “Conversations With Myself” বইটিতে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং কর্মজীবনের নানা ভুলভ্রান্তির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তো সন্ত না হবার এই ঘোষণা, আর জীবনের নানাদিকের ভুলের এই স্বীকৃতি কি নেলসন ম্যান্ডেলার মহত্ত্বকে খাট করেছে? অনেকে ভাববেন নিশ্চয়ই – তিনি কি ভীষণ বোকা; সারা পৃথিবীর সামনে সন্ত হবার সুযোগ পেয়েও হেলায় হারালেন!

এবার একটু বুদ্ধের কথা। স্বয়ং বুদ্ধের দেখা পেলে কী করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে বৌদ্ধ মতবাদের লিন-চি ধারার এক পণ্ডিত নবম শতকের দিকে তাঁর শিষ্যদেরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন “যদি বুদ্ধের দেখা পাও, তাঁকে হত্যা কোরো”। কারো বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় যে কথাটা প্রতীকী – এটা আসলে কোন বড় ব্যক্তিত্বের সামনে গিয়ে ভক্তিতে অন্ধ না হয়ে গিয়ে স্বাধীন চিন্তা ধারণ করার গুরুত্ব বোঝাতে ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর শিক্ষাকে যেন সবাই সামনে রাখে। এটা আসলে বুদ্ধেরই শিক্ষা।

বুদ্ধ কিন্তু আজীবন কাল্টের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন, সংগ্রাম করে গেছেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন নিজেকে শিষ্যদের আগ্রহ, মনোযোগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। সবসময় তিনি শিষ্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর জীবন বা ব্যক্তিত্ব নয়, গুরুত্বপূর্ন হল তাঁর শিক্ষা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন মানুষ যখন কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আর তাঁর জীবন নিয়ে মেতে ওঠে তখন মানুষ অনিবার্যভাবেই সেই ব্যক্তির শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়।

ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছে মুজিবের ক্ষেত্রে। তাঁকে নিখুঁত, নির্ভুল ‘দেবতা’ মনে করার মত মুর্খ আমি নই – তিনি দোষে গুনে স্রেফ একজন মানুষই ছিলেন। কোন সন্দেহ নেই, ভুল এবং ব্যর্থতার সাথে অনেক চমৎকার গুনও ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর জীবন থেকে (বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসার আগে) প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মীর শেখার আছে অনেক কিছু। কিন্তু সেটা কি করে কেউ?

তাঁকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে (বা কাঁদার অভিনয় করতে করতে), শোকের গান গাইতে গাইতে, গগন বিদারী আওয়াজে মাইকে ৭ই মার্চের ভাষণ বাজাতে বাজাতে, বক্তৃতা করতে করতে, কালো কাপড়ে সারা দেশ ছেয়ে ফেলতে ফেলতে, তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক দিতে দিতে, তাঁকে মরণোত্তর তোষামোদে ভাসাতে ভাসাতে, দেবতা বানানোর চেষ্টা করতে করতে সেই সব শিক্ষার ধারেকাছেও কেউ নেই। এমনকি তাঁর হাতে পত্তন হওয়া ‘ডাইনেষ্টি’র বর্তমান অধিকর্তী তাঁর কন্যাও তাঁর আদর্শ, শিক্ষার আশে-পাশেও নেই।

কোন সন্দেহ নেই ‘মানুষ মুজিব’ এর হত্যা আমাদের ইতিহাসের এক ভয়ংকর মর্মান্তিক ঘটনা। তবে চারদিকের উৎকট সব কর্মকাণ্ড আর ডামাডোলের মধ্যে আমার এখন মনে হয় একটা ‘হত্যা’ করা আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে – সেটা হচ্ছে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের কারণে তৈরি করা ‘দেবতা মুজিব’ কে ‘হত্যা’ করা। ‘দেবতা মুজিব’কে হত্যা করে যদি ‘মানুষ মুজিব’কে, ‘প্রকৃত মুজিব’কে এই দেশের মানুষের সামনে নিয়ে আসা যেত! এবারের ১৫ আগষ্টে কি আমরা ‘দেবতা মুজিব’ কে ‘হত্যা’ করার শপথ নিতে পারি না?