ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ছাত্রলীগের মুকুটে এই পালকটা যুক্ত হওয়াই বাকি ছিল। কয়েকদিন আগে যুক্ত হল সেটাও। গর্ভবতী মায়ের পেটে গুলি করে গুলিবিদ্ধ করেছে শিশুকে। শিশুটির পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে চোখে আঘাত করে বুলেট (দেখুন – ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ; মাগুরায় গুলিবিদ্ধ মা ও নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন), তবে প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে শিশুটি (দেখুন – ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ; শিশুটি শ্বাস নিচ্ছে, কাঁদছে)। চরমতম বর্বরতার খবর পড়ে কিছুদিন আগে যখন গা গুলিয়ে উঠেছিলো, তখন শিশুটির বেঁচে থাকার খবর, আর সেরে ওঠার খবরটা একটু দম নিতে দিল।

এক দারুণ স্বাপ্নিক কবি সুকান্ত প্রাণপণে জঞ্জাল সরিয়ে পৃথিবীকে শিশুদের জন্য বাসযোগ্য করে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নের সাথে আজকের বাংলাদেশকে মিলিয়ে হাসিই পায়। বাসযোগ্য হওয়া দূরেই থাকুক, এই দেশের শিশুরা যখন তখন পিটুনি খেয়ে মরে যাবার ঝুঁকিতে আছে। এবার ছাত্রলীগের কারণে তৈরি হয়েছে নতুন প্রপঞ্চ – জরায়ুও নিরাপদ নয় আর।

এই গৌরচন্দ্রিকার উদ্দেশ্য হল, ছাত্রলীগ নিয়ে কিছু কথা বলা। দুইদিন আগে ছাত্রলীগের কাউন্সিলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, এমন কিছু করা থেকে থেকে ছাত্রলীগ কর্মীদেরকে বিরত থাকতে বলেছেন, যেটা শিরোনাম হয়েছে প্রায় সব পত্রিকার, টিভি চ্যানেলের খবরে (দেখুন- ভাবমূর্তি নষ্ট করা চলবে না: ছাত্রলীগকে হাসিনা)। এছাড়াও নবনির্বাচিত কমিটি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে ছাত্রলীগ নেতাদের প্রতি তিনি জনগণের আস্থা ফেরানোর আহ্বান জানান (দেখুন – ছাত্রলীগ নেতাদের সাক্ষাৎ; মানুষের আস্থা ফেরাতে পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর)। এই আহ্বানগুলোর একটা অন্তর্নিহিত অর্থ আছে – প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করে নিচ্ছেন, ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি আর আস্থার সঙ্কট আছে। অবশ্য ছাত্রলীগের নানা নোংরা কর্মকান্ড নিয়ে যখনই মিডিয়ায় কথা হয়, তখনই তাদের নেতা আর সরকারের মন্ত্রীরা সেগুলো মিডিয়ার অপপ্রচার, বা তাদের নাম দিয়ে ‘অন্য কেউ’ এসব ঘটাচ্ছে বলে প্রোপাগান্ডা চালায়।

ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্ট না করার জন্য সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন হল, নষ্ট হবার মত কোন ভাবমূর্তি কি আদৌ আছে ছাত্রলীগের? বা যুবলীগের? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুদূর কোন এক অতীতে ছাত্রলীগের অবদানের কথা চর্বিত-চর্বন করেছেন, সবাই যা করে। কিন্তু জ্ঞান হবার পর থেকে ছাত্রলীগকে দেখেছি স্রেফ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, খুনোখুনি, আর মাস্তানীর প্রতিশব্দ হিসাবে। আমার কাছে এটাই ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি, এই দেশের অসংখ্য মানুষের কাছেও তাই। তো নতুন করে কোন ভাবমূর্তি আর নষ্ট হবে? ছাত্রলীগের কাউন্সিনেল দুই দিন পরে নবনির্বাচিত নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী আবার ছাত্রলীগকে কুকর্মের বিরুদ্ধে সাবধান করে দেন (দেখুন – অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না: ছাত্রলীগকে প্রধানমন্ত্রী)।

আমাদের অনেকেরই মনে থাকার কথা বছর কয়েক আগে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে ছাত্রলীগের সন্মানজনক পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে সেটা নিছক লোক দেখানো ব্যাপার মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, কারণ এর পরও বছরের পর বছর ধরে ছাত্রলীগের নোংরামি চলেছে, কিন্তু সেটার লাগাম টেনে ধরতে কেউ সিরিয়াসলি চেষ্টা করেনি। বরং ছাত্রলীগের কাউন্সিলে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক নিজেদেরকে ‘এতীম’ দাবী করে বলেছেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের দেখাশোনা করেন (দেখুন – ছাত্রলীগ ‘এতিমদের’ সংগঠন: নাজমুল)। তাহলে তো ছাত্রলীগের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর!!

এটা মনে করার কি কোন কারণ আছে যে, ছাত্রলীগ যা করছে তা নিজের ইচ্ছেমত করছে! এই দেশের ছাত্র সংগঠনগুলোকে যখন মূল দল ক্যাম্পাস আর রাজপথ দখলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করে তখন ছাত্র সংগঠনের এই পরিণতি কি অনিবার্য নয়? আর মূল দলের নেতারা কি আদৌ সন্ত্রাস-দুর্নীতিমুক্ত? ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কি মূল দলের নেতাদের হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে না? এভাবে ব্যবহৃত হলে একটা ছাত্র সংগঠন তার মত করেও অপরাধ করে বেড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই খন্ডিতভাবে ছাত্রলীগের সমালোচনা করে বেড়ানোকে আমি অযৌক্তিক বলে মনে করি। যদিও আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সহ আরো বেশ কিছু আওয়ামী ঘরানার অনেক কলামিস্ট ছাত্রলীগের ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে সাবধান করে যাচ্ছেন নিয়মিতভাবে। কিন্তু এটা সর্ষের মধ্যে ভুত রেখেই সর্ষে দিয়ে ভুত তাড়ানোর মত ব্যাপার না?

ছাত্রলীগ যা করছে সেটা স্রেফ উপসর্গ; রোগটা হল আমাদের দেশের পচে যাওয়া রাজনীতি। এই উপসর্গ নিয়ে বারংবার কথা বলা মানে মূল রোগটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা। আওয়ামী লীগের নেতারা এবং কলামিস্টরা সরাসরি বা আকারে ইঙ্গিতে ছাত্রলীগের সমালোচনা করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এর পেছনে তাদের মূল দায়কে জনগণের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা। ছাত্রলীগকে ‘নসিহত’ করা আওয়ামীলীগ নেতারা কি নিজেদের চেহারা কি আয়নায় দেখেন? সেটা কি ছাত্রলীগের চাইতে পরিচ্ছন্ন?

আজ ছাত্রলীগের তান্ডবে দেশটা বাসযোগ্য তো থাকছেই না, এখন দেখা যাচ্ছে বাসযোগ্য থাকছে না জরায়ুও। এই দায় এককভাবে ছাত্রলীগকে না দিয়ে মূল দলটিকে দেয়া উচিৎ মূল দায়। একটা নৈতিক, সুস্থ রাজনৈতিক দলের ছাত্রলীগের মত আচরণ করা কোন ছাত্র সংগঠন থাকতে পারে না কোনভাবেই। শোধরাতে হলে আগে শোধরাতে হবে আওয়ামি লীগকেই, তারপর ছাত্রলীগের সেরে ওঠা হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। আর তাতেই নিরাপদ, বাসযোগ্য হয়ে উঠবে এই দেশ আর এই দেশের সব জরায়ুও।

না হলে নতুন কোন বাংলাদেশি সুকান্ত শিশুদের জন্য অচিরেই একটা নতুন ‘ছাড়পত্র’ কবিতা লিখবেন সেখানে নিশ্চয়ই চাইবেন, এই দেশের জরায়ুগুলোকে বাসযোগ্য করে যেতে আমৃত্যু সংগ্রাম করে যাবেন। সেই কবিতার প্রথম বাক্য নিশ্চয়ই ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে’ হবে না; হতে পারে ‘জন্ম দিতে চাই অক্ষত নতুন শিশু’। পরের অংশে লিখা হতে পারে এরকমভাবে ‘জরায়ুকে শিশুর জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য করে যাব আমি, অনাগত শিশুর কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77