ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত বছরের সেপ্টেম্বরের একটা খবর দেখে চোখ রীতিমত ছানাবড়া! মন্ত্রীসভার একটা মিটিং এ প্রধানমন্ত্রীসহ আরো কয়েকজন মন্ত্রী মেয়েদের বিয়ের ন্যুনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬ নামিয়ে আনা নিয়ে আলোচনা করেন। টিভিতে প্রথম খবরটি শুনে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সরকার অহেতুক এই ‘বোকামি’ কেন করছে!!

ছোটবেলায় টিভিতে নিয়ম করে বাংলা সিনেমা দেখতাম। নায়ক ভিলেনকে (বা ভিলেন নায়ককে) অনেক সময়ই হুমকি দিয়ে বলতো ‘তুই যদি ডালে ডালে চলিস, তো আমি পাতায় পাতায়’। আমার হয়েছিল সেই দশা। টিভিতে ওই খবর শোনার কিছুদিন পরের পত্রিকা পড়ে (বিয়ের বয়স কমছে ছেলে ১৮ মেয়ে ১৬!) আমি একেবারে আহাম্মক সেজে গেলাম। চিন্তায় আমি যদি ডালে ডালে চলি, তো সরকারের নীতি নির্ধারকরা পাতায় পাতায়।

নানা রকমভাবে চেষ্টা করেও যেহেতু সরকার বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাই তারা চাইছে বিয়ের বয়সটাই কমিয়ে দেয়া হোক না। মেয়েদের বিয়ের নুন্যতম বয়স যদি ১৬ বছরে নামিয়ে দেয়া যায়, তাহলে ওই বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয়েছে, সেটা আর বলা যাবে না। এক ধাক্কায় বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমে যাবে উল্লেখযোগ্যভাবে! সাধু! সাধু!

সরকার অবশ্য আসল কথা বলেনি (বলার কথাও না) যুক্তি বানানোর চেষ্টা করেছে তার মত করে – গ্রামে নাকি মেয়েরা একটু বড় হয়ে উঠলে বখাটেদের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাই তাদের দ্রুত বিয়ে হয়ে গেলে সে হয়ে যাবে নিরাপদ! বাহ! কলেজে পড়ার সময় হুমায়ুন আহমেদের কোন একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম, এক সিজোফ্রেনিক নারী বাইরে থাকলে বার বার রেইপড হয় বলে তাকে হাজতে পুরে রাখা হয়েছে। গল্পের থানার দারোগার ভুত দেখছি সরকারের ওপর ভর করেছে।

বলাই বাহুল্য অনেক বেসরকারি সংস্থা এবং ‘সুশীল’ এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তখন কিছুদিনের মত সরকার চেপে যায়। এরপর ফিরে আসে নতুন কথার প্যাঁচ বানিয়ে – বিয়ের বয়স ১৮ ই থাকবে, তবে অভিভাবকরা চাইলে ১৬ বছরেও মেয়েদের বিয়ে দেয়া যাবে (বিয়ের বয়স ১৮–ই থাকছে, মা–বাবা চাইলে ১৬)। কিন্তু এতেও থামেনি নানান সংগঠনের প্রতিবাদ (বিয়ের বয়স নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি)। সবাই বলছে, আন্তর্জাতিক শিশু সনদ অনুযায়ী (বাংলাদেশ এতে অনুস্বাক্ষর করেছে) ১৮ এর নীচের বয়সীরা শিশু হিসাবে স্বীকৃত। অর্থাৎ সরকার শিশু বিয়েকে আইনী বৈধতা দিচ্ছে! যে নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে সরকার এটা করতে চাইছে ওই কিশোরীদের নিরাপত্তার দায়ীত্ব তো সরকারেরই। এমনকি সরকার নিযুক্ত মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব মিজানুর রহমান এর প্রতিবাদ করেছেন এবং নতুন আরেকটা দিক দেখিয়েছেন (মেয়েদের বিয়ের বয়স কমালে উৎসাহিত হবে হেফাজত: মিজানুর)

কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এই চিন্তা থেকে সরকারের সরে আসার চিন্তার কথা জানালেও সরকার এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোন অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়নি যে, তারা এটা থেকে সরে এসেছে।

শুধু এই ক্ষেত্রেই না, সমস্যা সমাধানে এই সরকারের নানা রকম চালাকি দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। সংজ্ঞার এদিক-সেদিক করে সাফল্য পাবার আরেকটা তরতাজা উদাহরণ – এই রিপোর্টে (খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ করার অন্য রকম এক ‘সাফল্য’) দেখা যাবে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের খাতায় দেখানো হচ্ছে না (ওসব আদতে খেলাপি ঋণ)। এতে সরকার বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৫৫ হাজার কোটি দেখাতে পারছে, যদিও এতেও সরকারের মান রক্ষা হচ্ছে কিনা কে জানে? রিপোর্টের শিরোনামেই আছে এই সরকারের সময়ে মাত্র ছয় বছরে খেলাপি ঋণ দ্বিগুন হয়েছে!

তাই সরকারকে আরেকটা চালাকি করার বুদ্ধি দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না। ইদানিং কয়েকটা ধর্ষণ নিয়ে সরকার বেশ সমালোচিত হয়েছে, বিব্রত হয়েছে কিনা জানি না (সরকারের ওই বোধটির কোন অস্তিত্ব আছে কিনা, এই ব্যাপারে আমি সন্দিহান)। তবুও সরকার চাইলে দেশের ধর্ষণের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে খুব সহজেই – ধর্ষণের সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়ে।

এই দেশেরই কিছু সংস্থা অবশ্য ধর্ষণের সংজ্ঞা পাল্টাতে এরই মধ্যে সচেষ্ট, তারা ‘মেরাইটাল রেইপ’, অর্থাৎ স্ত্রীর অমতে যৌন সম্পর্ককেও ধর্ষণের সংজ্ঞার মধ্যে ফেলতে চান (Law on marital rape is imperative )। ইউরোপ-আমেরিকায়ই না, কিছু মুসলিম দেশেও (মালয়েশিয়া, তুরস্ক) এই আইন আছে। বলাই বাহুল্য, ‘মেরাইটাল রেইপ’কে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের প্রস্তাবিত ধর্ষণের সংজ্ঞা ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিয়ে বরং সরকারের ভাবমূর্তিকে আরোও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই যৌক্তিকভাবেই অনুমান করাই যায়, সরকার ওসবে কান দেবে না। তবে সরকারের উচিৎ আমার কথা শোনা, কারণ আমার প্রস্তাবিত সংজ্ঞা নিশ্চিতভাবেই ধর্ষনের সংখ্যা কমিয়ে সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে তুলবে।

আমরা নতুনভাবে নিয়ম করতে পারি নারী প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলেই তার ওপর ধর্ষণ হবে না, কেবল শিশুদের ক্ষেত্রেই ওটা ধর্ষণ গণ্য হবে। অবশ্য প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে ঘটনাটা যদি ব্যস্ত শহরের রাস্তায় কোন গাড়িতে ঘটে, বা ওই ঘটনার প্রভাবে যদি নারীর মৃত্যু হয় বা মৃত্যুপথযাত্রী হন, তাহলে সেটাকে ধর্ষণ হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। এরকম নানা রকম সংস্কার আনা যেতে পারে ধর্ষণের সংজ্ঞায়। আমি আইডিয়াটা দিলাম মাত্র, সরকারের থিঙ্কট্যাংক এর উর্বর-মস্তিষ্ক মানুষরা ভেবেচিন্তে নিশ্চয়ই ধর্ষনের একটা ভাল ‘সরকার উপযোগী’ সংজ্ঞা বের করে ফেলতে পারবেন।

এভাবে একটা দুইটা ক্ষেত্রে সাফল্য পেলে সরকার তার ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী আরো সব বিষয়ের নতুন নতুন সব সংজ্ঞা তৈরি করে সেগুলোর সংখ্যা কমিয়ে ভাবমূর্তি ক্রমাগত উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তুলবে। দুর্মুখেরা এরপরও হয়তো গলা চড়িয়ে বলতে চাইবেন, ‘কাজির গরু কেতাবেই থাকে’। আমার মনে হয় সরকারের এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছুই নেই। আমরা এখন এতোটাই মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেছি যে, সবকিছু মেনে নিতে শিখে গেছি; কেতাবের গরুতেই আমরা এখন মহাখুশি থাকি।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77