ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মেয়েটির নাম কোন পত্রিকায় আসেনি, না আসাই উচিৎ। বলছিলাম কালকের মেয়েটির কথা যে এই ঢাকা শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের রাস্তায় মাইক্রোবাসের ভেতরে দেড় ঘন্টা ধরে ধর্ষিত হয়েছে পাঁচজন পুরুষ দ্বারা। নাম যেহেতু জানি না, তার নাম দেই ‘নির্ভয়া’, সেই মেয়েটির নামে (নামটা ছদ্মনাম) যে দিল্লীতে বাসে গণধর্ষিত হয়ে মারা গিয়েছিল।

কিছুদিন আগের একটা পোস্টের একটা অংশ কোট করি পরের আলোচনায় যাবার জন্য। “বয়স হোক ৩ বা ৭২… যোনি আছে না!” শিরোনামের একটা পোস্টে লিখেছিলাম –

“প্রতিটি ধর্ষণ ভয়ঙ্কর, বিভৎস। কিন্তু কি আশ্চর্য, আজ সব ধর্ষণ শিরোনাম হয় না পত্রিকায়, টিভি নিউজে! একটা প্রাপ্তবয়স্ক তরুনী যদি ধর্ষিত হয়, তাহলে সেটা আর বড় খবর না এখন। এসব হতেই পারে আমাদের সমাজে, ওসব আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। অবশ্য প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী যদি বাসে ধর্ষিত হয়ে মারা যায় (নির্ভয়া), বা কোন তরুণী যদি থানায় গণধর্ষিত হয়ে মারা যায় (ইয়াসমীন) তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা; সেটা আমাদের ‘বিবেক’ কে নাড়া দেয়। পত্রিকায়, টিভিতে ওসব খবর হয়”।

আমার বলা আলোচিত ধর্ষনের ঘটনা হবার ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে এই ধর্ষনের ঘটনাটা পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই প্রায় সব পত্রিকা খুব গুরুত্ব দিয়ে খবরটা ছেপেছে। এই ঘটনাটা কি আমাদের ‘বিবেক’কে জাগাবে? আমাদের কি প্রতিবাদী করবে? আমাদেরকে কি রাস্তায় নামাবে?

বিডিনিউজের খবরটি (লিঙ্ক – m.bdnews24.com/bn/detail/home/971911) খুঁটিয়ে পড়ার পর দেখলাম আমাদের ‘নির্ভয়া’ একজন জাতিগত সংখ্যালঘু, গারো; তিনি একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, খ্রীষ্টান। আর কাজ করতেন যমুনা ফিউচার পার্কের একটা দোকানের সেলসগার্ল হিসাবে। তাই ধরেই নেয়া যায় তিনি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এমনিতেই এসব ঘটনা আমাদের গা সওয়া, তার ওপরে ‘নির্ভয়া’র এত্তোসব ‘অযোগ্যতা’ থাকার পর আমাদের বিবেক জাগার আশা গুড়েবালি।

‘নির্ভয়া’র ঘটনার পর দিল্লী কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফেটে পড়েছিল। অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলো নিজেদের তাগিদেই। তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের দন্ডমুন্ডের কর্ত্রী সোনিয়া গান্ধিকে পর্যন্ত রাস্তায় নামতে হয়েছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে।

কিন্তু আমরা এরকম ক্ষোভে ফেটে পড়বো না। এমনিতেও নারীটি যদি ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু নাও হতো তবুও আমরা দিল্লীবাসীদের মত হতাম না, এটা প্রায় নিশ্চিত। আর তার তো আছে কয়েকটি ‘অযোগ্যতা’ যা আগেই বলেছি।

এরপরও যদি কিছু মানুষের ইচ্ছে থাকে, রাস্তায় নামার, সেটায়ও গুড়েবালি। সরকার ‘বাসর রাতেই বিড়াল মেরেছে’। নববর্ষের দিন নারীর ওপর যৌন আক্রমনের প্রতিবাদে বের করা মিছিলকারীদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে। একজন নারীকে পুরুষ পুলিশের পিটুনি তো ছিল ‘টক অব দি কান্ট্রি’।

এখানে লক্ষনীয় ব্যাপার হল ওই প্রতিবাদ মিছিলটি ছিল না বিএনপি বা জামাতের, ছিল ছাত্র ইউনিয়নের। যারা ইতিহাসের অনেক পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। আর প্রগতিশীলতায় তাদের অবস্থান প্রগতিশীলতার মুখোশধারী আওয়ামী লীগের চাইতে অনেক ওপরে। কিন্তু এদেরকেই বেধড়ক পিটিয়ে আওয়ামী লীগ দেখিয়ে দিয়েছে এসব ইস্যুতে রাস্তায় নামলে পরিণতি কী হতে পারে। ওই তান্ডবের পর আমরা, ‘ভদ্রলোক’রা নিশ্চয়ই যথেষ্ট ডরাইছি? তাই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ‘নির্ভয়া’ কান্ডে ঢাকা দিল্লী হচ্ছে না।

তাই আসুন, আমরা ‘সচেতন’ মানুষরা আমাদের ক্ষমতা দেখাই ব্লগে, ফেইসবুকে – রাজা উজির মারি অনলাইনেই। ব্লগ আর ফেইসবুককে দিল্লী বানাই। আর নিজেদেরকে প্রবোধ দেই, আমাদের ‘নির্ভয়া’ যেহেতু মরেনি, তাই এ যাত্রা আমরা রাস্তায় নামলাম না। মরলে কিন্তু আমরা দেখিয়ে দিতাম।

পূনশ্চঃ

কিছুদিন আগে স্যাটায়ারধর্মী একটা লিখায় ( মাইয়া লোকের গায়ে হাত… আররে ব্যাপার না!) লিখেছিলাম “এখন তো মনে হইতাছে আমগো দ্রৌপদীগোরে কওন দরকার, গায়ে হাত তো মাইন্যা লইবেনই, লগে বস্ত্রহরণটাও মাইন্যা যান। রাস্তায় রেইপড টেইপড হইলে না হয় হাউকাউ কইরেন। আমরাও শরীক হমুনে সেই হাউ কাউ এ”।

এই পোস্টের মন্তব্যে আমাদের প্রিয় ব্লগার মোনেম ভাই লিখেছিলেন “কি জানি কোনদিন তোমারে আবার না লেখন লাগে: “মাইয়া লোকে রেইপড হইছে……আররে ব্যাপার না।”।

কী অব্যর্থ ভবিষ্যত দেখা। সেই দিনটা এসে গেল।

Facebook:
https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77