ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

‘জেলখানার চিঠি’ কবিতায় কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু কত? কয়েক মাস বড়জোর। সেই কয়েক মাসের শোক নিশ্চয়ই খুব কাছের কোন প্রিয়জনের জন্যই। কোন এক প্রত্যন্ত এলাকার একজন রাজন, যে আমাদের প্রিয়জন নয়, তার জন্য শোকের আয়ু বড় জোর কয়েকদিন। সেই কয়েকদিন পর পিটিয়ে মেরা ফেলা রাজনের মুখ আমাদের মনে আবছা হতে না হতেই সামনে এসে দাঁড়ালো রাকিব।

রাজনের সাথে দারুণ মিল রাকিবের। দু’জনের নামের শুরু ‘র’ দিয়ে। দু’জনের বয়সই প্রায় সমান, রাজনের ১৩, রাকিবের ১২। দু’জনই গরীব পরিবারের – কথ্য ভাষায় ‘ফকিন্নির পুত’ । আর চরমতম মিল দু’জনের পরিণতিতে – দু’জনেই দিয়েছে আমাদের বর্বরতার মূল্য। তবে বড় অমিল আছে একটি; সেটা পরে বলছি।

রাকিব এক গ্যারেজের চাকুরি ছেড়ে চাকুরি নিয়েছিল আরেকটিতে। ছোট মানুষ, চিনে উঠতে পারেনি এই সমাজকে, ধারণা করতে পারেনি ক্ষমতাবান মানুষের চাকুরি ছাড়ার মাশুল কীভাবে দিতে হতে পারে তাকে। এই ‘মৃত্যু উপত্যকা’য় তার ওপর প্রযুক্ত হল খুন করার অভিনব পদ্ধতি – মলদ্বার দিয়ে কম্প্রেসসড বাতাস ঢোকানো (পৈশাচিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু!; ‘মামা আর দিয়েন না, মরে যাব’

মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা। প্রতি ২/১ বছর পর বার্ষিক পরীক্ষা শেষে দাদী-নানীর বাড়ি বেড়াতে যেতাম। একবার নানী বাড়িতে দেখলাম কিছু ছেলে একটা পরিত্যাক্ত বাড়িতে বেশ কিছু বাদুড়ের বাচ্চা পায়। সেগুলোকে নিয়ে তারা ‘দারুণ’একটা খেলা আবিষ্কার করে। শিশু বাদুড়গুলোর মুখে একটা ফুটবল পাম্প ঢুকিয়ে বাতাস দিতে থাকে তারা। বাদুড় শিশুটি ফুলতে শুরু করতো শুরুতে, তারপর একসময় বেশ শব্দ করে ফেটে যেতো। দেখে দারুণ খুশি হতো ওই ছেলেরা। অনুমান করি, রাকিবের মলদ্বারে কম্প্রেসসড বাতাস ঢুকিয়ে ওই ছেলেগুলোর মতো আনন্দ পেয়েছিল ওই লোকগুলো!

জানি, এই ঘটনায় রাজনের ঘটনার মত তোলপাড় হবে না, কারণ রাকিবের মলদ্বারে চাকায় দেয়া কম্প্রেসসড বাতাস দেয়ার, আর ওই বাতাসের ফলে দেহটা ফুলে গিয়ে ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়েখুঁড়ে যাবার কোন ভিডিও আমাদের সামনে এসে পড়েনি। এই যুগটাই দেখার, অনুভবের না – চোখের সামনে মর্মান্তিক কিছু দেখলে আপ্লুত হই বা, হবার ভাণ করি।

রাজনের ঘটনাটা তো এই সেদিনের, মনে করলেই দেখবো, সেটা নিয়ে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী তীব্র প্রতিবাদ! আর হত্যাকারীদেরকে ফাঁসি বা পিটিয়ে মারার দাবী। ফেইসবুকে অনিয়মিত হলেও আজ কিছুটা খেয়াল করে দেখলাম। রাকিবকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নেই তেমন কোন ‘তোলপাড়’। রাজনের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত আমাদেরকে জাগাতে পারেনি ভিডিওহীন একটা খবর।

আর যাদের চোখে পড়বে খবরটি, তারা ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে লিখা মাহবুব উল আলম চৌধুরীর লিখা বিখ্যাত কবিতাটার শিরোনামের মত করে বলে ফেলবেন, “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি”। না, সবার সাথে সুর মিলিয়ে আমি বলছি না সেটা।

আমাদেরকে নাড়া দেয় এমন কোন হত্যাকান্ড দেখলেই আমরা সমস্বরে হত্যাকারীর ফাঁসি চাই, বা চাই নিজ হাতে পিটিয়ে মেরে ফেলতে। আমাদের মগজে এটা ভীষণ জেঁকে বসে গেছে, “দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি” দিয়ে দিতে পারলেই সমাজের অপরাধপ্রবণতা কমে যাবে। তাদের ধারণা, কিছু মানুষকে ঝুলিয়ে দিলেই বুঝি এই সমাজের এসব ভয়ঙ্কর বিভৎসতা কমে যাবে। এতেই পচন থেমে যাবে এই সমাজের। এত্তো সোজা এটা!! স্রেফ অসম্ভব।

সামান্য বা বড় অপরাধে মানুষকে পিটিয়ে বা অন্য কোনভাবে মেরে ফেলা স্রেফ একটা উপসর্গ, রোগ নয়। রোগটা সমাজের গভীরে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, মানুষকে এমন ভয়ঙ্কর রকম অসহিষ্ণু, নিষ্ঠুর করে তুলবেই (এটা নিয়ে সময় করে বিস্তারিত লিখার ইচ্ছে রইলো)। ওই যায়গায় কাজ না করলে, ওটার সুরাহা না করলে শুধু মৃত্যুদণ্ড এইসব বিভৎসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারবে না কোনভাবেই।

আমি রাকিবের হত্যাকারিদের ফাঁসির দাবি নিয়ে আসিনি, কাঁদতে এসেছি। এই কান্না এই সমাজের পচে যাওয়া দেখেও সব মেনে নেয়ার কান্না, এই কান্না সমাজকে সারিয়ে তোলার জন্য কিছু করতে না পারার কান্না। অক্ষমের কান্নাই সম্বল।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77