ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বুয়েট নিয়ে কিছুদিন আগে একটা একটা পোস্ট লিখেছিলাম – বুয়েটের ‘মিস্ত্রী’দের ‘হিংসা’ করি না আর। আজ আবার একই বিষয় নিয়ে একটা পোস্ট লিখার মত পরিস্থিতি হবে এটা ভাবিইনি – ভেবেছিলাম সব দিকের, বুয়েটের ভেতরের, বাইরের চাপের ফলে ঐ প্রতিষ্ঠানের ভিসি আর প্রো-ভিসির পদত্যাগের মাধ্যমে এই সঙ্কটের সমাধান হবে। না, সেটা হয়নি – আমি আসলেই বোকা; না হলে আমার এমন ভাবার কথা ছিলই না।

বেশ কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া এবং রমজানের আগে অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলনের দাবির প্রতি অবশ্য সরকার বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে শুরু থেকেই। শুধু বুড়ো আঙুলই নয় আন্দোলনকারীদেরকে হাইকোর্টও দেখানো হল – আন্দোলনকারী শিক্ষকদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা এল, সাথে এলো ক্লাসে যোগ দেয়ার নির্দেশ। না, এতে সমাধান হল না – প্রমাণ হল সব কিছুতে হাইকোর্ট দেখিয়ে ফায়দা হয় না (কথাটা কি আদালত অবমাননা হয়ে গেল?)।

ঈদের আগে দেখেছি সরকারের পক্ষে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বুয়েটের সাবেক শিক্ষক, সাবেক ভিসি, সাবেক ছাত্রদের সংগঠনের (অ্যালামনি এ্যাসোসিয়েশন) নেতাদের নিয়ে আলোচনা করছেন। ওটাকে অবশ্য আলোচনা বলাটা ঠিক হল না – ওটা আসলে ছিল আলোচনা করার ভান। কারণ সরকার ভিসি আর প্রো-ভিসিকে তাঁদের পদে বহাল রাখার কথা শক্তভাবে জানিয়ে দেয় ঐ প্রতিনিধি দলকে। নানা দাবীর পর ভিসি আর প্রো-ভিসির পদত্যাগ করার অবস্থানে চলে যাওয়া বুয়েটের ৯০ শতাংশ ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীরা স্বাভাবিকভাবেই এই প্রস্তাব মেনে নেয়নি।

কয়েকদিন আগে ঐ বৈঠকে অংশ নেয়া বুয়েট অ্যালামনি এ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছেন ঐ দুই ব্যক্তিকে পদে রেখে বুয়েট সংকটের সমাধান হবে না কোনভাবেই। ঐ সংগঠনেরই মহাসচিব স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন নিয়মিত টিভি টক শো গুলোতে দিনের পর দিন এসে বলে গেছেন ঐ দুইজনের পদত্যাগ ছাড়া বুয়েট সংকটের সমাধান হতে পারে না কোনভাবেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা? নাকি সরকার ভেবেছে আনন্দে ঈদ করে দীর্ঘ ছুটির পর এসে ছাত্র-শিক্ষক সবাই সব ভুলে গিয়ে সুড়সুড় করে ক্লাস করতে শুরু করবে!

তবে এই আন্দোলনের সময় সরকার অন্তত একটা ব্যাপারে ধন্যবাদ পেতে পারে – এই আন্দোলনকে ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের ষড়যন্ত্র’ বলেনি তারা। এমনকি জোর গলায় এটাও বলতে চায়নি যে এটা বিএনপি-জামাতের এক স্যাবোট্যাজ। আসলে নির্লজ্জতার ও একটা সীমা হয়তো আছে। কারণ আন্দোলনরত বুয়েটের শিক্ষক সমিতির নেতৃস্থানীয় প্রায় সব শিক্ষকই আওয়ামী লীগ পন্থী।

গতকাল বুয়েটের ভিসি প্রো-ভিসি অপসারণের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা সর্বাত্মক আন্দলনে নেমেছে, শিক্ষকরাও যোগ দিয়েছেন তাদের সাথে। কাল এক পর্যায়ে শিক্ষকদের একটা দল ভিসির সাথে দেখা করে তাঁকে বুয়েটের স্বার্থে পদত্যাগের আহ্বান জানালে তিনি সাফ জানিয়ে দেন নিয়োগকর্তা না বললে তিনি পদত্যাগ করবেন না কোনভাবেই। টিভি তে তাঁর এই কথা শুনে অবাক হলাম – নিয়োগকর্তা না বললে পদত্যাগ করা যায় না! কেউ কি করেনি কোন কালে?

কাল পরে ছাত্রছাত্রীরা তাঁর বাসার সামনে অবস্থান করেন এবং আজ সকাল দশটা পর্যন্ত পদত্যাগের আল্টিমেটাম বেঁধে দেন। এই লিখা যখন পোস্ট করছি তখন পর্যন্ত তেমন কোন আলামত ছিল না। বরং তাঁদের আন্দোলনে পুলিশের বাধা এসেছে। অবাক লাগে দুইজন ব্যক্তির জন্য বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটির এই অবস্থা, অথচ ঐ দুই ব্যক্তি যাঁরা ঐ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন, তাঁরাও প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে একটু নমনীয় হচ্ছেন না। কী ভয়ংকর নির্লজ্জের মত পদ আঁকড়ে পড়ে আছেন! অবাক লাগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিসি পদ থেকে আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত, পাঁচিল টপকে পালানো মানুষটি আবার কীভাবে বুয়েটের মত প্রতিষ্ঠানের ভিসি হয়!

বুয়েট নিয়ে সরকার আর ঐ দুই ব্যক্তির জেদ দেখে জেদের ভাত কুত্তারে খাওয়ানো নিয়ে বাংলা কথ্য প্রবাদটার কথা মনে পড়ে গেল। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এই দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি সরকার আর দুজন ব্যক্তির জেদের কারণে মহাসঙ্কটের মুখে। ক্লাস হচ্ছে না বহুদিন; নতুন বর্ষের ভর্তির কাজ শুরু করা যায়নি এখনও। প্রশ্ন হল এই অবস্থা আর কতদিন চলবে? জেদের ভাত আর কতদিন কুত্তারে খাওয়ানো হবে?

প্রশ্ন আসতে পারে বুয়েট নিয়ে এতো মাতামাতি কেন? কোন সন্দেহ নেই বুয়েটের ভিসি আর প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তার চাইতে অনেক বড় সব অভিযোগ আছে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে – অগুলো ওখানে ডাল ভাত। কিন্তু এটাই বুয়েটের স্বকীয়তা; আমাদের আর সব সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের পচে যাওয়ার মধ্যেও বুয়েট ছিল আশ্চর্য ব্যতিক্রম। সবক্ষেত্রে চমৎকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে এটা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটা বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছিল। সেটা আমাদের সরকারের ভাল লাগবে কেন? এমন হলে তো ঐ প্রতিষ্ঠানে তাদের তৃতীয় শ্রেনীর চ্যালা চামুন্ডাদের দিয়ে যাচ্ছেতাই করানো যায় না।

আর বুয়েটের ক্ষেত্রে সরকারের আচরণ এটাও প্রমাণ করে এই সরকার কতোটা ফ্যাসিবাদী হয়েছে! শুধু নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখাতে বুয়েটের সাথে সরাসরি জড়িত, এমনকি সারা দেশের অসংখ্য সচেতন মানুষের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে সরকার। আমি ভীষণভাবে শঙ্কিত যে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে এই সরকার আর দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে ছাড়বে। কোথায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বুয়েটের মানে নিয়ে যাবার চেষ্টা করব আমরা; তা না করে ওটাকেই নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আমরা অন্য সবগুলোর কাতারে!

আমি মনে করি দল মত নির্বিশেষে সব সচেতন মানুষের উচিৎ বুয়েটের পাশে দাঁড়ানো; বুয়েটকে রক্ষা করা যে কোন মূল্যে। আমাদের জাতির এই চমৎকার গৌরবটিকে কোন এক ব্যক্তির (হোউক তিনি প্রধানমন্ত্রী) স্বেচ্ছাচারিতায় ধ্বংস হতে যেন না দেই আমরা। আর বুয়েটের ভিসি প্রো-ভিসির কাছে আমাদের আহ্বান তাঁদের প্রভু বলুক না বলুক তাঁরা যেন দ্রুত পদত্যাগ করেন, এতে বুয়েট যেমন বাঁচবে তাঁরা পেয়ে যাবেন প্রধানমন্ত্রীর ‘দেশপ্রেমিক’ খেতাব। দূর্নীতির জন্য পদত্যাগী আবুলকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছে স্পষ্ট করেছেন দেশপ্রেমের সংজ্ঞা তাঁর কাছে কী। তাই বুয়েটের ঐ দুই ব্যক্তি পদত্যাগ করলে অনায়াসে প্রধানমন্ত্রীর ঐ খেতাব পাবেন, এটা আশা করাই যায়। আর ভিসি তো এবার করলে দুইবার পদত্যাগ করা হবে মানে তিনি হবেন ‘ডাবল দেশপ্রেমিক’।

বুয়েটের মাননীয় ভিসি, প্রো-ভিসি পদত্যাগের ব্যাপারটাকে কি এভাবে একটু ভেবে দেখা যায় না? এতে পদটা হয়তো ত্যাগ করতে হবে, কিন্তু গলায় জ্বলজ্বল করবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘দেশপ্রেমিক’ এর মেডেল।