ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বিষয়টা কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পিত জানি না, যেদিন সকালে ব্লগার অনন্ত বিজয় খুন হলেন, সেদিন দুপুরের পর বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনকে শিলং এ পাওয়া যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। অনিবার্যভাবেই ব্লগার অনন্ত বিজয় খুনের খবর পেছনে চলে গেল, সব কিছুকে ছাপিয়ে গেল সালাহউদ্দিনকে খুঁজে পাওয়াটা।

ওই দিন টিভির খবরে, টক শোতে সালাহউদ্দিনকে খুঁজে পাওয়াটাই প্রধান বিষয় হয়ে গেল। বিডিনিউজেরই মতামত বিশ্লেষনে ডঃ আনোয়ার হোসেন লিখেছেন একটা টিভি চ্যানেল অনন্ত হত্যা নিয়ে তাঁকে টক শো তে আমন্ত্রণ করেছিল, কিন্তু সেটা বাতিল হয়ে যায় ওইদিনই। এই সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য বিব্রতকর ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই আরেকটা বড় ঘটনা ঘটেছে যেটা আগের ঘটনাটিকে অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। একটা সরকারের সময় এত্তোগুলো ‘কো-ইনসিডেন্স’ ঘটার কোন কারণ নেই। তার মানে কি…….

সালাহউদ্দিনের খোঁজ পাওয়া যাবার পর দেশের মিডিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে রীতিমত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ঢল। শিলং থেকে নানা রকম তথ্য আসতে থাকে আর আমাদের টিভি চ্যানেলের প্রায় সব টক শো উপস্থাপক আর আলোচকরা মুচকি হেসে হেসে সালাহউদ্দিনের অন্তর্ধান আর আবার ফিরে আসা নিয়ে নানা ধরণের সূক্ষ্ম বিদ্রুপ করতে লাগলেন।

ব্লগ আর ফেইসবুক তো সবসময় এককাঠি বাড়া – সালাহউদ্দিন আর সালাহউদ্দিন থাকলেন না, হয়ে গেলেন ‘শালাউদ্দিন’ বা ‘সালাহউদ্দিন বিন লাদেন’, আর তাঁকে নিয়ে চলতে লাগলো সব যাচ্ছেতাই মন্তব্য। আর সাথে এটা দেখানোর চেষ্টা, সালাহউদ্দিন কতো খারাপ ছিল! এটা পুরনো কৌশল। র্যা ব যেমন ক্রসফায়ারের পর জানায় লোকটির বিরুদ্ধে কতোগুলো মামলা ছিল। ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের পরও এই চেষ্টা হয়েছিল। সেটা নিয়ে একটা পোস্টও লিখেছিলাম – ‘ভীষণ খারাপ’ ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়া জায়েজ! লিঙ্ক – http://blog.bdnews24.com/Zahed/88910

এসবের ভীড়ে এই মানুষটা কেন এভাবে গায়েব হয়ে গেলেন, কীভাবেই বা আবার ফিরে এলেন, এসব নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা আর হল না। প্রায় সবাই বলতে লাগলেন, তিনি তাঁর আত্মগোপন করা অবস্থা থেকেই, তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা রটিয়েছেন, আবার এখন ফিরে এসেছেন সুবিধামত।

সালাহউদ্দিন কেন এতো ভিলেন হলেন? গত জানুয়ারীতে বিএনপি জোটের ‘অবরোধ’ চলার সময় তিনি আত্মগোপনে থেকে অবরোধের মেয়াদ বাড়াতেন, যেই অবরোধে পেট্রোল বোমার বিভৎসতা দেখেছিলাম আমরা। আলোচনার স্বার্থে ধরেই নিলাম, সব পেট্রোল বোমা বিএনপি ই মেরেছে। যদিও এর সাথে আমার দ্বিমত আছে। এই বোমার বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ। এই বোমার নৃশংসতাকে কেন্দ্র করেই দেশের মানুষ আর আন্তর্জাতিক মহলের সব ধরণের সিমপ্যাথি হারালো বিএনপি। তাই বিএনপি এটা শুরু করলেও পরে এতে আওয়ামী লীগের হাতও ছিল বলে আমার ধারণা।

সালাহউদ্দিন একটা কাগজ লিখে অবরোধ বাড়ানোর খবর পত্রিকায় পাঠাতেন বলেই কি ধরে নিতে হবে, যে অবরোধ হচ্ছে তার ডাকে? এই অবরোধের মূল হোতা কি খালেদা জিয়া আর তারেক রহমান না? তো শুধু একটা বিবৃতি পাঠানোর দায় কী? সালাহউদ্দিন না পাঠালে অন্য কেউ পাঠাতো। যদি ধরেও নেই ওই বিবৃতি পাঠানোও মহা অপরাধ। তো তার জন্য তো আইনী পদক্ষেপ নেয়া যেতো। এই দেশের তদন্ত সংস্থা আর বিচার বিভাগের ওপর মানুষের খুব একটা আস্থা নেই (বিশেষ করে রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে)। তবুও একটা আইনী পদক্ষেপের শাস্তি হতো মন্দের ভাল। কিন্তু সেসব কিছুই হল না। তাঁকে ‘তুলে নেয়া’ হল। আমরাও ভুলে গেলাম, এমনকি একজন ভয়ঙ্কর অপরাধীও মানুষ, তাঁরও কিছু ন্যুনতম মানবাধিকার আছে।

সিমলার হাসপাতালে সালাউদ্দিনের ছবি দেখে এটা স্পষ্ট যে ওই মানুষটা নিজে থেকে পালিয়ে ছিলেন না। আগের ছবির সাথে তুলণা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, তাঁর ওজন কমেছে অনেক, চেহারায় উদ্ভ্রান্তের মত ভাব। তাঁর টাকার অভাব? তাই খেতে পাননি, থাকার যায়গা পাননি ঠিকমত? হাসি পায়। এই দেশের ‘বড়’ দুই দলের সামনের সারির কোন নেতার টাকার অভাব আছে? রাষ্ট্রকে লুট করে এরা সবাই টাকার পাহাড় বানিয়েছে। তাই কোথাও পালিয়ে থাকতে হলেও আরাম আয়েশে দিন কাটানোর মত টাকার অভাব তাদের নেই, সালাহউদ্দিনেরও থাকার কথা না। এজন্যই এটা অনেকটাই নিশ্চিত, তিনি আটক হয়েছিলেন।

শিলং যাওয়া নিয়ে সালাহউদ্দিন বলেছেন তাঁকে চোখ বেঁধে কয়েকটি গাড়ি বদলিয়ে ওখানে ফেলে যাওয়া হয়। অনেকে এটাকে বিদ্রুপ করছেন, বলছেন সালাউদ্দিন নিজেই অবৈধভাবে ভারতের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেছেন। এই প্রোপাগান্ডার অন্য একটা উপযোগিতা আছে, সেটা হল, এভাবে কিছু বিরোধী দলীয় নেতাকে ভারতের হাতে তুলে দিতে দিতে পারলে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাদেরকে বেশ কিছুদিন আটকে রাখা যাবে, আর ওই মানুষগুলো থাকবেন এই দেশের মিডিয়ার আয়ত্বের বাইরে। এভাবে তো চমৎকারভাবে বিরোধী দলীয় হাই প্রোফাইল নেতাদের মনে ভীতি তৈরি করা সম্ভব (নীচু লেভেলের কর্মীদের জন্য তো ‘ক্রসফায়ার’ আছেই)। সালাহউদ্দিন সম্ভবত এই পদ্ধতির টেস্ট কেইস হলেন। এইরকম ঘটনা আরও ঘটবে বলে আমার ধারণা।

সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলে সালাহউদ্দিন নিজে ভারতের ভেতরে ঢোকেননি। আমাদের দেশের কোন সংস্থাই হয়তো ভারতীয় কোন সংস্থার হাতে তাঁকে তুলে দিয়ে এসেছে। তুলে দিয়ে আসায় লাভ হল ইলিয়াস আলী কেইসের মত সরকার ক্রমাগত চাপ পেতে থাকলো না, তারা অনেকটাই চাপমুক্ত হল।

ভারতীয় সংস্থার হাতে তুলে দিয়ে আসার কথাটা কি খুব অভাবনীয় শোনা শোনাচ্ছে? চোখ-কান খোলা রাখা মানুষের কাছে এটা অভাবনীয় কোন ব্যাপার বলে মনে হবার কোন কারণ নেই। সাঈদীর মামলার আসামী সুখরঞ্জন বালি’র ঘটনাটা মনে করি আমরা। তাকে আদালত প্রাঙ্গন থেকে গোয়েন্দা সংস্থা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর একই কায়দায় ভারতের হাতে হস্তান্তর করে আটক করানো হয়েছিল। এই চর্চা তো আছেই। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলনের নেতাদের বাংলাদেশে গ্রেফতার করে সীমান্ত দিয়ে ভারতের কাছে হস্তান্তরের চর্চা থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই ছিল। কিছু লিঙ্ক দেখলেই ব্যাপারটা জানা যাবে –
www.bbc.com/news/world-south-asia-11913974
archive.thedailystar.net/newDesign/story.php?nid=112937
www.wikipedia.org/wiki/Chitrabon_Hazarika

সালাউদ্দিনের অন্তর্ধান কেন হয়েছে, কীভাবেই বা তিনি ফিরে এলেন, সেটার জবাব একটা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারতো। এই দেশের সরকারগুলোর কাছে ওটা আশা আর করি না বহু বছর থেকেই। কিন্তু আমরা, সাধারণ নাগরিকরা অন্তত যেন এটা নিয়ে ফাজলামো না করি। একটা মানুষ খারাপ হয়ে গেলেই তার সাথে যাচ্ছেতাই করতে পারে না রাষ্ট্র, এজন্য রাষ্ট্র তৈরি করেনি মানুষ। সহজ কথায় রাষ্ট্র একটা চুক্তি – এই চুক্তিতে আমরা রাষ্ট্রের অধীনস্ত হই, রাষ্ট্রকে অনেক ক্ষমতা দেই, আমাদের ন্যুনতম কিছু অধিকারের বিনিময়ে। সেই অধিকার যে কারো ক্ষেত্রে নষ্ট হলে আমাদের সন্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করতে হবে।

এই সরকারের সময় নতুন এক ভয়ঙ্কর খেলার বীজ রোপিত হয়েছে দেশে – ‘গুম’। বহু ‘সাধারণ’ আর ‘অসাধারণ’ মানুষ গুম হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কখনো সরকারি বাহিনী, আবার কখনো সেই পরিচয়ে সন্ত্রাসী দলও করছে সেটা। আজ সরকারি দল এর ‘সুফল’ ভোগ করছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ? বিএনপি যখন র্যা ব তৈরি করে অনৈতিকভাবে বিরোধীদের ঠ্যাঙানো শুরু করেছিল, তখন বর্তমান সরকারী দলসহ অনেকেই এর প্রতিবাদ করেছিল। বিএনপি শোনেনি সেই কথা। আজকের পরিস্থিতি উল্টো, ওই একই বাহিনীর অনৈতিক বলপ্রয়োগের শিকার বিএনপি। এটাই হয়।

বুঝতে শুরু করার পর থেকে কোনদিন দেখিনি এই দেশে সন্তোষজনক পর্যায়ে আইনের শাসন আছে। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে এটা ভয়ঙ্করভাবে আতঙ্কিত করে তোলে যে, পরিস্থিতির উন্নতি দূরে থাকুক, এই দেশে আইনের শাসনের পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের উচিৎ দল মত নির্বিশেষে রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী চরিত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। না হলে রাষ্টের ফ্যাসিবাদী রুপান্তর ঠেকানো যাবে না কোনভাবেই। আর তার জন্য দায়ী থাকবো আমরা সবাই।

পুনশ্চঃ লিখাটা জনাব সালাহউদ্দিনের পক্ষে নয়, লিখাটা রাষ্ট্রের একটা ভয়ঙ্কর চরিত্রের বিরুদ্ধে। সালাহউদ্দিন বা তাঁর দলের প্রতি আমার কোন ব্যক্তিগত সহানুভূতি নেই। তবুও অনেকেই আমার ওপর প্রচুর ব্যবহৃত অস্ত্রটি ব্যবহার করবেন সম্ভবত – আমাকে “পেট্রোল বোমাবাজদের দোসর” বানিয়ে দেবেন। জেনেশুনেই এই ‘অপ্রিয়’ কাজটা করলাম; কিছু ‘অপ্রিয়’ কাজও কাউকে না কাউকে করতে হয়, কারণ কিছু অপ্রিয় কাজ সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77