ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
images

আজ আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যেই নিশ্চয়ই শহীদ মিনারে শোকাবহ পরিবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গেছে শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা নিবেদন। এই দিনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, জাতীয় জীবনে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে, বাংলা ভাষার প্রতি আবেগ দেখিয়ে, বাংলা ভাষার সঙ্কট-সম্ভাবনা নিয়ে নানা কথা বলা হয়, লিখা হয়। আমি আর ওসব নিয়ে লিখছি না – শিরোনামই বলে দিচ্ছে আশা করি, আমার এই পোস্টটি একটু ভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখা।

শুরুতে আজকের প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। পৃথিবীতে সম্ভবতঃ আর কোন জাতি নেই যারা রক্ত দিয়ে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এটা এখন পেয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যপ্তিও – আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এখন এটি। আমাদের মাতৃভাষার আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দে যখন আমরা দিশেহারা, ঠিক তখনই সেই আনন্দের নীচে যে এই দেশেরই অনেক মানুষের মাতৃভাষার অধিকার চাপা পড়ে আর্তনাদে পরিণত হয়েছে সেই খবর আমরা বাঙালীরা আর রাখি না। আমাদের স্বার্থ সিদ্ধি হয়ে গেছে না? এই বিষয় নিয়ে গত বছরের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তে একটা পোস্ট লিখেছিলাম, প্রাসঙ্গিক হওয়ায় তার লিঙ্কটা এখানে দেয়া হল – আদিবাসীদের মাতৃভাষার অধিকারঃ রাষ্ট্র যখন ভাষা পীড়নকারী

অনেক জাতির অনেক বড় বড় অর্জন এসেছে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অনেক সময়ই সশস্ত্র সংগ্রাম না হলেও অহিংস, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনেও রক্তপাতের ঘটনা ইতিহাসে মোটেও বিরল ঘটনা না। আমাদের দেশের ইতিহাসেও দুই ধরণেরই উদাহরণ আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হল একেবারে একটি সশস্ত্র সংগ্রাম এর উদাহরণ, আর ভাষা আন্দোলন হল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে রক্তপাতের উদাহরণ। এখন প্রশ্ন হল রক্তপাত হওয়া মানেই কি কোন অর্জনের দিন শোকের হয়ে যাবে?

বেড়ে ওঠার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেত যে আমাদের কিছু বীর সন্তানের রক্ত ঝরেছিল বলেই কি ২১ ফেব্রুয়ারীকে শোক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে? বুকে কাল ব্যাজ (হালে ফ্যাশন হাউজগুলোর ডিজাইন করা কালো রং প্রাধান্য দেয়া পোশাক), আর জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখতে হবে?

ভাষা আন্দোলনের আত্মোৎসর্গকারী মানুষের সংখ্যা কত? সাকুল্যে ৬/৭ জনের বেশী তো না। আর আমাদের মুক্তি সংগ্রামে মারা গেছেন ৩০ লক্ষ মানুষ, ধর্ষিত হয়েছেন প্রায় তিন লক্ষ নারী। তাহলে তো আমাদের স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসকে পালন করা উচিৎ ‘মহা শোক দিবস’ হিসাবে। কিন্তু না, আমরা সেই দিনগুলোকে পালন করি আনন্দের দিন, উৎসবের হিসাবে। হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই ভুলে যাই না আমাদের স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারীদেরকে। আমি জানি সেই মানুষদের পরিবার তাঁদেরকে ওই দিনে আমাদের চাইতে আরো অনেক বেশী স্মরণ করেন, কষ্ট পান। কিন্তু অনুমান করি ওই স্মরণের মধ্যে দুঃখবোধকে ছাপিয়ে জেগে ওঠে দারুন গর্ব, আনন্দ – তাঁদের স্বজনেরা একটা মুক্ত (স্বাধীন নয়) রাষ্ট্র, জাতি পাবার স্বপ্নে জীবন দিয়েছিলেন। এবং সেটাকেই স্বাভাবিক বলে মনে করি আমি।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ২১ শে ফেব্রুয়ারি দিনটির গুরুত্ব অসীম। ইতিহাসবিদ, বিশ্লেষকরা বলেন, আমাদের স্বাধীকার চেতনার বীজটি রোপিত হয়েছিল ওই দিনই। যেটা বছর বিশেক পরে পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতার প্রকান্ড মহীরুহতে। তো সেই অসাধারণ অর্জনের দিনটিকে কেন আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা ‘শোক দিবস’ এর গন্ডীতে বেঁধে রাখবো। আমি বিশ্বাস করি ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে আত্মোৎসর্গকারী সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার-শফিউরেরা তাঁদের আত্মোৎসর্গের প্রাথমিক অর্জন (মায়ের ভাষার প্রতিষ্ঠা) আর সুদূরপ্রসারী অর্জন (আমাদের স্বাধীনতা) দেখে সুখী বোধ করতেন – তাঁদের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ উৎসর্গ করেও তাঁদের চোখের কোণে দেখা যেত আনন্দাশ্রু।

আমি জানি না একুশে ফেব্রুয়ারির অসাধারণ গানটি আমাদের মধ্যে এমন শোকের আবহ নিয়ে আসে কিনা। ঐ গানটি শুনলে আমাদের মনে অসাধারণ অধিকার আদায়ের আনন্দকে ছাপিয়ে ওঠে ভাই হারানোর বেদনা। আমার মনে হয় আমাদের নতুন করে ভেবে দেখা উচিৎ ব্যাপারটা।

আমাদের শ্রেষ্ঠ জাতীয় অর্জনগুলোর মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এই দিনটি হোক আমাদের অসাধারণ অর্জনের আনন্দে উদ্ভাসিত। এই পৃথিবীর সব জাতির সামনে এটা আমাদের অসাধারণ আনন্দ দেয়া উচিৎ যে আমরা জীবন দিয়ে আমাদের অধিকার আদায় করতে পারি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের তরুণরা জীবন দিয়ে দেয়, অধিকার আদায় করে ছাড়ে। এমন একটি দেশের সন্তান হিসাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়েও আমি গর্বিত, আনন্দিত; শোকাহত নই।