ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কলম যুদ্ধ আর শেষ কিছুদিন রাজপথে যুদ্ধ করার মাশুল রাজিব সবচাইতে খারাপভাবেই দিলেন। রাজিবের মৃত্যু নিয়ে, তার মৃত্যুতে শোক নিয়ে, প্রেরণা নিয়ে বেশ কিছু পোষ্ট এসেছে এই ব্লগে, অন্যসব ব্লগেও। টিভি, পত্রিকা, ফেইসবুক সবকিছুই রাজিবময় হয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই। আমি এই ব্যাপারে আর নতুন কিছু লিখছি না। পোষ্টের শুরুতে এই মহান মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। লিখতে যাচ্ছি এই ব্যাপারে আমাদের জমাজের মানুষদের খুব মর্মান্তিক একটি মানসিকতা নিয়ে।

এই মুহুর্তের টক অব দ্য কান্ট্রি হল ব্লগার রাজিবের মৃত্যু। তাত্ত্বিক কথা বলতে যাচ্ছি না যে তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না যে কে এই খুনের সাথে জড়িত। এটা জামত-শিবিরের কাজ এটা না বোঝার মত বোকা কেউ নয়। তবে আমি এই হত্যার পেছনে জামাত-শিবিরের দায় নিয়ে লিখতে যাচ্ছি না। আমি লিখতে যাচ্ছি এই হত্যাকাণ্ডের পর জামাত-শিবিরের একটা কৌশল নিয়ে।

হত্যাকান্ডের পর পরই তাদের কর্মীরা ব্লগে আর ফেইসবুকে প্রচারণা চালাতে থাকে যে রাজিব ছিলেন একজন স্বঘোষিত নাস্তিক। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে ব্লগে অনেক পোস্ট লিখেছেন। মুসলিম পরিবারে জন্মে নাস্তিক হয়ে যাওয়া মানে তিনি একজন মুরতাদ হয়ে গেছেন। তাই তার জানাজা পড়া ভীষণ পাপের ব্যাপার হবে। ইসলাম ধর্ম মতে এই দাবী সঠিক না ভুল, সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে এটা গতকাল প্রমাণিত হয়েছে যে তাদের ওই প্রচারণা অন্তত প্রাথমিকভাবে হালে পানি পায়নি – অসংখ্য মানুষ প্রানের টানে কাল চলে গিয়েছিলেন রাজিবের জানাজায়।

পরশু রাজিবের জানাজায় মানুষের ঢল দেখে ভীষণ ভাল লেগেছিল যে মানুষ ওদের ওই প্রচারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছে যে এই সময়টা অন্তত এসব ফালতু আলোচনা করে সময় নষ্ট করা আর আন্দলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার সময় নয়। জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে একজন প্রচন্ড প্রতিবাদী মানুষকে আপামর জনসাধারণ শেষ বিদায়ের সময় প্রাপ্য সন্মানটাই দিয়েছে।

আজকের এই পোস্টটি লিখতে ইচ্ছে হল আমার পরিচিত কিছু মানুষের কাছে কিছু কথা শুনে। চারদিকে নাকি অনেক মানুষ রাজিবের প্রতি সহানুভূতি হারিয়েছেন যখন জানতে পেরেছেন তিনি নাস্তিক ছিলেন। যদিও এদের মধ্যে অনেকেই জামাত-শিবির বিরোধী। আমি একজনকে এমন মন্তব্য করতেও শুনেছি যে রাজিবের মৃত্যু নাকি একদিক থেকে ইসলামের জন্য ভালই হয়েছে – বেশ কিছু মানুষ নাকি তার লিখার প্ররোচনায় নাস্তিক হয়ে যেতে পারতো।

অভিযোগ আসছে যে রাজিবের নামে ফেইক আইডি খুলে অনেক বাজে পোস্ট তার নাম দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে। নাস্তিকতা ভাল, নাকি খারাপ, খারাপ হলে কতটা খারাপ সেই তর্কে যাওয়া এই পোস্টের উদ্দেশ্য না (সেটা ভিন্ন একটা আলোচনা)। আমার এই পোস্টের আলোচনার সুবিধার জন্য ধরে নিলাম ওই সব পোস্ট রাজিবেরই লিখা আর নাস্তিক্য খুব খারাপ জিনিষ। ধরে নিলাম ব্লগার রাজিবের এই একটা দিক খারাপ ছিল। কিন্তু এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার – তিনি তো কারো কোন অধিকার নষ্ট করেননি! তিনি তো কাউকে ঘাড় ধরে তার নাস্তিকতার পোস্ট পড়াননি! তো কোন মানুষের একটা দিক খারাপ হওয়া মানেই তার অন্যদিকের অন্যসব অর্জন শেষ হয়ে যাবে?

মনে পড়ে যাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের কথা – শাওনকে বিয়ে করার পর তার উপন্যাসের ভক্ত বেশ কিছু মানুষকে দেখেছি তার উপন্যাস পড়া বাদ দিতে। ব্যক্তিগত একটা অপছন্দের কাজকে আলাদা করে একজন মানুষের অন্যদিক নিয়ে আমরা তার মূল্যায়ন করতে পারবো না আমরা? এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এতোটুকু আধুনিক ও কি আমরা হয়ে উঠবো না? বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে যাচ্ছি মুড়িমুড়কির মত, আর নিজেদেরকে দাবী করছি ‘শিক্ষিত’ হিসাবে! ‘পাশ ‘ দিলেই যে শিক্ষিত হয়ে যাওয়া যায় না, সেটা আবার প্রমাণ পেলাম আবার – এই ঘটনায়। খুব দুঃখ পেয়েছি দেখে যে রাজিবকে নিয়ে জামাত-শিবিরের এই নোংরা কৌশল টা কিছু ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে।

অথচ জামাত-শিবির আর নেহায়াত রাজাকার ছাড়া রাজিবের মৃত্যুতে শোকাহত হবার কথা সবার, তার মৃত্যুতে একইসাথে গৌরবান্বিত হবার ও কারণ আছে – এদেশের তরুণেরা এইদেশকে গড়ে তোলার সংগ্রামে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও নামবে, জীবন দেবে। অপেক্ষা শুধু একটা কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দলের।

শিরোনামের কথায় আসি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু উপন্যাসের এক পর্যায়ে গ্রামের মোদাব্বের মিয়ার ছেলে আক্কাস গ্রামে স্কুল দিতে যায় যেটা মজিদের কাছে খুব খারাপ মনে হয়। গ্রামে মক্তব থাকার পরও স্কুল বানানোর চিন্তা মজিদকে সঙ্কিত করে তোলে। মজিদ তখন এটা নিয়ে শালিস বসায়। আক্কাস প্রস্তুত ছিল যে কোন ধরনের প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য। কিন্তু শালিস শুরু হবার সাথে মজিদ হঠাৎ করে আক্কাসকে শুরুতেই প্রশ্ন করে “তোমার দাড়ি কই মিয়া?” হঠাৎ করে মজিদের এমন ধূর্ত প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় আক্কাস। সব দাড়িওয়ালা মানুষদের মধ্যে বসে থেকে মুসলমানের ছেলে মুসলমান আক্কাস শুরুতে এমন ধাক্কা খেয়ে পরে আর পেরে ওঠেনি – স্কুল স্থাপনের স্বপ্ন তাকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল। রাজিবের ক্ষেত্রেতো আরো বড় কারণ আছে, নাস্তিকতা – না থাকলে জামাতিরা হয়তো রাজিবকে দাড়ি নিয়েই প্রশ্ন করতো – রাজিবেরও দাড়ি ছিল না।

মূল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে মানুষকে ‘সাইজ’ করার কি অসাধারণ ‘সৃজনশীল’ পথ দেখিয়ে গেছে মজিদ! অবাক হয়ে দেখলাম ওটা কী চমৎকারভাবে কাজ করল অনেক মানুষের ক্ষেত্রেও! এই যুগেও!

জামাত-শিবির তাদের নোংরা ‘রাজনীতি’র স্বার্থে যাবতীয় নোংরা কাজ করবে, কৌশল নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের একটু চোখ কান খোলা রাখতে হবে, তাদের ফাঁদ বুঝতে হবে আর সেটাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে ঘৃণাভরে। অত্যন্ত মহৎ একটা কারণে কাজ করতে গিয়ে রাজিবকে তার সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ, জীবনই উৎসর্গ করে দিতে হল। এখন এটাই হওয়া উচিৎ আলোচনার একমাত্র বিষয়, বাঁকি সব বিষয় নিয়ে আলোচনা একেবারেই অবান্তর, একেবারেই ফালতু।