ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

Women+cric

শিরোনামটা লিখার পর হঠাৎ করেই মনে হল, আচ্ছা, আমাদের দেশের মিডিয়া কি আমাদের নারী ক্রিকেট দলের সদস্যদের টাইগ্রেস বলে ডেকেছে কখনো? মনে হতেই একবার অনেকগুলো পত্রিকায় ঢুঁ মেরে আসলাম, না কাউকে লিখতে দেখলাম না, অথচ পুরুষ ক্রিকেট দলকে টাইগার সম্বোধন করে কত আদিখ্যেতা সবার! বিষয়টা পারফর্মেন্স এর কারণে বলে আমি মোটেও মনে করি না। আজ পুরুষ দলের পারফর্মেন্স অনেকটাই টাইগারের মত (বিশেষ করে দেশের মাটিতে), কিন্তু ওই দলের পারফর্মেন্স যখন বিড়ালের চাইতেও খারাপ ছিল, তখনও ওই দলকে আমরা টাইগারই ডেকেছি। কিন্তু মেয়েদের দলটা টাইগ্রেস খেতাব পেলো না, এটা নারীর প্রান্তিকতার এক দারুণ প্রমাণ। যাক, আসা যাক মূল আলোচনায়।

আমাদের টাইগ্রেসদের পাকিস্তান যাবার সিদ্ধান্ত এবং সেটা কার্যকরী করার সময় নির্বাচন করা হয়েছে দারুণ চালাকির মাধ্যমে। সবাই যখন কোরবানি দেবার প্রাণী কেনা আর সেটা দিয়ে ভুরিভোজনে ব্যস্ত তখনই ঘটলো ঘটনাটা – নানা ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজে লাগিয়ে এখন এটা এই সরকারের ট্রেডমার্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষনীয় ব্যাপার হল আমাদের টাইগ্রেসদের এই সফরের বিরুদ্ধে খুব বেশী প্রতিবাদ হয়নি এই দেশের প্রথাগত এবং সোশ্যাল মিডিয়ায়। নারীদের স্বার্থ দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা এনজিও গুলোও ছিল স্রেফ চুপ।

ফিরে যাই কয়েক বছর আগে, আমাদের ‘টাইগার’দের পাকিস্তান সফরের কথা উঠতেই আমরা (যৌক্তিকভাবেই) খুব প্রতিবাদী হয়ে উঠলাম। আমাদের মূলধারার মিডিয়া তো বটেই, ফেইসবুকেও ঝড় বইয়ে দিলাম আমরা। টাইগারদের প্রাণাশঙ্কায় দুই আইনজীবী হাইকোর্টে রীতিমত রীট করেন। মাননীয় হাইকোর্টও যৌক্তিকভাবেই ওই সফর স্থগিত করে রায় দেন (দেখুন)।

আমরা জানি, ২০০৯ শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দলের ওপর জঙ্গি হামলার পর থেকে দীর্ঘদিন কোন দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পাকিস্তান যায়নি। ওই সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পাকিস্তান যাবার প্রশ্নই উঠারই কথা ছিল না। অভিযোগ আসে তৎকালিন বোর্ড চেয়ারপার্সন জনাব লোটাস কামাল আইসিসি’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচত হবার পেছনে পাকিস্তানের শক্ত সমর্থনের ঋণ শোধ করতে হত কামালকে। সাথে বানিজ্য তো আছেই, তাই আমাদের ক্রিকেট দলের পাকিস্তান সফরের সেই প্রশ্ন উঠেছে। শেষমেশ সবার সন্মিলিত প্রতিবাদে সফর বাতিল হয়েছিল – টাইগার বলে কথা, ওরা নেহায়েত ‘নারী ক্রিকেট দল’ নয়।

কেউ কেউ বলছেন, ২০০৯ তো অনেক কাল আগের কথা, এর মধ্যে তো অনেক কিছুই পাল্টে গেছে, পাকিস্তান ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার ব্যাপারে অনেক সতর্ক হয়েছে। আমরা যারা কিছুটা হলেও খোঁজখবর রাখি তারা জানি, ‘নজিরবিহীন’ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এই বছরই জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল পাকিস্তান সফর করেছিল। কিন্তু সে নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই খেলা চলাকালীন স্টেডিয়ামের ঠিক বাইরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় হতাহত হয়েছিল বেশ কয়েকজন (দেখুন)। আর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি যথেষ্ট সন্তোষজনকই হবে, আইসিসি কেন পাকিস্তান সফরে আম্পায়ারসহ ম্যাচ অফিসিয়াল পাঠায় না? কেন সফরকারী দলকে ‘নিজ দায়িত্বে’ যেতে বলে?

এরপরও আমাদের টাইগ্রেসদের পাকিস্তান যেতে হল। সালমারা পাকিস্তানে না গেলে বিপিএল এ পাকিস্তান তাদের ক্রিকেটারদের পাঠাবে না – এই হুমকি কাজ করলো। ছেলেদের একটা টুর্ণামেন্ট টাকায়-তারকায় জমজমাট করার স্বার্থে কিছু মেয়ের ওপর ঝুঁকি তো নেয়াই যায়। অবাক ব্যাপার হল, ব্যাপারটা ঘটলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে, ক্রিড়া মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন সেটা। কই প্রধানমন্ত্রী তো টাইগারদেরকে পাকিস্তান পাঠানোর জন্য এমন কোন ‘বাণী’ দেননি! অংকটা খুব সহজ – এই সমাজে নারীর অবস্থান সব ক্ষেত্রেই এতোটা প্রান্তিক যে, তাদের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের আদেশ উপেক্ষা করা সম্ভব না। প্রমাণ হল, সালমা আর সাকিবের পার্থক্য আলোকবর্ষ।

শুধু সরকার কেন, আমরাও তুলণায় নিশ্চুপ হয়ে আছি। টাইগারদের জন্য কত শুভাকাঙ্ক্ষী চারদিকে, কত নিউজ, কলাম, টক শো, রীট! গরু-ছাগলের হাটের খবরের ভীড়ে সালমারা জায়গা পেয়েছে সামান্যই, ফেইসবুকেও একই। সবচাইতে মর্মান্তিক ব্যাপার, সালমাদের কপালে জুটলো না কোন ‘মহানুভব’ রীটকারী। মহানুভাবতা বাদই দেই, রীট করে টিভি ক্যামেরার সামনে এসে ফাও প্রচারের সুযোগটুকুও নেবার ইচ্ছে হল না একজন আইনজীবীরও! নাকি ‘নারী ক্রিকেট দল’ এর পক্ষ নেয়া বরং নেতিবাচক প্রচার হবে তাদের জন্য?

আমরা বিবেচনায়ও নিলাম না, সালমাদের ওপর ঝুঁকি সাকিবদের চাইতে বেশী। ক্রিকেটার হওয়া জনিত ঝুঁকি তো আছেই, তার ওপর ওরা নারী। তালেবানদের দারুণ প্রভাব থাকা পাকিস্তানে মেয়েরা ‘বেপর্দা’ হয়ে খেলতে যাওয়া নিশ্চয়ই তালেবানদের টার্গেটে পরিণত করবে ওদের। তাই ভীতি যৌক্তিক, আর সালমারাও সেটা প্রকাশ করেছিলেন; এই লিখায় দেখা যাবে সালমা বলছেন,

“পাকিস্তান সফর নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও ভয় কাজ করে, আমাদের তো করবেই।” সেই সঙ্গে তিনি এও বলেছিলেন, “বিসিবি বললে তো যেতেই হবে।” ওসবে আমাদের অবশ্য মন গলেনি; তোয়াক্কা করতে হবে মেয়েমানুষের কথার!

খুব গর্ব করে আমাদের দেশের অনেকেই বলেন, দীর্ঘকাল ধরে এই দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী। এখন তো প্রধানমন্ত্রী, ‘পাতানো’ বিরোধী দলীয় নেত্রী, ‘বাস্তব’ বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার সবাই নারী। গদগদ হয়ে অনেকে এটাকে দেখিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের দারুণ উদাহরণ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেন। হ্যাঁ, এটা হতে পারে, কেবলমাত্র ওই সব পদে যেতে পারলেই নারীর প্রান্তিকতা ঘোচে। কিন্তু নারী ক্রিকেট দলের (টাইগ্রেস নয়) পাকিস্তান যেতে বাধ্য হওয়া এটা আবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো সমাজের আপামর নারীরা এখনো প্রান্তিক; এখনো ওরা মানুষ নয়, ‘মেয়েমানুষ’।

facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77