ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কিছুদিন আগে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন ডঃ মিজানুর রহমান দারুণ সত্যি একটা কথা বলেছিলেন – “রাষ্ট্রের বাহাদুরী দুর্বলের ওপর“। কথাটা তিনি যে অনুষ্ঠানে, যে পরিস্থিতিতে বলেছিলেন, শুধু সেই ক্ষেত্রেই নয়, কথাটা প্রযোজ্য সবখানে। একটা রাষ্ট্র সমাজের ক্ষমতাহীন, প্রান্তিক মানুষদের (পোস্ট-কলোনিয়াল ডিসকোর্সের ‘সাবআল্টার্ন’) ওপর কতোটা ভয়ঙ্কর নিপীড়ক হয়ে উঠছে তার একটার পর একটা উদাহরণ আমাদের সামনে আসছে।

এতে আমার অন্তত বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, রাষ্ট্র মাত্রই নিপীড়ক, মাত্রাগত ভীন্নতা আছে হয়তো। আর বলাই বাহুল্য সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলো স্বার্থ সংরক্ষণ করে মূলত রাষ্ট্রের উঁচুতলার ক্ষমতাবানদের। আমাদের মত দেশের সাথে তথাকথিত উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেগুলোর পার্থক্য হল, তাদের দেশে এই ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা রাখ-ঢাক থাকে। রাষ্ট্রমাত্রেরই চরিত্র যেহেতু এমন, পৃথিবীর অনেক মননশীল মানুষ মনে করেন, রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই বিলুপ্ত হওয়া ছাড়া (এনার্কিজম) মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ নেই কোনভাবেই। নোয়াম চমস্কির মত মানুষরা আমাদেরকে এনার্কিজমের স্বপ্নই দেখান। যাক, সে ভীন্ন আলোচনা।

কিছুদিন আগের এই খবরটি (ভুয়া সনদে চাকরির চেষ্টা, ২০ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন) সম্ভবত আমাদের অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে। ২০১১ সালে দায়ের করা এক মামলায় এই বছরের ১ সেপ্টেম্বর আদালত ২০ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছে – অনেকে অনুপস্থিত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘গুরুতর’ – জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারের চেষ্টা। তবে লক্ষনীয় ব্যাপার হল ওই ২০ জন মানুষ গিয়েছিলেন পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকুরী পাবার আশায়। অভিযুক্ত মানুষ মাত্রই অপরাধী নয়, কিন্তু আমাদের আলোচনার স্বার্থে ধরে নেই তারা প্রকৃতই এই অপরাধ করেছেন।

এবার আসি সাম্প্রতিক অতীতে আমাদের দেশের দারুণ আলোচিত আরেকটি খবরের প্রতি – রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমলাদের জাল মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকুরীর মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা, এদের মধ্যে আছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও। বেশ ক’জনের সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে, মানে এগুলো যে জাল সেটা প্রমাণিত (দেখুন – ৪ সচিব, এক যুগ্ম-সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত, এবং অবশেষে পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল)। মজাটা হল এরপর, এদের বিরুদ্ধে কিন্তু কোন বিভাগীয়, বা আইনগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তারা কাজ চালিয়ে গেছেন আরামে। আর এদের একজন তো (স্বাস্থ্যসচিব) ওই ঘটনার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ সফরও করেছেন।

এই ব্লগে আমি ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের বিরুদ্ধে একাধিক লিখা লিখেছি। রাষ্ট্র বিনা বিচারে তার কোন অভিযুক্ত/অপরাধী নাগরিককে হত্যা করবে এটা মেনে নেয়া যায় না কোনভাবেই। তবে ওই পোস্টগুলোতে আমি তর্কের খাতিরে ক্রসফায়ার/বন্দুকদ্ধকে জায়েজ ধরে নিয়েও এটা দেখিয়েছি রাষ্ট্র তার এই অস্ত্রটিও প্রয়োগ করে সমাজের প্রান্তিক ‘টাউট’দের ওপর। ওই অস্ত্র যদি যৌক্তিকই হবে তবে সেটা তো সবার আগে প্রযুক্ত হবার কথা ওইসব ‘চুনোপুঁটি টাউট’দের গডফাদার ‘রাঘব বোয়াল টাউট’দের ওপর। কিন্তু না, ওইসব লোক সমাজে আর্থিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, তাই ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের বন্দুকের নল আজ পর্যন্ত একবারও পৌঁছলো না ওই লেভেলের কোন মানুষ পর্যন্ত। ক্রসফায়ারে মারা যায় ‘টাউট’দের মধ্যে যারা ‘নীচুজাত’।

মজার ব্যাপার হল, জাল মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট এর ক্ষেত্রেও ঘটলো একই ঘটনা – পুলিশের কনস্টেবলের চাকুরীপ্রার্থী হয়ে আসা ওই ‘নীচুজাত’ দের বিরুদ্ধেই চার্জ আনা যায়, গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা যায়; তারপর একদিন এদের অনেককেই চৌদ্দশিকেয় ভরা যাবে। অথচ কী দারুণভাবে বহাল তবিয়তে আছেন, দিব্যি চাকুরী করে যাচ্ছেন ‘মহামান্য’ সচিবরা। এখানেও রাষ্ট্রের আইনের হাত ছুঁতে পারে না মহামান্যদের। তাতে কী? ‘আইনের শাসন’ দেখানোর জন্য তো ‘নীচুজাত’রা আছেই।

অতি সামান্য সংখ্যক মানুষের স্বার্থ অন্যায়ভাবে রক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে পিষ্ট করার এই রাষ্ট্রিয় প্রবণতা দেখে হতাশ নই, বরং খুশি হই। কারণ এটা শোষিতের প্রতি রাষ্ট্রের, ক্ষমতাশালীদের দেনার দায় বাড়ায় ক্রমাগত। সত্য মানি নজরুলের কথাকে – “দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!”। হ্যাঁ, এই ‘সাধারণ’ মানুষরাই সহসা এই রাষ্ট্রকে, এই মহামান্যদেরকে ঘাড় ধরে যাবতীয় দেনা শোধ করাবে, করাবেই। এভাবেই আসবে নতুন সময়, নতুন দিন – “তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!”(নজরুল)।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77