ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

Mushfiq
কাল প্রায় সব পত্রিকায় আমাদের সবার প্রিয় ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের একটি ছবি দিয়ে নিউজ করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যায় অফিসিয়াল ফ্যান পেইজে তাঁর হাতে একটা প্ল্যাকার্ড যাতে লিখা “SAY NO TO CHILD ABUSE” (দেখুন – শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদ মুশফিকের)। এটাকে আমরা সবাই প্রশংসার্হ্য দৃষ্টিতে দেখছি, কিন্তু এর ভেতরের একটা ভয়ঙ্কর মানসিকতাকে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। সে কথায় একটু পরে আসছি।

কোন অপরাধীকে হাতে-নাতে ধরে ফেলতে পারলে, এমমনকি শক্তভাবে সন্দেহ করতে পারলেও আমরা তাকদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলছি বহুকাল আগে থেকেই। যেদিন আমাদের কাছে রাজনকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলার ভিডিও আসলো, কাকতালীয়ভাবে সেদিনই বরিশালে তিনজন মানুষকে ডাকাতির অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় (দেখুন – গভীর রাতে গণপিটুনিতে নিহত ৩)। এরা ছিল প্রাপ্তবয়স্ক, এবং এদের বিরুদ্ধে শক্তভাবেই ডাকাতির অভিযোগ ছিল।

দীর্ঘদিন থেকে এই দেশের সমাজকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের সমাজে সমস্যার মূলে যাবার চেষ্টা করা হয় না। সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে সেটাকে সমাধানের চেষ্টাও তাই অনুপস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই সমস্যা থেকে যায় সমস্যার যায়গায়, সমাধান হয় না। অবশ্য মাঝে মাঝে কোন ঘটনা আমাদের কাঁপিয়ে দিলে শুধু সেটা নিয়ে খন্ডিতভাবে আমরা চ্যাঁচামেচি করে থাকি। এটাই মোটাদাগে আমাদের চরিত্র।

রাজনকে হত্যার পেছনের মনস্তত্ত্ব কী? সেটা হল, কোন অপরাধীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ‘অধিকার’ আমাদের আছে। এই চিন্তা আমাদের কেন এলো, সেটা নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা করা যায়, কিন্তু পোস্টের কলেবর ছোট রাখার স্বার্থে সেই আলোচনায় আপাতত যাচ্ছি না। অপরাধের মাত্রা কতোটা হলে, বা বয়স কত হলে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলাটা ‘অধিকার’ হয়ে যায় সেটা নিয়ে হয়তো ভীন্ন ভীন্ন মানুষের মধ্যে মতভেদ আছে। রাজন হত্যা আমাদের যাদেরকে ক্ষুব্ধ করেছে, তাদের অনেকেই দেখছি মনে করছেন রাজনের হত্যাকারীদেরকে হাতের কাছে পেলে আরো বিভৎসভাবে হত্যা করার ‘অধিকার’ আমাদের আছে – ফেইসবুক দেখলেই এর ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। এটা সেই ‘পিটিয়ে মারার অধিকার’ এরই বহিঃপ্রকাশ। এই ভয়ঙ্কর মানসিকতা আমাদের অনেকেরই মধ্যে আছে – পার্থক্য হল অপরাধের ধরণ আর মাত্রা কতটা হলে সেই অধিকার প্রয়োগ করা যায় সেটা নিয়ে মতভীন্নতা।

লক্ষনীয় ব্যাপার হল মানুষের এই মানসিকতাটা আমাদের রাষ্ট্রও খুব ভালভাবে পাঠ করেছে, তাই তারাও ভয়ঙ্কর অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধীদেরকে খুন করে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার এর নামে, এবং আমরা মেনে নেই, অনেকেই খুশিতে মিষ্টি বিতরণও করি।

এই বিষয়টাই মাঝে মাঝে আমাদেরকে নড়িয়ে দেয় যখন দেখি, আমাদের চিন্তার বাইরের কিছু ঘটে গেছে। র্যা বের ক্ষেত্রে লিমনের পঙ্গুত্ব বা নারায়নগঞ্জের সাত খুন আমাদেরকে জাগিয়েছে, কারণ তারা ‘অপরাধী’ ছিল না। একই ভাবে, রাজনের ঘটনার আগে সাভারের আমিনবাজারে পিটিয়ে মারার ঘটনা আমাদেরকে জাগিয়েছিল কারণ ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মারা হলেও ওরা ডাকাত ছিল না (দেখুন – আমিনবাজারে গণপিটুনিতে ছয় ছাত্র নিহত)।

আর রাজনের ঘটনাটা আমাদেরকে ভয়ঙ্করভাবে কাঁপিয়ে দিলো, কারণ ও একেবারে ছোট শিশু, আর ওকে পিটিয়ে মারার ভিডিও আমাদের সামনে চলে এসেছে। আমার মত অনেকেই ওই ভিডিও না দেখলেও মিডিয়ার কিছু ছবি আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। তাহলে এসবই কি কারণ। সত্যিকার চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলে কি আমাদের ভেতরে কোন রকম চাঞ্চল্য তৈরি হবে না? না, সেটা করে না, করলে বরিশালের পিটিয়ে হত্যার বিরুদ্ধেও আমরা কথা বলতাম। আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখছি, টিভির টক শো’তে আসা বহু ‘বিশেষজ্ঞ’ও এই বিষয়টাকে সামনে নিয়ে আসছেন না!! তাঁরা এটা জানেন না, এটা হতেই পারে না; মানে তাঁরা কি পপুলিস্ট মানসিকতা থেকে এটা করছেন? তাঁরা কি জানেন, হাতেনাতে ধরে ফেলা ডাকাতকে পিটিয়ে মেরে ফেলা অন্যায়, এটা বললে মানুষ নাখোশ হবে? একটা সমাজের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিশ্লেষক, এমনকি বিশেষজ্ঞ পর্যন্ত পপুলিস্ট আচরণ করা সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর অশনি সঙ্কেত!

আসি মুশফিকুর রহিমের হাতের প্ল্যাকার্ড প্রসঙ্গে। তাঁর হাতের প্ল্যাকার্ড এর বক্তব্যকে অনুসরণ করে যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তাঁর আহ্বান মতে Child Abuse করা যাবে না, তো কেউ Adult এবং অপরাধী হলে তাকে Abuse করা যাবে? মুশফিকের মত সবার চোখে পড়া একজন মানুষ যদি গণপিটুনিতে যে কোন মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ছবি তুলে ফ্যানপেইজে ছবি দিতেন, সেটা কি আমাদের বোধের সঠিক যায়গাকে জাগানোর জন্য কাজ করতো না? না, তিনি তা করেননি, করেছেন, আমাদের সমাজের সবাই যা ভাবছে সেটাই। তাঁর হাতের এই প্ল্যাকার্ড আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষের মনস্তত্ত্বের চমৎকার একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে রেকর্ডে থাকলো।

এই রাষ্ট্রের সব মানুষ (ভয়ঙ্করতম অপরাধীও) কিছু অধিকার ভোগ করবে, এর মধ্যে ন্যায়বিচার পাবার অধিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অধিকার – এটা রাষ্টের সাথে জনগণের চুক্তি। আমাদের উচিৎ হবে যেখানেই কারো এই অধিকার নষ্ট হবে সেখানেই এটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া – সেই অধিকার হরণ জনগণই করুক গণপিটুনির নামে বা রাষ্ট্রই করুক ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার এর নামে। এটা করা ছাড়া রাজন বা লিমন জাতীয় ঘটনা বন্ধ করা যাবে না কোনভাবেই।

আমাদের এটা বুঝতে হবে সমস্যার মূলে গিয়ে সেটা নিয়ে কাজ না করে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা স্রেফ পণ্ডশ্রম।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77