ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

ভারতের কংগ্রেস নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে গিয়ে ভারতবর্ষে বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন বিশ্ব অর্থনীতিতে ঔপনিবেশিকতার আগে ভারতের শেয়ার ছিল ২৩ শতাংশ; আর ঔপনিবেশিকতার পর সেই শেয়ার নেমে গিয়েছিল ছিল ৪ শতাংশে ; বলাই বাহুল্য এটা ব্রিটিশদের লুন্ঠনের ফল (বিস্তারিত)। থারুরের যুক্তিকে সমর্থন না করার কোন কারণ নেই। তবে আমার মতে ক্ষতিপূরণ দাবীর পরিমাণ আরো অনেক বেশী হওয়া উচিৎ। থারুর ঔপনিবেশিকতার শুধু প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতিটা তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেননি একটা দেশ কলোনিয়াল শাসনের অধীনে থেকে মূল্যবোধগত যে ভয়ঙ্কর ক্ষতির শিকার হয় সেটা। সেই মূল্যবোধজনিত ক্ষতির কারণে একটা দেশ দশকের পর দশক ধরে যে পরিমাণ মাশুল দেয় তার আর্থিক মুল্য কত?

কথাগুলো মনে পড়লো আমাদের জেলা প্রশাসকদের সন্মেলনের পর। বেশ কয়েক বছর থেকেই খেয়াল করছি, ওই সন্মেলনে আমাদের জেলা প্রশাসকরা দাবীর এক লম্বা ফিরিস্তি দেন – বলাই বাহুল্য, দাবীগুলো দেখলে মনে হয়, তাঁরা চান দেশের যাবতীয় সব প্রশাসনিক ক্ষমতা তাঁদের হাতে কুক্ষিগত হোক। আমাদের রাষ্ট্রে যেমন সব ক্ষমতা এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছে একজন প্রধানমন্ত্রীর হাতে, তেমনি জেলা প্রশাসকরাও চাইছেন হয়ে উঠতে জেলায় দায়িত্ব পালনরত এক একজন ‘মিনি প্রধানমন্ত্রী’।

বৃটিশ আমলে ডিসি রা ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর। যাবতীয় ক্ষমতা ছিল তাঁদের হাতে। ওয়ারেন হেস্টিং এর হাতে ১৭৭২ সালে গোড়া পত্তনের পর প্রায় একশ বছর ধরে এটা ছিল শুধুমাত্র বৃটিশদের জন্য, তবে পরে স্বল্প সংখ্যক ভারতীয়রাও এই পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। একটা ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধি যথার্থভাবেই সব ক্ষেত্রে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছিল ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরদের হাতে।

সেসময় তারা কালেক্টর হিসাবে খাজনা, অর্থ সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে নিম্ন আদালতের ফৌজদারি ক্ষমতাও ছিল তাদের হাতে। আর জেলার অন্যসব সরকারী বিভাগের প্রধানগণ (পুলিশের সুপারিয়েন্টেন্ডেন্ট, জেলের আইজি, সার্জন জেনারেল, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, প্রধাণ প্রকৌশলী) তাঁদের বিভাগের প্রতিটি বিষয় ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরকে জানাতে বাধ্য থাকতেন।

বৃটিশরা বিতাড়িত হবার পরও তাদের ফেলে যাওয়া কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন যে এর পরও চালিয়ে যাবার চেষ্টা করা হবে, সেটা অনুমান করাই যায়। পোস্টকলোনিয়াল ডিসকোর্স ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকেই চ্যালেঞ্জ করে। পোস্টকলোনিয়াল ডিসকোর্স এর তিন পুরোধার একজন এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এ দেখিয়েছেন কলোনিয়াল দেশগুলোর একটা অংশ কলোনিয়াল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মূলত তাদেরকে বিতাড়িত করে ওই জায়গাটা দখল করার জন্য। তাই স্বাধীনতা বলে যে বস্তুটা নিয়ে আমাদের তৃপ্তি, সেটা আসলে বিদেশি শক্তির হাত থেকে দেশি শক্তির হাতে ‘ট্রান্সফার অব পাওয়ার’। তাই বৃটিশ, পাকিস্তানি শাসনের অবসানের পরও আমাদের ডিসিদের কলোনিয়াল হ্যাংওভার কাটে না, তাঁরা থেকে যেতে চান জেলার সবকিছুর দন্ডমুণ্ডের কর্তা হিসাবে।

পোস্ট কলোনিয়ালিজম এর আরেক দিকপাল হোমি কে ভাভা তাঁর ‘মিমিক্রি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন কলোনাইজাররা চলে যাবার পরও ওই দেশের মানুষদের মধ্যে কলোনাইজারদের অনুকরণের প্রবণতা চলতে থাকে। এই প্রবণতা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারী কর্মকর্তা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানুষদের এই প্রবণতাও অনুচিত, তবে সেটা জাতি/রাষ্ট্রের জন্য ততোটা ক্ষতির কারণ হয় না। কিন্তু সরকারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ‘মিমিক্রি’ মানুষদের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে।

কোন সন্দেহ নেই জেলা পর্যায়ে সরকারী কাজের একজন সমন্বয়ক থাকা ভাল। ডিসি রা সেই কাজ করতেই পারেন। তবে জানা যায়, ডিসি রা জেলা পর্যায়ে অন্তত ৫০ টি কমিটির প্রধান। আমি জানি না, একজন মানুষের পক্ষে একা এতোগুলো কমিটির সমন্বয় করা কি সম্ভব? তার ওপরে তাঁরা সমন্বয়ক না হয়ে হতে চাইছেন নিয়ন্ত্রক, এটা পরিস্থিতিতিকে জটিলতর করে তুলছে।

কয়েক বছর আগে ডিসি দের সন্মেলনে তাঁরা জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে চেয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁদের সেই দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। ডিসি সাহেবদের অধীনে আসলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যাবতীয় অনিয়ম দূর হয়ে যেতো, বা কমে যেতো বলে মনে করার মত কাণ্ডজ্ঞানহীন এই দেশের মানুষরা না। ডিসি সাহেবদের এই চাওয়াটা পূর্ণ হয়নি, কিন্তু এটা সচেতন মানুষদেরকে ডিসি রা প্রকৃতপক্ষে কী চান, সেই সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দেয়। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে পদে পদে বাধা সৃষ্টি, এমনকি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পরও ‘মোবাইল কোর্ট’ পরিচালণা করতে চাওয়া আর সেটার ব্যপ্তি বাড়ানো নিয়ে তাঁদের ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাঁদের সবকিছুর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবার ঔপনিবেশিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশের বিরুদ্ধে ডিসি সাহেবদের অভিযোগ এসপি সাহেবরা জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির মিটিং এ উপস্থিত থাকেন না। অনেক সময় আরো নীচু পদমর্যাদার অফিসারকে পাঠানো হয়, কখনো কখনো কেউই সেই মিটিং এ যান না। এই মিটিং এ অংশগ্রহণ না করার কারণ অনুমেয়। সরাসরি পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই ধরণের উপলক্ষ্যে তাঁরা হয়তো পুলিশের ওপরে ছড়ি ঘোরানোর মানসিকতাটা চর্চা করেন। সমন্বয় না করে হয়তো চান নিয়ন্ত্রণ করতে। এটা নিয়ে জাতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে – প্রশাসন-পুলিশ দ্বন্দ্ব কাটছে না। এই রিপোর্টের মত খন্ডিতভাবে না দেখে আমাদের উচিৎ হবে সার্বিকভাবে এই সমস্যার কারন খুঁজে বের করা।

প্রশ্ন হল পুলিশ বাহিনী কি কোন জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়? জেলা পর্যায়ের পুলিশের কর্মকাণ্ডের, ব্যর্থতার জবাবদিহি কি পুলিশের নিজস্ব চ্যানেলে সম্ভব না? ডিসি সাহেবগণ এর সাথে নতুন কী যুক্ত করতে পারবেন? তাঁদের সরাসরি দায়ীত্বের অধীনস্ত সরকারী বিভাগগুলো কি আদৌ ভাল চলছে?

একটা উদাহরণ দেয়া যাক। জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তো ডিসি সাহেবদের। কিন্তু একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে শুরু করে জেলার ল্যান্ড একিউজিশন অফিস(এলএও) পর্যন্ত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অদক্ষতা ও মানুষের নাকানিচুবানী খাওয়ার মতো দুর্ভোগের কাহিনীগুলোতে কি কোন আশার এপিসোড যুক্ত হয়েছে? যার এক খন্ড জমি আছে, তিনি কি বলতে পারবেন যে ভূমি অফিসে তিনি ঘুষ না দিয়েই তার জমিটুকুর দখল ধরে রাখতে পেরেছেন? এই যদি হয় তাঁদের সরাসরি অধীনে থাকা বিভাগের পারফরম্যান্সের নমুনা, তো পুলিশ বা আরো সব বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা কী উপহার দেবেন আমাদেরকে সেটা কি অনুমেয় না?

আমি কোনভাবেই মনে করি না, আমাদের পুলিশ বাহিনী সরকারী আর সব বিভাগের চাইতে অনেক বেশী ভাল চলছে। আর সব সরকারী বিভাগের মতোই এটা ভাল, খারাপ মিলিয়েই চলছে। তবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি ডিসি সাহেবদের অধীনস্ত না থেকে পুলিশ বাহিনী অন্তত উচ্ছন্নে যায়নি, দেশের কোন জেলায় পুলিশি ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েনি। বরং আগে দেয়া ভূমি অফিসের উদাহরণ দেখে বলা যায়, ডিসি দের অধীনে পুলিশের অবস্থা বর্তমানের চাইতে খারাপই হবে। পুলিশের ওপর ডিসি দের খবরদারীর চেষ্টা একটা অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই যুক্ত করবে মাত্র, যার অনিবার্য ফল হবে পুলিশের আরো খারাপ সার্ভিস।

কিন্তু এটা অনুমান করাই যায়, পুরোপুরি অধীনস্ত করে ফেলতে না পারলেও অন্তত এসপি সাহেবদের বার্ষিক গোপণীয় মূল্যায়ন (এসিআর) লিখার দাবী করেই যাবেন (যেটা পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাথমিক অবস্থায় ছিল)। এতে ওই জেলা পর্যায়ে পুলিশ বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বলবৎ করা যাবে আবার। এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তাঁরা চাইবেনই, কারণ বেসামরিক এই বাহিনীটিই সশস্ত্র, আর তাঁদের হাতে আছে ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা। নিজেকে একটা জেলার ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসাবে দেখতে ওই ক্ষমতা ছাড়া চলবে কেন? অথচ তাঁরা জনগণের টাকায় পোষা কর্মকর্তা – ভদ্রতা করে ‘জনগণের চাকর’ না বললেও ‘জনগণের সেবক’ তো বলাই যায়। কিন্তু বাস্তবে জনগণকে তো বটেই তাঁরা অন্য সব বিভাগের সরকারী কর্মকর্তাদের ‘চাকর’ বানিয়ে রাখতে চান।

আমরা, সাধারন মানুষ, যদেরকে কলোনিয়ালিজম আর পোষ্টকলোনিয়ালিজমের আলোচনায় সাবআল্টার্ণ বলা হয়, তারা কি এই ডিসকোর্সে একেবারেই নেই? আমাদের ডিসি সাহেবরা হয়তো সাবআল্টার্ণদেরকে পাত্তাই দিতে চাইবেন না ‘ভয়েসলেস’ বলে। অবশ্য অরুন্ধতী রায় সাবআল্টার্ণদেরকে বাতিল করেননি, বরং সিস্টেমকে দায়ী করেছেন এই উক্তিতে “ভয়েসলেস বলে আসলে কেউ নেই, তাদেরকে হয়তো জোর করে নীরব রাখা হয়েছে, অথবা তাদের কথা শোনা হয় না”।

এই দেশের একজন মালিক হিসাবে আমাকে ‘ঘাড় ধরে’ নীরব করে রাখার বা কথা না শোনার কোন চেষ্টা সহ্য করবো না। বৃটিশ তাড়ানোর পর রক্ত দিয়ে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েও ঘাড়ের ওপর ঔপনিবেশিক ভুতকে জনগণ সহ্য করার প্রশ্নই আসে না। দেখতে চাই এই দেশ সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন হয়েছে – সাদা চামড়াদের হাত থেকে বাদামি চামড়ার মানুষের হাতে ট্রান্সফার অব পওয়ার হয়নি। আর একটা প্রকৃত স্বাধীন দেশের প্রশাসন কেমন হবে সেই আলোচনায় জনগণের কথাও থাকতে হবে, জনগণের কথাও শুনতে হবে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77