ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বড়ই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় লইয়া খেয়াল করিতেছি, আমাদের এক অতি মান্য লোক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব রকিব আর তাঁর কমিশনের ক্রমাগত মুন্ডুপাত চলিতেছে টিভিতে, পত্রিকায়, আর বরাবরের ন্যায় ‘আজাইরা প্যাঁচাল’ চলিতেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ঘটনা ঘটিয়াছে গতকাল। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়া পরশু তাঁহারা সিদ্ধান্ত লইয়াছিলেন। সৈন্যরা নির্বাচনের দিন মাঠে থাকিবে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাঁহারা তাঁহাদের ভুল সংশোধন করিলেন। কোথায় একজন মানুষ ভুল স্বীকার করিয়া লইয়া তাহা সংশোধন করিয়াছেন বলিয়া তাঁহাদেরকে সাধুবাদ দেওয়া হইবে, উল্টো দুর্মূখ বাঙালি তাঁহাকে যাচ্ছেতাই সমালোচনা করিতেছে। এহেন দুর্দিনে তাঁহার নিয়োগকর্তা সরকার পর্যন্ত তাঁহার পক্ষে কথা বলিতেছেন না। প্রথম আলোর জবাবে ’৭২ থেকে ’৭৫ এর পাপের কাফফারা দিয়া দেশের সর্বাপেক্ষা বড় আওয়ামী লীগার বনিয়া যাওয়া হাসানুল হক ইনু নিতান্ত দায়সারা কথা বলিয়াছেন; সব দায় দিয়াছেন নির্বাচন কমিশনের উপরে। ইহা ভারী অন্যায়। সচেতন নাগরিক হিসাবে আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না, কলম (সরি কী বোর্ড) ধরিলাম তাঁহাদের পক্ষে।

পরশ্রীকাতর, পরছিদ্রান্বেষী বাঙালি নিয়োগের শুরুর দিন হইতেই জনাব রকিব আর তাঁহার কমিশনের সমালোচনায় মুখর হইয়াছে। যাহারা এই দেশে ‘আজিজ মার্কা’ নির্বাচন কমিশন দেখিয়াছেন, তাঁহারা কেন নতুন করিয়া অবাক হইলেন? আমি তো এই কমিশনকে আজিজ কমিশনের চাইতে বেশি কিছু খারাপ দেখিতেছি না। কী দারুণভাবেই না তিনি সরকারের নির্দেশমত স্বাধীনভাবে কমিশন চালাইতেছেন!

রীতিমত সার্চ কমিটি গঠন করিয়া অনেক জ্ঞানী-গুণী মিলিয়া সার্চ করিয়া তাঁহাকে আনিয়াছে। অথচ সেইটা নিয়াও চরম বিদ্রুপ হইয়াছে; লোকজন বলিয়াছে সার্চ করিয়া ইহা কী বস্তু আনিলো? অতি দুর্মূখ ‘টকমারানি’ নুরুল কবির বলিয়াছিল, সার্চ কমিটি ভালভাবেই সার্চ করিয়া মাখন দিয়া তৈরি অতি কোমল মেরুদণ্ডযুক্ত একজন মানুষ সার্চ করিয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার বানাইয়াছেন। জনাব কবীর, আপনাকে বলি, মেরুদণ্ড মাখনের হওয়াই উত্তম, মাখনের মেরুদণ্ড পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াইতে সাহায্য করে যাহা এই পৃথিবীতে টিকিয়া থার জন্য অতি দরকারি গুণ। আপনার মেরুদন্ড মাখনের তৈরি না হওয়ার ফল কি আপনি দেখিতেছেন না? আপনি তো টক শো থেকে আউট হইয়াছেন।

জনাব রকিবের কমিশনের অধীনে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠিয়াছিল। এটা আবার নতুন কী? হারিয়া যাওয়া দল বাংলাদেশে কোন কালে কারচুপির অভিযোগ ছাড়া নির্বাচনের ফল মানিয়া লইয়াছে? সূক্ষ না স্থূল কারচুপি এই দেশে স্বাধীনতার পর হইতেই হইয়াছেই। তাহা হইলে নতুন করিয়া রকিব কমিশনকে দায়ী করা কেন?

বরং আমি তো জনাব রকিবকে প্রশংসা করি, তাঁহার কিছুটা হইলেও লজ্জাবোধ আছে। বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময় ব্যপক কারচুপির অভিযোগ উঠিতে শুরু করিলে সহ্য করিতে না পারিয়া তিনি বিদেশে চলিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার অবর্তমানে ইহার পর যাহা হইয়াছে তাহার দায় তিনি নিবেন কেন? বাংলাদেশের ইতিহাসে ভোটে কারচুপির মুখে এই লজ্জা কি কেউ দেখাইয়াছিলেন কোনদিন? বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে ইহা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে।

ভাল লোককে এই দেশে পদে পদে অপমানিত হইতে হয়; অপমানিত হইতে হইয়াছে জনাব রকিবকেও। কিছুদিন পূর্বে ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থীদেরকে তিনি ডাকিয়াছিলেন কিছু কথা বলিবার জন্য, আর তাঁহাদের কথা শুনিবার জন্য। হেভিওয়েট প্রার্থীরা তাঁহাদের কথা বলিয়া জনাব রকিবের কথা না শুনিয়াই চম্পট দিয়াছিলেন। এই অপমানে অন্য লাইটওয়েট প্রার্থীরা ক্ষোভ ও উষ্মা জানাইলেও তিনি ছিলেন নির্বিকার। এইরকম বিনয় আমরা কি দেখিয়াছি কোন কালে? আপনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হইলে পারিতেন? কিন্তু সিইসি তাহা পারিয়াছেন। যাহারা মাখনের মত কোমল মেরুদন্ডযুক্ত সিইসি নিয়া নিয়া বিদ্রুপ করিয়াছেন, এক্ষনে নিশ্চয়ই তাঁহারা বুঝিতে পারিয়াছেন ওই বস্তুটি কত দরকার ছিল।

ফাঁকিবাজের এই দেশে তাঁহার মত কর্তব্যনিষ্ঠ একজন মানুষ কোথায় সকলের প্রশংসা পাইবেন, তা না মানুষ তাঁহাকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করিতেছে। নিয়োগকর্তার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া নিজের আখের গোছানোই যেইখানে সবার স্বভাব, সেইখানে সিইসি কী দারুণ সততার সাথে তাঁহার নিয়োগকর্তার সকল আদেশ অক্ষতে অক্ষরে পালন করিতেছেন! (তাঁহাকে তো বিএনপি বা অন্য কোন দল তো নিয়োগ দেয় নাই, তাহাদের কথা তিনি শুনিবেন কেন?) এই দেশে কর্তব্যনিষ্ঠতার ইহার চাইতে বড় কোন উদাহরণ অন্তত আমার জানা মত দ্বিতীয়টি নাই।

আসি সেনা মোতায়েনের প্রসঙ্গে। আমার প্রশ্ন হইলো সেনা মোতায়েন করিতে হইবে কেন? ছোটবেলায় আমরা কি পড়ি নাই, “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”। প্রবচনটি তৈরি হইবার কালে ক্যান্টনমেন্ট থাকিলে প্রবচনটি নিশ্চিতিভাবেই হইতো “বন্যেরা বনে সুন্দর, সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে”। সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে থাকাই উত্তম। আর তিনি তো বলিয়াছেনই দরকার মনে করিলে রিটার্নিং অফিসার তাহাদিগকে ডাকিবেন। তাহা হইলে সমস্যা কী? কেউ কেউ সমালোচনা করিয়া বলিয়াছেন, কোন অঘটন ঘটিলে সেনবাহিনী আসিতে আসিতে তো সন্ত্রাসীরা পগার পার হইবে। আমি মনে করি না এই দেশের সন্ত্রাসীরা এতো সেয়ানা হইয়াছে যে কাজ করিয়াই পালাইবে। কাজের পরে তাহারা জিরাইবে, চা-সিঙাড়া-সিগ্রেট খাইবে, ততোক্ষনে সেনাবাহিনী আসিয়া তাহাদেরকে নিশ্চয়ই পাকড়াও করিতে পারিবে।

লিখার কলেবর অনেক বাড়িয়া যাইতেছে। তাই আপাতত এইটুকুই। কিন্তু চাহিলে এই রচনা খানার মত আরো অসংখ্য রচনা করিয়া তাঁহার গুনকীর্তন করা যায়। ক্রমাগত সমালোচনার মুখে তাঁহার এই দুর্দিনে আর কেহ তাঁহার পক্ষে না থাকুক , আমি অন্তত আছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এহেন একজন গুণী সিইসি আমরা আমাদের কারো না কারো পুণ্যগুণে পাইয়াছি। তাই তাঁহাকে আমরা হারাইতে চাই না। মেয়াদ শেষে তাঁহার মেয়াদ বাড়ানো হোউক বারংবার। নির্বাচনের এই মরশুমে তাঁহাকে নিয়া স্লোগান দিয়ে শেষ করি (আমার সাথে কেউ হয়তো সাথে সুর মিলাইবে না, তাই ‘আমরা’র স্থলে ‘আমি’ বলিতেছি) –

“রকিব ভাই এগিয়ে চল, আমি আছি তোমার সাথে”

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77