ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

প্রিয় বিডি ব্লগে ফিরে আসলাম। জানি ‘প্রিয়’ শব্দটা নিয়ে আপত্তি করাই যায়। প্রশ্ন আসতেই পারে, ব্লগটা যদি প্রিয়ই হবে তবে এত দীর্ঘ বিরতি কেন (বিরতিটা পাঁচ মাসের – আমার সর্বশেষ পোস্ট ছিল ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১২)?

এই ব্লগে লিখতে শুরু করেছিলাম ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১১। যথেষ্ট নিয়মিত ব্লগিং করে হঠাৎই একটা বিরতি পড়ল এক বছরের মাথায় এসে। কিছু পেশাগত আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারনে ভেবেছিলাম কিছুদিনের একটা বিরতি নেব। নিয়েছিলামও, কিন্তু সেটা আরেকটা কারণে এসে ঠেকল পাঁচ মাসে। অবশ্য ব্লগে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আরও মাস দেড়েক আগে। কিন্তু একটা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি। কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম গত দেড় মাস, সেটা নিয়ে লিখব কিছুদিন পরে (কারণটি ‘বিবাহ’ নয় অবশ্য)।

ব্লগে লিখতে শুরু করার মাস দুয়েক পর থেকেই মাঝে মাঝেই মনে হত, কেন লিখি? আদৌ কী কিছু হয় লিখে? এটা কি কিছু ‘হতে চাওয়া’ লেখকের লিখালিখির হাত পাকানোর প্রাথমিক প্ল্যাটফরম? এখনো টিভি টক শো তে এখনো ডাক না পাওয়া ভবিষ্যৎ ‘সুশীল সমাজ’ এর মিলনমেলা? অথবা ব্লগ ‘সামাজিক মিডিয়া’র মতই আরেকটা জায়গা যেখানে ঝগড়াঝাটি আর পিঠ চাপড়াচাপড়ি করে কিছুক্ষন সময় কাটানো যায়? নাকি নিজের অপছন্দের কিছু দেখে সেটা নিয়ে লিখে নিজেকে কিছু প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা? লিখে সমাজ পাল্টানোর মত কিছু দ্বিবাস্বপ্ন দেখা?

এক বছরে ‘ব্লগার’ পরিচয়টা হয়েছে ভালভাবেই। ব্লগের সহব্লগাররা এবং অতিথি পাঠকরা প্রশংসা করেছেন (কিছু সংখ্যক বকাঝকা আর গালাগাল বাদে)। ব্লগিং করি, এটা অনেক পরিচিত মানুষকে জানাইনি, কিন্তু তাঁরা অনেকেই এমনিতে ব্লগ পড়তে গিয়ে আমার লিখা পড়েছেন আর অনুযোগ করেছেন আমি কেন তাঁদেরকে আমার লিখালিখির কথা জানাইনি। আর হ্যাঁ করেছেন প্রশংসাও। কিন্তু একজন নিছক ব্লগার হবার আশায় ব্লগে লিখতে আসিনি।

হতে পারে দ্বিবাস্বপ্ন, কিন্তু দেখেছি – চারদিকে ক্রমাগত আলোচনা হতে হতে আপামর মানুষ সচেতন হয়ে উঠবে। ভেবেছি মানুষ বুঝে উঠবে আমাদের যাবতীয় অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যা, বৈষম্যের মূল হল আমাদের ‘বড় দল’ গুলোর ব্যক্তিগত আখের গোছানোর নোংরা রাজনীতি। স্বপ্ন দেখেছি এভাবে ধীরে ধীরে অত্যাবশ্যকীয় একটা কল্যাণমুখী রাজনৈতিক ধারার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে মানুষের মধ্যে। তারপর একদিন ………

কিন্তু আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করে দেখেছি পত্রিকায় লিখা হচ্ছে, মানুষ পড়ছে; টিভিতে টক শো হচ্ছে, মানুষ দেখছে খুব। আর হালের ব্লগ তো আছেই। কিন্তু কি হয়েছে তাতে? পরিস্থিতি কি বদলেছে? হ্যাঁ বদলেছে – খারাপের দিকে গেছে, যাচ্ছে ক্রমাগত। তো এসব করছি কেন আমরা? একজন ‘সচেতন মানুষ’ এর সিল গায়ে লাগানোর জন্য?

আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় ব্লগে লিখালিখি করে কোন প্রকৃত লাভ হয়ই না, হয় কিছু মানুষের ব্লগার হিসাবে পরিচিতি, খ্যাতি। জানি, লিখা কোনদিন পরিবর্তনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দেয় না। তবে বিশ্বাস করতাম (এখনও হয়ত কিছুটা করি) লিখালিখি পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরিতে সাহায্য করে। কিন্তু ব্লগে লিখতে এসে দেখলাম কেউ সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বিষয়ের মত বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে পোস্ট দিলে সুস্থ বিতর্কের জায়গাটিও থাকে না। এতটাই অসহিষ্ণু আমরা!

আসি শিরোনামের প্রসঙ্গে। এটা নেয়া হয়েছে কবীর সুমনের একটা গান ‘বসে আঁক’ এর শেষ অংশ থেকে। এখানে পর পর দুটো লাইন এরকম ‘আমিও ভণ্ড অনেকের মত; গান দিয়ে ঢাকি জীবনের ক্ষত’। দ্বিতীয় লাইনটার বক্তব্য নিয়ে আমার আপত্তি আছে – গান দিয়ে জীবনের ক্ষত ঢাকা যায় না; বড়জোর জীবনের ক্ষত দেখে নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া ক্ষত ঢাকার চেষ্টা করা যায়। আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে আমিও কি ঠিক এটাই করতে চাইছি না? চারদিকের নানা সামাজিক রাজনৈতিক সঙ্কট দেখে নিজের ভেতরে তৈরি হওয়া ক্ষতের উপশম করতেই ব্লগ লিখি না তো (যেহেতু গান লিখতে পারি না)? যখন আমি জানি (কিছুটা সন্দেহ এখনো আছে) ব্লগ লিখে সম্ভবত সত্যিকারের কাজের তেমন কিছুই হয় না।

নিজেই আবার ভাবি, মানলাম লিখে তেমন কিছু হয় না, হবে না, কিন্তু না লিখেও বা কি হয়? বরং অতি সামান্য হলেও লিখেই কিছুটা হবার সম্ভাবনা আছে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আবার লিখতে শুরু করি। এই একটা ব্লগেই লিখি, তাই এই ব্লগটার প্রতি একটা আবেগের জায়গাও তো তৈরি হয়ে আছে বহুদিন ধরেই। আর কে না জানে, আবেগ থাকলে অনেক সময়ই যুক্তি হয়ে পড়ে অকার্যকর।