ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ঘটনাটা আমি জেনেছি ব্লগার অনন্ত বিজয় হত্যাকান্ডের পর। কোন এক পত্রিকায় পড়েছিলাম অনন্তের শেষ ফেইসবুক স্ট্যাটাস ছিল জাফর ইকবালের পক্ষে। সিলেট-৩ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস এর জাফর ইকবালকে চাবকানোর ইচ্ছের প্রতিবাদে ওই স্ট্যাটাস।

এদিকে অনন্তর মৃত্যুর পর জাফর ইকবাল সিলেটের প্রতিবাদ মানববন্ধনে গেছেন, এবং অবশেষে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ব্লগার হত্যা ইস্যুতে রয়টার্স এ প্রধানমন্ত্রী তনয় জয়ের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন তিনি। যৌক্তিকভাবেই তিনি বলেছেন জনাব জয়ের মন্তব্যে ব্লগার হত্যাকারীরা উৎসাহিত হবে। এমনকি তিনি ব্লগারদেরকে নিজেদেরকেই নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলেছেন, কারণ তিনি বুঝে গেছেন এই ব্যাপারে সরকার কিছু করবে না।

বিপত্তি বাধলো এরপর। সরকার সমর্থকরা তাঁর মুন্ডুপাত করতে শুরু করেছে অনলাইনে। ফেইসবুক, ব্লগ, এমনকি পত্রিকার কলামেও তাঁর সমালোচনা হচ্ছে। আর সিলেটে তো রীতিমত মিছিল মিটিং হচ্ছে ক্রমাগত। বাস্তবে না হলেও কথার চাবকানো চলছে জাফর স্যারের ওপর।

দেশে হাতে গোনা কিছু শ্রদ্ধা করার মত মানুষদের একজন জাফর ইকবালের এই পরিস্থিতি কাম্য নয় কোনভাবেই। কিন্তু স্যারকে বলতে ইচ্ছে হয়, আপনার ওপর যা হচ্ছে তার পেছনে আপনার দায়ও অনেক।

দীর্ঘদিন থেকেই জাফর স্যারের কলাম নিয়মিতভাবে পড়ি। আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি স্পষ্ট ব্যতিক্রম, তিনি একজন এক্টিভিস্ট। সমাজ, রাজনীতির নানা বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে লিখেছেন, প্রয়োজনে রাস্তায় নেমেছেন। আমাদের জনপ্রিয়রা তো এসব ইস্যুতে লিখেন না, পাছে জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু জাফর স্যার সেই ঝুঁকি নিয়েও লিখেছেন। শুধু তাই না, লিখার জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দিক থেকে জীবনেরও ঝুঁকি আছে তাঁর।

নিয়মিতভাবে তাঁর কলাম পড়ি বলেই তাঁর লিখার একটা দিক চোখে পড়ে খুব। গত বিএনপি সরকারের সময় তিনি সরকারের নানা বিষয় নিয়ে সরকারকে তুলোধূনো করেছেন (ন্যায্যভাবেই) নিয়মিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁর মধ্যে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাবার প্রবণতা দেখেছি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মোটা দাগে তিনি যুদ্ধাপরাধীর বিচার, আর প্রশ্নপত্র ফাঁস, আর শিক্ষা বিষয়ক লিখায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এর মধ্যে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে দেশে, তিনি লিখেননি, যেসব নিয়ে আগের সরকারের সময় লিখতেন। সংবিধান সংশোধন করে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র বুলি আওড়ানো সরকার ধর্ম নিয়ে জিয়া আর এরশাদের ভুত যখন রেখে দিল, তখন কি জাফর স্যার আপোষ দেখেননি? বোঝেননি সেই আপোষ বাড়তে বাড়তে আজকের পর্যায়ে যেতে পারে? লিখেননি কেন তখন?

মুক্তিযুদ্ধে বাবাকে হারিয়েছেন বলেই না, যে কোন সচেতন মানুষের মতোই তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে সক্রিয়, সোচ্চার থেকেছেন। আওয়ামী লীগ যেহেতু এই বিচারটি শুরু করেছে সেজন্যই সম্ভবত জাফর স্যারের মত কিছু মানুষ আওয়ামী লীগকে আর সব বিষয় নিয়ে ছাড় দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমি অবশ্য এই তালিকায় ওই তথাকথিত সহস্র বা অযুত নাগরিক কমিটির বুদ্ধিজীবিদের রাখি না, যারা হালুয়া রুটি পেয়ে সরকারের সব নোংরা কাজেরও সাফাই গেয়ে গেছে, যাচ্ছে।

নির্বাচন নামের একটা ফাজলামো হল ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি। জাফর স্যার কিছু লিখলেন না। এরপর এই বছরে বিএনপির আন্দোলনের নামে যা করেছে তার বিরুদ্ধে কিন্তু তিনি লিখলেন (ন্যায্য লিখা)। কিন্তু মানুষের ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের কোন সমালোচনা নেই। ম্যান্ডেট ছাড়া সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে হয় অন্যায্য, অনৈতিক বল প্রয়োগ করে – বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে তাঁর কোন রা নেই। কিছুদিন আগে মেয়র নির্বাচনের নামে খোদ ঢাকার বুকে যা হল, তা এরশাদের নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে। এটা নিয়েও টু শব্দ নেই তাঁর। এত্তোগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুতে জাফর স্যার আওয়ামী লীগকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিয়েছেন। এটাকেই জাফর স্যারদের ঐতিহাসিক ভুল বলে আমি মনে করি।

আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল মানুষদেরকে এই ব্ল্যাকমেইলটা করেছে এইবার ক্ষমতায় এসে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করতেই গড়িমসি করেছে। এরপর এটাকে চালিয়েছে একেবারে মুড়ির টিন বাসের গতিতে। ততোদিনে আরেকটা নির্বাচনের সময় এসে পড়েছে – সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করা হল অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে আবার ক্ষমতায় থাকতে হবে। অনেকেই এই আশংকাও করলো যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধীরা জেল থেকে বের হয়ে আবার দেশ দাপিয়ে বেড়াবে। তাই আওয়ামী লীগকে যেকোনভাবে ক্ষমতায় রাখা জরুরী। এই চাওয়াটাই দেশে ফ্যাসিবাদের বীজ পুঁতেছে। আর নিশ্চিতভাবেই জাফর স্যারদের দায় আছে এর পেছনে কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচারের শর্তে আওয়ামী লীগকে তিনিও ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়েছিলেন।

শত হোক জাফর স্যার তো আর হালুয়া রুটির ভাগ পাওয়া সহস্র নাগরিক কমিটির সদস্য নন, তাই তিনি সরকারের সবকিছুকে চোখ বন্ধ করে সমর্থন করতে পারেননি। কথা বলতে শুরু করেছেন। জয়ের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন, ব্লগার হত্যার পরে সরকারের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করেছেন। আর তাতেই এই ফ্যাসিস্ট সরকারের চেহারা দেখতে শুরু করেছেন তিনিও। এটা অবধারিতই ছিল। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে এটাই হয়। (এই রাষ্ট্র চরিত্রে ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে কিনা সেটা নিয়েও হয়তো অনেকেই তর্ক করতে চাইবেন, সময়-সুযোগ হলে সেটা নিয়েও লিখবো)।

একজন জাফর ইকবাল সমাজে অনেক মুল্যবান। তিনি মানুষ, তাঁর সব অবস্থান সঠিক নাও হতে পারে। যে প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ভুল, সেটা তাঁর মানবিক ভ্রান্তি; এর মধ্যে কোন বৈষয়িক স্বার্থ জড়িত থাকে না। তার ওপর তরুণ সমাজের প্রগতিশীল অংশটার ওপর তাঁর অনেক প্রভাব। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীর স্বপক্ষে চাপ দেবার পাশাপাশি তিনি যদি আওয়ামী লীগের সব অপরাধের সমালোচনা করতেন, সেটা এই সরকারকে এতোটা বিপথে যেতে কিছুটা হলেও বাধা দিতো।

আজ বেশ কষ্ট নিয়ে দেখি এই মানুষটার মুন্ডুপাত চলছে চারদিকে এর নেতৃত্ব দিচ্ছে সরকারী দলের অঙ্গসংগঠনগুলো। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্য যে, এই পরিস্থিতির পেছনে তাঁর দায় আছে। সরকার দলীয় সাংসদ কর্তৃক চাবকানোর হুমকি, আর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর হুমকি-ধামকির পর এবার তাঁর ভ্রান্তি কাটবে আশা করি। কাটবে কি?

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77