ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

(পোস্টটি উৎসর্গ করছি এই ব্লগের ব্লগার শ্রদ্ধেয় রাজ্জাক ভাইকে। দেখে অবাক হই, কী অসাধারণ অধ্যবসায় আর নিষ্ঠা নিয়ে তিনি সাধারণের জন্য পুলিশিং নিয়ে লিখে যাচ্ছেন!)

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারের একটা কলামে স্যার মজা করে লিখেছিলেন, তাঁর স্ত্রী (ইয়াসমীন হক) যে কোন শারিরীক সমস্যা হলেই বলেন ভাল করে খেতে। সেটার অনুকরণে তিনি মানুষের সব সমস্যার জন্য বলেন, পড়তে। স্যার মনে করেন ভালভাবে পড়াশোনা করলে মানুষের সব সমস্যার সমাধাণ হয়ে যাবে। পোস্টের শুরুতে এটুকু বলে রাখলাম, কারণ এটার অনুকরণে আমিও একটা কথা বলবো পোস্টের পরের দিকে।

সাম্প্রতিক কিছু ভয়ঙ্কর অপরাধের ঘটনার পর পুলিশ স্বাভাবিকভাবেই নানা সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কথায় কথায় পুলিশের পিন্ডি চটকায় ব্যাংক লুট করা বড় ব্যবসায়ী, অপ্রয়োজনীয় অষুধ, ইনভেস্টিগেশন করতে দেয়া ডাক্তার, ‘হলুদ’ সাংবাদিক, দুই নম্বরী ব্যাল্যান্স শীট বানিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে সাহায্য করা একাউন্ট্যান্ট, ঘটি বাটি বিক্রি করে মানুষকে নিশ্চিত হেরে যাওয়া মামলা করানো উকিল, স্কুলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বাসায় কোচিং ব্যবসা করা শিক্ষক, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ঘুষ দেয়া জায়েজ’ বলে ফতোয়া দেয়া মোল্লা থেকে শুরু করে মাপে কম দেয়া দোকানী পর্যন্ত। পুলিশের পিন্ডি চটকায় না কে? আমি পুলিশকে এতো সমালোচনা করিনি, করি না বহুদিন। পুলিশকে দিয়ে আমার আশা ভঙ্গ হয়নি, কারণ আমি পুলিশের কাছে আশাই করিনি।

যারা পুলিশের কাছে অনেক কিছু চেয়েছেন, পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে হা পিত্যেশ করেছেন, পুলিশকে নানান ভাল ভাল নসিহত করেছেন, তাদেরকে বলি, পুলিশ কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, পুলিশ এই সমাজেরই অংশ। যে সমাজ পচে যায়, সেই সমাজের অংশ পুলিশের মধ্যে পচন ধরবে না, এই প্রত্যাশা স্রেফ মুর্খতা। এই সমাজের কোন সেক্টরে পচন ধরেনি? আবার কারো কারো ধারণা শুধু সরকারী সেক্টরে পচন ধরেছে, বেসরকারি সেক্টর অনেকটাই ভাল। তাদের ধারণা ভীষণ ভুল। পরিবারের সদস্য আর অনেক বন্ধু বড় বড় কর্পোরেট হাউজে কাজ করে, এটা কনফিডেন্টলি বলা যায় দেশী বা মাল্টিন্যাশনাল, সব প্রতিষ্ঠানে ভীষণরকম দুর্নীতি ঢুকে গেছে।

হ্যাঁ, এটা মানি পুলিশ একটা সংবেদনশীল অবস্থানে দায়িত্ব পালন করে, তাই মানুষের ক্ষোভ-ঊষ্মা পুলিশের ওপর অনেক বেশী। কিন্তু আমাদের উচিৎ আবেগকে সরিয়ে রেখে প্র‍্যাগমাটিক চিন্তা করা, তাহলে হয়তো একটা সমাধান আমরা পেতেও পারি। কমনসেন্স দিয়েই এটা স্পষ্টভাবে বলে দেয়া যায়, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া এই পচন যদি আমরা সামষ্টিকভাবে রোধ করতে না পারি, তাহলে পুলিশের পচন রোধ করতে পারার কোন যোক্তিক কারণ নেই। এর চাইতে উদ্ভট ইউটোপিয়ান চিন্তা হতেই পারে না যে একটা পচনযুক্ত সমাজে একটা ‘সহি’ পুলিশ বাহিনী থাকবে। অবশ্য বলাই হয়, কমনসেন্স কমন মানুষদের মধ্যে বেশ কমই থাকে। তাই জনগনের কাছে পুলিশ বরাবরই হয় বলির পাঁঠা।

এখন প্রশ্ন এর সমাধান কী? রাজ্জাক ভাই হয়তো ভাবেন পুলিশ সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে পুলিশকে সাধারণ মানুষের আরো কাছাকাছি আনবেন। মানুষকে সচেতন করে পুলিশের ওপর সংস্কারের চাপ বাড়িয়ে পুলিশকে আরেকটু ‘জনগণের বন্ধু’ করে তুলবেন। ওদিকে পুলিশ প্রশাসন তো রীতিমত ‘গায়ের জোরে’ তাদের ইমেজ রক্ষা করতে চাইছেন।

অনেকেরই হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ পুলিশ এক প্রজ্ঞাপণ জারি করেছে যে, কোন টিভি নাটক বা সিনেমায় পুলিশের কোন চরিত্র থাকলে সেই নাটক বা সিনেমার স্ক্রিপ্ট পুলিশের কাছ থেকে সেটা অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। বিবিসি বাংলার খবরে পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্তা এর ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন এভাবে যে, নাটকে বা সিনেমায় নেগেটিভ ভাবে পুলিশের চিত্রায়ন করলে জনগনের মনে পুলিশ ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম! এভাবে রক্ষা করা হবে পুলিশের ইমেজ! কোথায় যেন শুনেছিলাম হাতে অস্ত্র থাকলে নাকি মাথা কাজ করে কম, ইচ্ছে করে সব কিছু গায়ের জোরে করি। ওই রিপোর্ট শুনে ইচ্ছে হচ্ছিল একটা স্যাটায়ার লিখি ‘পুলিশ ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মত পবিত্র’ শিরোনামে। ওটা আর লিখা হয়ে ওঠেনি।

ওদিকে আবার বেশকিছু বুদ্ধিমান এবং বাকপটু পুলিশ কর্তা নানাভাবে বাকচাতুর্য দিয়ে পুলিশের ইমেজ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। বেশ কিছুদিন আগে বর্তমানে র‍্যাবের ডিজি (তখন তিনি ঢাকার পুলিশ কমিশনার ছিলেন) জনাব বেনজিরের একটা সাক্ষাতকার দেখেছিলাম কোন একটা চ্যানেলে – কী স্মার্টলি (ভদ্রলোক আসলেই দারুণ স্মার্ট) তিনি প্রশ্নকর্তার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে পুলিশের ‘ইমেজ রক্ষা’ করে যাচ্ছেন! পুরো সাক্ষাতকারটা দেখে আমি তাঁর দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু পুলিশের ইমেজ আমার কাছে ভাল হওয়া দূরে থাকুক, আমার কাছে বরং খারাপ হয়েছে। আমি ভেবেছি, এঁরা তো সমস্যাই স্বীকার করতে জানে না, তো সমাধানের জন্য কাজ করবে, এই আশা করা তো স্রেফ পাগলামি।

এবার আসি, কেন আমি পুলিশের কাছে বেশী কিছু প্রত্যাশাই করি না, সেই আলোচনায়। এতে হয়তো সমাধানটা কোথায়, সেটা বোঝা যাবে। শুরুতে জাফর স্যারের একটা কলামের একটা অংশের উদৃতি দিয়েছিলাম। তিনি যেমন পড়াশোনাকে যাবতীয় সমস্যার সমাধান বলে মনে করেন, আমি মনে করি যাবতীয় সমস্যার সমাধান আছে ‘সঠিক রাজনীতি’র কাছে। আমাদের জীবনের অতি ক্ষুদ্র, তুচ্ছ সমস্যাকেও আমি রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত করি, আর মনে করি সঠিক রাজনীতি না আসলে এসব ক্ষুদ্র সমস্যারও স্থায়ী সমাধান হবে না।

আসলেই আমাদের এতো পচন চারদিকে কারণ, আমাদের রাজনীতিটাই পচে গেছে। এক্ষেত্রে ‘ডিম আগে না মুরগী আগে’ এই তর্কের মত তর্ক হতেই পারে, রাজনীতি পচেছে বলে সব পচেছে, নাকি সব পচেছে বলে রাজনীতি পচেছে। ওই তর্কে না গিয়েও এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায়, রাজনীতির পচন বন্ধ না হলে, একটা সুস্থ রাজনৈতিক ধারা আমাদের দেশে সৃষ্টি না হলে পুলিশের পচন (সাথে অন্যসব পচন) রোধ করা যাবে না কোনভাবেই, এবার রাজ্জাক ভাই শত শত পোস্টই লিখুন, আর পুলিশকে নিয়ে কথা বলতে যত খুশি বিধিবিধান তৈরি করা হোক না কেন, সব অর্থহীন হতে বাধ্য।

প্রতিটা রাজনৈতিক দল এই দেশে পুলিশকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঠ্যাঙানোর বাহিনী হিসাবে। নানা অন্যায় কাজ করতে পুলিশকে বাধ্য করা হয়। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে বহু অবৈধ কাজকে পুলিশকে ছাড় দিতে হয়, ধরে আনা অনেক অপরাধীকে ছেড়ে দিতে হয়। একটা সরকার আর তার রাজনৈতিক কর্মীরা যখন পুলিশকে চাপ দিয়ে নানা অন্যায় কাজ করায়, সেই পুলিশের ওপর তখন সরকারের কোন নৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন পুলিশের অনেক সদস্যই তাদের ‘ব্যক্তিগত বানিজ্যে’ জড়িয়ে পড়লেও সেটা বন্ধ করার জন্য কঠোর হবার মত নৈতিক শক্তি সরকারের থাকে না।

ওদিকে আমাদের সব সরকার চায় এমন কর্মকর্তা, যারা বিনা বাক্যব্যায়ে সরকারের নির্দেশ পালন করবে। তাই নন ক্যাডার পুলিশের নিয়োগ শতভাগ রাজনৈতিক। অনেক স্বাধীনচেতা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অফিসার গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতেই পারেন না। এই সরকারের সময় একটি বিশেষ জেলার পুলিশ কর্মকর্তার কারণে পুলিশের চেইন অব কমান্ড নষ্ট হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন। তার ওপরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর তথাকথিত নির্বাচনের পর সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোন নৈতিক অধিকার নেই। এমন দুর্বল সরকার টিকে থাকে পুলিশের মারমুখী ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে। এমন অবস্তগায় পুলিশ বাহিনীর কাছে আমরা কি কিছু আশা করবো? আমি অন্তত করি না।

শুধু পুলিশ বাহিনীর সমস্যা না, আমাদের সব সমস্যা দ্রুতই কমে আসবে যদি আমরা একটা সত্যিকার কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় পাঠাতে পারি। উপায় আছে দু’টো – বর্তমানের দুই ‘বড়’ দলের উভয়টি বা অন্তত একটি তার পচন রোধ করে লুটেরা থেকে সত্যিকার কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল হয়ে উঠবে, নয়তো একবারে নতুন একটা সত্যিকার কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হবে। আমি মূর্খ নই এবং আমার ইতিহাসবোধ আছে, তাই প্রথম সম্ভাবনাটা বাস্তব হতে পারে, এটা আমি কোনভাবেই মনে করি না।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77