ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কিছুদিন আগে আমাদের পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে একটা পোস্ট লিখেছিলাম – পুলিশের কাছে আমার প্রত্যাশা সামান্যই, কারণ…। পোস্টটার উদ্দেশ্য ছিল এটা দেখানো যে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কম বেশী দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও সবাই কথায় কথায় কিছু পেশার মানুষের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে। বলাই বাহুল্য, পুলিশ এই ক্ষেত্রে বেশ উপরের দিকেই থাকে।

ওই পোস্টেই আমি এটা লিখার চেষ্টা করেছি, এই দেশের পুলিশ কোনকালেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে তো পারেইনি, বরং সরকার তার অন্যায়, অনৈতিক সব ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে পুলিশ বাহিনী দিয়েই। তাই এই বাহিনীর কাছে প্রত্যাশিত সার্ভিস আশা করা স্রেফ বোকামী। কালকের পত্রিকার এই অনুসন্ধানী রিপোর্টটা (হতাশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী * অপরাধীর দলীয় পরিচয় ও প্রভাব * নিয়োগের ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীনদের দাপট) মনযোগ আকর্ষণ করলো। তাই ইচ্ছে হল আবার কিছু লিখার।

রিপোর্টটা ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার বলেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পত্রিকাটি সরকার সমর্থক বলেই পরিচিত। এর সম্পাদক প্রায়ই টিভিতে এসে কাঁচা ভাষায়, এবং অপটু বাচনভঙ্গিতে হলেও মোটা দাগে সরকারের কর্মকাণ্ডের সাফাই গেয়ে যান। রিপোর্টটি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার হবার কারণে হয়তো সরকারের পক্ষে এই বলে উড়িয়ে দেয়া সম্ভবত কঠিন হবে যে -ওই পত্রিকা উন্নয়ণে ব্যস্ত সরকারের পথে কাঁটা বিছানোর চেষ্টা করছে, বা ওরা ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর’।

এই রিপোর্টে কয়েকটি জেলা নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করা হয়েছে, কিন্তু দেশের অন্য জেলাগুলোর পরিস্থিতিও একই বলা হয়েছে। সেটাই হবার কথা; রাজনৈতিক প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলো দেশের সব জেলাতেই একই, মাত্রাগত পার্থক্য আছে হয়তো। প্রশ্ন হল, এটা কি শুধু এই সরকারের সময়ই হচ্ছে? মোটেও না, আগের সব সরকার, বিএনপি আওয়ামীলীগ নির্বিশেষে একই অবস্থাই ছিল। তবে আমার বিবেচনায় এই দেশে সময়ের সাথে সাথে একেকটি সরকার আগের সরকারের চাইতে অনেক বেশী বেপরোয়া আচরণ করে।

আমার আগের পোস্টেও পুলিশের প্রতি এক ধরণের সহানুভূতিই প্রকাশ পেয়েছিল, কারণ মোটাদাগে পুলিশের যেসব ব্যর্থতা আমরা দেখি, সেসবের জন্য পুলিশের দায় অনেক ক্ষেত্রেই নেই; মূল দায় এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর। তাদের নানা অন্যায় আবদার রাখতে গিয়েই পুলিশের ইমেজের আজ এই ভয়ঙ্কর অবস্থা।

বেশ কিছুদিন আগে একটা টক শো তে সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব ডঃ সাদত মজা করে একটা সত্যি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন – সরকার হল সে ই, পুলিশ যার কথা শোনে। তাই এই দেশের সরকারগুলো তাদের ভীষণ রকম উপস্থিতি জনগণকে দেখানোর জন্য নানাভাবে পুলিশকে ব্যবহার করে। এটা চলতে চলতে আজ এমন একক পর্যায়ে চলে গেছে যে, ক্ষমতাসীন দলের চুনোপুঁটিরাও পুলিশের সাথে যাচ্ছেতাই করে (আলোচ্য রিপোর্টটিতেও এমন ঘটনার উল্লেখ আছে)।

এটা বুঝি, পুলিশের সব অনিয়ম, দুর্নীতি শুধু সরকারী দলের লোকজনের প্রভাবের কারণেই হয় না, অনেক পুলিশ সদস্যই নিজেদের সিদ্ধান্তে এমন বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। এটা হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক, অনৈতিকভাবে ব্যবহৃত একটা বাহিনীর অনেকেই নিজের উদ্যোগেই অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়বে। আর সেসব ক্ষেত্রেও তাদেরকে নিবৃত্ত করার কোন নৈতিক ক্ষমতা সরকারের আর থাকে না। তাই এসব চলতেই থাকে, বাড়তেই থাকে উত্তোরোত্তর।

বেড়ে ওঠার পর থেকেই খেয়াল করছি আমাদের জাতির একটা বড় সমস্যা হল, আমরা কোন বিষয় তলিয়ে দেখি না, মূলে যেতে চাই না – যাকে সামনে পাই ঝাঁপিয়ে পড়ি তার ওপরই। একারণেই পুলিশের সমস্যার মূল কারণ সরকারকে, সরকারী দলকে দেখি না; সামনে পুলিশকে দেখি, আর গালিগালাজ করি – অবশ্যই পেছনে, বোধগম্য কারণেই পুলিশকে সামনাসামনি গালিগালাজ করার মুরোদ নেই আমাদের।

তাই এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় আমাদের নিজেদের চরিত্র, নৈতিক মান যাই হোক না কেন, পুলিশের অনৈতিকতা আমরা সহ্য করবো না। অনাগত দিনেও আমরা পুলিশকে নসিহত করে যাব, গালিগালাজ করে যাব। বলাই বাহুল্য আমাদের দেয়া গালির বড় অংশটাই পুলিশের প্রাপ্য না, ওটা প্রাপ্য সরকারী দলের। তাই পুলিশ ক্রমাগত খেয়ে চলছে ‘অন্যের জন্য বরাদ্ধকৃত গালি’।

যদ্দুর জানি, ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় কাজ করার কারণে পুলিশ একটা ‘ঝুঁকি ভাতা’ পায়। তাই পরিহাস করে বলাই যায় – খোদ সরকার, আর সরকারী দলের জন্য বরাদ্ধকৃত গালি নিজে খেয়ে ‘অন্যের হয়ে গালি খাওয়া’ নামে নতুন একটা ভাতা কি পুলিশের জন্য ন্যায্য অধিকার হয়ে যায় না?

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77