ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

crite

কাল গৃহকর্মীর (মতান্তরে ‘ফকিন্নির ঝি’) ওপর অত্যাচারের কথা প্রকাশিত হবার পর থেকে আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটার শাহাদাৎ শুধু দেশীই না বিশ্ব মিডিয়ারও খবর হয়েছেন (বিস্তারিত দেখুন)। আর এখনকার ট্রেন্ডমত শাহাদাৎ এর মুণ্ডুপাত চলছে (অ)সামাজিক মাধ্যমেও। কোন সন্দেহ নেই, এই অপরাধ স্রেফ বর্বরতা। কিন্তু এই বর্বরতা আমাদের সমাজে আদৌ নতুন কিছু নয়। হাউকাউ কি হয় এতোটা? বরং শাহাদাৎ এর বাসার গৃহকর্মী মেয়েটি তো দারুণ ভাগ্যবান, ও সুযোগ বুঝে পালাতে পেরেছিল প্রাণে বেঁচেছিল। অনাদিকাল থেকেই এই দেশে কত গৃহকর্মী অত্যাচারের কারণে মরছে (ওরা মারা যায় না), তার হিসাব কে রেখেছে?

গত বেশ কিছু বছর থেকে খেয়াল করি মিডিয়ায় গৃহকর্মীর ওপর অত্যাচারের খবর কম। এর আসলে মানুষ হিসাবে আমাদের মানবিকতার মান উঁচু হয়েছে এমনটা নয় মোটেও, আসলে এখন বাসায় পূর্নকালীন গৃহকর্মী পাওয়া যায়ই না প্রায়। খুব কম পরিবারেই এমন কর্মী আছে। তাই খবরও কম। এটা দেখে খুব ভাল লাগে, আমাদের গরীব বাবা-মা রা তাঁদের সন্তানদের অন্তত খাইয়ে পরিয়ে নিজেদের কাছে রাখতে পারছেন। দেশের অবস্থা বোঝার আরেকটা ভাল নির্দেশক আছে, ইদানিং বাড়িতে ‘ছুটা বুয়া’ পেতেও সমস্যা হয়। অনেক সময় দেখেছি অনেকেই ‘ফকিন্নি’দের ফুটানি বাড়ানোর জন্য গার্মেন্টস এর চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করেন, যাক সে অন্য আলোচনা।

ফিরে আসি শাহাদাৎ এর ঘটনায়। একটা শিশু গৃহকর্মীর ওপর অত্যাচার নিয়ে আমরা হঠাৎ এতোটা ‘প্রতিবাদী কন্ঠস্বর’ হয়ে উঠলাম কেন? কয়েকদিন আগেও তো সাতক্ষীরায় রীতিমত নিম্ন আদালতের একজন বিচারকের বাসা থেকে নির্যাতিত অবস্থায় একজন শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে (বিস্তারিত দেখুন)। এরকম খবর আমাদের পত্রিকাগুলোতে আকছারই আসে। কিছুদিন আগের এই খবরে দেখা যায়, স্যুটকেইস ভর্তি গৃহকর্মী শিশুটির লাশের সারা শরীরে নির্যাতনের অসংখ্য তাজা দাগ (বিস্তারিত দেখুন)। না, ওসব ঘটনায় আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় জড় তুলে ফেলি না। শুনতে খারাপ শোনায়, মেনে নিতেও কষ্ট হয়, আমরা আসলে মোটামুটিভাবে মেনেই নিয়েছি আমাদের মত ‘ভদ্রলোক’দের ঘরে এই ফকিন্নির পুত/ঝি রা কথায় কথায় বকা খাওয়া থেকে শুরু করে, চড়-থাপ্পড়, লাঠির বাড়ি, খুন্তির ছ্যাঁকা এসব খাবেই – ওসব ওদের ‘প্রফেশনাল হ্যাজার্ড’।

বেশ কিছুদিন আগের কথা, আমাদের ক্ষমতাসীন দলের ‘সজ্জন’ সাধারণ সম্পাদক সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে বিদ্রুপ করে বলেছিলেন ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ (বিস্তারিত দেখুন)। যে সমাজে সৎভাবে শ্রম বিক্রি করে ‘গৃহকর্মী’ পেশাটা বিদ্রূপে পরিণত হয়, গালিতে পরিণত হয়, সে সমাজে গৃহকর্মীরাদের নির্যাতিত না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক।

নির্যাতনে গৃহকর্মী আহত বা নিহত হবার খবর যে আমাদের একরকম গা সওয়া, মেনে নেয়া, তার প্রমাণ হল, এই খবরগুলো থাকে পত্রিকার ভেতরের পাতার এক ‘চিপায়’। কিন্তু শাহাদাতকাণ্ড অসাধারণ গুরুত্ব পেল প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। অঙ্কটা খুব সহজ – মিডিয়া আসলে শাহাদাতের স্ক্যান্ডালের নিউজ করেছে।

মিডিয়ায় যেসব খবর আমরা খুব ‘খাই’, তার মধ্যে আছে ‘স্টার’দের খবর। আর কে না জানে, স্টারদের স্ক্যান্ডালও আমাদের কাছে দারুণ লোভনীয় ‘খবর-খাদ্য’। তাই খবরের বাজারে ‘স্টার’দের স্ক্যান্ডাল বিকায় খুব। কাল আসলে আমরা যা যা করেছি সেটা ছিল শাহাদাতকাণ্ডে আমাদের ‘স্ক্যান্ডাল ভোজ’। মেনে নেয়া কঠিন, কিন্তু আমার ব্যাখ্যা এটাই।

খেয়াল করলেই দেখবো, অত্যাচারিত মেয়েটির প্রতি আমাদের মিডিয়ার মনযোগ ছিল খুব কম, যাবতীয় মনযোগ ছিল শাহাদাতের প্রতি। আমরাও গৃহকর্মীর ওপর অত্যাচারের ঘটনা হিসাবে এটাকে না দেখে, এসব ঘটনার সার্বিক সমাধান না চেয়ে, শাহাদাতকে ধিক্কার, ঘৃণা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। ভাবটা এমন, এই কাজ সমাজের অন্য কেউ করলে আমরা মেনে নিতে পারি (মেনে নিচ্ছিও প্রতিনিয়ত), কিন্তু কাজটা একজন ‘স্টার’ করেছে বলে আমরা মেনে নিতে পারছি না। আর এটাও খুব অদ্ভুত, একজন ক্রিকেটার, যে তার পেশাগত কারণে আমাদের সামনে মিডিয়ায় আসে, তাকে কেন আমরা মানবিক দিক থেকে উঁচু মানের মানুষ বলে ধরে নেব? তার কৃত অপরাধে স্তম্ভিত হব? একটা সমাজের মধ্যে যখন পচন ধরে, তখন শিল্পী-সাহিত্যিক-খেলোয়াড়রা কেন এর বাইরে থাকবে? আগেই উল্লেখ করেছি, কিছুদিন আগে তো রীতিমত একজন বিচারকের বাসা থেকে নির্যাতিত গৃহকর্মী উদ্ধার করা হয়েছে।

একটা সমাজে কোন অপরাধের বীভৎসতার চাইতে যখন অপরাধ কে করলো, সেই আলোচনা প্রধান হয়ে ওঠে, তখন বুঝে নিতে হয়, সমাজে ওই অপরাধ চলতেই থাকবে। আমাদের রিএকশনের ধরণই বলে দেয়, সমাজে যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা গৃহকর্মী নির্যাতন ভবিষ্যতে চলতে থাকলে আমাদের আপত্তি নেই, সেটা শুধু ‘স্টার’রা না করলেই চলে। তাই এটার সুরাহা হবে না।

সমাজের সুবিধাভোগী অংশ হয়ে ওইসব ‘ফকিন্নির পুত/ঝি’দের জীবনে কী ঘটলো, সেটা ভাবতে আমাদের বয়েই গেছে। যেহেতু আমাদের কিছু বয়ে যায় না, বরং আমাদের মত সুবিধাভোগী, এবং ক্ষমতাবানরাই এসব নির্যাতনের সাথে জড়িত, তাই আমাদের সরকারও এসব ক্ষেত্রে নির্বিকারই থাকে। তার ওপর পেটে ভাত না থাকা এসব মানুষকে অল্প কিছু টাকা দিয়েই আপোষ রফা করে যায়, তাই এসব অপরাধের কোন বিচারও হয় না।

অন্যদিকে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হল, কাগজে কলমে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার ন্যায়বিচার পাবার অধিকার সবার থাকলেও, আমাদের রাষ্ট্র কখনো নিজের তাড়নায় এই নিপীড়িত মানুষদের ন্যায়বিচার পাবার পক্ষে দাঁড়ায় না, তাই এসব বন্ধ হবেও না কোনদিন; আমাদের রাষ্ট্র নিজেও ভয়ঙ্কর নিপীড়ক, দাঁড়ায়ও সমাজের সুবিধাভোগী, ক্ষমতাবান নিপীড়কের পক্ষেই।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77