ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

হুগো শাভেজের পর ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন নিকোলা মাদুরো। না, এই ভদ্রলোক শাভেজের, আপন বা চাচাতো-মামাতো ভাই নন। ছিলেন নিতান্ত এক বাস ড্রাইভার। তারপর ক্রমান্বয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, এমপি, মন্ত্রী। আর সর্বশেষে প্রেসিডেন্ট হলেন ক্যান্সারে শাভেজের অকাল মৃত্যুর পর। দেখুন – Nicolás Maduro

একজন সাধারণ বাস ড্রাইভার ওই দেশে ধাপে ধাপে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে যেতে পারেন, দেখে নিজের দেশের কথা ভেবে আফসোস হয়। একজন ‘সাধারণ’ মানুষের স্বপ্নের দৌড় এই দেশে সর্বোচ্চ মন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী হতে হলে হতে হবে দুই ডাইনেস্টির একটির সদস্য!

আর ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেও ওই মানুষগুলো আমাদের দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধরদের মত ‘মধ্যযুগীয় সম্রাট’ হয়ে ওঠেন না। নিকোলা মাদুরো তাঁর বাস চালানোর অতীত স্মরণ করে প্রেসিডেন্ট হবার পরও মাঝে মাঝেই বাস নিয়ে রাস্তায় নেমে যান, বাস চালান। একদিন তিনি বাস চালাচ্ছিলেন তাঁর দলের একটা র্যা লিতে, মানুষের সংস্পর্শে থাকার জন্য বাসের জানালাও ছিল খোলা। আর তাতেই ঘটে আলোচিত এক ঘটনা।

বাস চালানোর সময় জনৈকা নারী তাঁর মাথায় একটি আম ছুঁড়ে মারেন (ইউটিউব ভিডিও লিঙ্ক)। আমটিতে ওই নারীর ফোন নম্বর দেয়া ছিল; আরো লিখা ছিল, মাদুরো চাইলে তাঁকে ফোন করতে পারেন।

মাদুরো তাঁকে ফোন করেছিলেন। না তাঁকে খুঁজে বের করে গর্দান নেননি, বা গরাদেও পোরেননি। তাঁর সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল ওই অসহায় নারীর কোন বাড়ি নেই, তাই তাঁর একটি বাড়ি প্রয়োজন। মাদুরো তাঁর জন্য একটি ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন (বিস্তারিত পড়ুন)। পশ্চিমা মিডিয়া অবশ্য তাদের সহজাত ঢং এ মাদুরোর ‘পপুলিস্ট’ আচরণ নিয়ে হালকা বিদ্রুপও করেছে; করারই কথা, ভেনিজুয়েলার শাভেজ-মাদুরো আর বলিভিয়ার মোরালেসরা তো তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে। যাক, সে অন্য আলোচনা।

এবার আসি আমাদের দেশে। আইসিটি আইন অবার পর থেকে এটা একটা মুর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের জন্য। কিছুদিন পর পরই দেখি প্রধানমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করার জন্য মানুষকে পুলিশ ধিরে নিয়ে যাচ্ছে, সাজা দিচ্ছে। কালও একজনের ছয় মাসের জেল হল (বিস্তারিত পড়ুন)।

কোন সরকার, সেটা যত জনপ্রিয়ই হোক না কেন, তার কিছু বিরোধীতা থাকবেই। আর বিরোধীতা থাকলে সেটার প্রকাশও থাকবেই। নানা ভাবেই সেটা হতে পারে। এটা নিয়ে অতিসংবেদনশীলতা কোনভাবেই ভাল আচরণ হতে পারে না। মেডিক্যালের ভাষায় বলা যায়, সংবেদনশীলতা ভাল, কিন্তু অতিসংবেদনশীলতা রোগ; আর অতিসংবেদনশীলতাজনিত রোগে মানুষের জীবন নিয়েও টানাটানি হতে পারে। সরকারের এই অতিসংবেদনশীলতা দেখে মনে হয় তারা ছায়ার সাথে যুদ্ধ করছে। এটা হয় প্রচন্ড ‘ফোবিয়া’ থেকে। এই ‘ফোবিয়া’ কি ২০১৪ সালের ৫ জাবুয়ারীর নির্বাচনে ম্যান্ডেটহীনতার বহিঃপ্রকাশ?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে ইচ্ছে হয়, মানুষের এসব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে তাঁর ক্ষতি হবে না। বরং এসব বিষয়ে অতিসংবেদনশীলতা তাঁর জনপ্রিয়তা আরও কমিয়ে দেবে। মানুষ কথা বলতে পারলে, চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতে পারলে সেটা মানুষের মনের ক্ষোভকে কমিয়ে দেয় – এটা মনোবৈজ্ঞানীকভাবে প্রমাণিত সত্য। ওদিকে এই আইনের এমন ব্যবহার একদিন আওয়ামী লীগের ওপরও আসবে। আমাদের দেশের ফোজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারা কি এর মধ্যেই এটাকে প্রমাণ করেনি?

পশ্চিমা মিডিয়ে ‘আম ছোঁড়া’র ঘটনায় মাদুরোর আচরণকে পপুলিস্ট বলে খাটো করতে চেয়েছে। যদি সেটাও মেনে নেয়া হয়, তবু ক্ষতি কী? আমাদের প্রধানমন্ত্রী যদি ঘোষণা করেন তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা যাবে, তাতে কোন শাস্তির ভয় থাকবে না। এটাকেও হয়তো কেউ কেউ উদার আচরণ না বলে পপুলিস্ট সিদ্ধান্ত বলতে চাইতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক নেতাদেরকে কিছু কিছু পপুলিস্ট আচরণ করতে হয়। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও অতীতে এটা করেছেন – ‘৯৬ সালের নির্বাচনের আগে মাথার স্কার্ফ আর হাতে তসবিহ নিয়ে ছবি তোলা কি পপুলিস্ট আচরণ নয়?

আমি জানি, কোন কারণেই আমাদের সরকার মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ সহসা আর বাড়তে দেবেন না। বরং ক্রমাগত সেই সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে উঠবে। “কম গণতন্ত্র, বেশী উন্নয়ন” স্লোগান দিয়ে ক্রমান্বয়ে দেশে একধরণের Fascism (ইউফেমিস্টিক ভাষায় Authoritarian Democracy) কায়েম হচ্ছে। সামনের পরিস্থিতি আরোও ভয়ঙ্কর হবে। আজকের পত্রিকার একটা খবর – ইন্টারনেট ব্যবহারে আরও কঠোর আইন হচ্ছে

সরকার চাইছে এসব বিষয়ে শাস্তি ধীরে ধীরে মানুষকে ‘Self censorship’ এ বাধ্য করবে – মানুষ আর সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করবে না। পোস্টটি দেয়ার আগে আমি নিজেও একবার পড়ে দেখলাম, আমার এই পোস্টকে কি প্রধানমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে বলে দেখানো যায়? মনে হল যেতেই পারে। তাই আমার বিরুদ্ধেও….

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77