ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কাল একসাথে ‘চাঞ্চল্যকর’ দুই শিশু হত্যা মামলার রায় হল। শিশুকে পিটিয়ে, আর মলদ্বারে কম্প্রেসড বাতাস ঢুকিয়ে মেরে ফেলা দেশজুড়ে ভীষণ ‘চাঞ্চল্য’ তৈরি করেছিল। তার ওপর একজনকে পিটিয়ে মারার ভিডিও আমাদের ‘বিবেক’কে নাড়া দিয়েছিল। তাই এই রায়ে আমরা খুশিও হয়েছি দারুণ।

এই মামলার সুত্রে আমাদের বিচার বিভাগও দেখালো কত ‘করিতকর্মা’ তারা। বাংলাদেশের মানদণ্ডে একরকম বিদ্যুৎ গতিতেই বিচারের রায় হল বলা যায়। বছরের পর বছর দূরেই থাকুক মাত্র চারমাসের মাথায় বিচারকাজ সম্পন্ন হল – রাজন হত্যায় ১৯ আর রাকিব হত্যায় ১১ কার্যদিবসে।

না, মামলার এই ত্বরিত রায়ে আমি অনেকের মত খুশিতে আটখানা হয়ে যাইনি বরং আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র আমাকে ভীত করেছে। প্রথম আলোর এই রিপোর্টে দেখা যায়, স্বয়ং এটর্নি জেনারেল স্পষ্টভাবেই বলছেন গণমাধ্যম এবং জনগণের চাপেই এই মামলাগুলোর দ্রুত রায় হয়েছে। তবে জনগণ আর মিডিয়ার চাপ সব সময় কাজ করে কিনা সেটা আমরা আলোচনার পরের অংশে দেখবো।

এই দেশের একজন নাগরিক, যিনি চান এই দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, আইনের ‘নিজস্ব গতি’ স্রেফ কথার কথা না হয়েই থাক, তার জন্য কালকের এই রায় এক ধরণের হতাশাও তৈরি করবে। গণরায়হীন সরকার ‘হাওয়া বুঝে’ আচরণ করার কারণ বোধগম্য, কিন্তু আদালতও কাজ করবে ‘হাওয়া বুঝে’!

রাজন-রাকিব হত্যাকারীদের ফাঁসির আদেশে উল্লাস করতে করতে আমাদের অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে আরেকটা খবর – শিশুকে গুলি করে মারাত্মক আহত করা এমপি লিটন ফুলের মালা গলায় দিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসেছে (বিস্তারিত)। এই ঘটনাটিও তো খুব চাঞ্চল্যকর ছিল। এতোটাই চাঞ্চল্যকর ছিল যে, আমাদের পুলিশ বাহিনী যখন তাকে খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন রীতিমত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এমপি সাহেবকে গ্রেফতার হতে হয়। সংসদ অধিবেশন শুরু হচ্ছে, এই অজুহাতে লিটন জামিন পেয়েছেন। যদিও ফৌজদারী মামলায় জামিন না পাবার সবচাইতে বড় কারণটি (প্রতপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো) তার ক্ষেত্রে খুব ভালভাবেই প্রযোজ্য ছিল (দেখুন)। অবশ্য তাকে গ্রেফতারের পর কী হবে, এই দেশে বাস করে আমরা জানি ভালভাবেই। তার গ্রেফতারের আগেই একটা পোস্টে লিখেছিলাম, সরকার তাকে আটক করে একটা ‘আইওয়াশ’ দেবে, তবে সে বেরিয়েও আসবে অচিরেই।

আরো উদাহরণ দেয়া যায়। রাজন-রাকিবের চাইতে কি কম চাঞ্চল্যকর ছিল নারায়নগঞ্জের সাত খুন? কিন্তু সেই মামলায় কেন কচ্ছপগতি। রাজন হত্যা মামলার আসামী কামরুলকে দ্রুতই নিয়ে আসা হয় সৌদি আরব থেকে। আর সাত খুন মামলার আসামী নুর হোসেন ভারতে ধরা পড়ে থাকে ‘বিচারাধীন’, যদিও ভারতের পূর্বের সাত রাজ্যের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের (বা বিচ্ছিন্নতাবাদী) আমরা তো ধরে ধরে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, কোন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ এর মামলা না করে। ওদিকে ভারত নূর হোসেনকে ফেরৎ দিতে রাজি হয়েছে কিছুদিন আগে। কিন্তু কামরুলকে ফিরিয়ে আনতে আমাদের কর্মকর্তারা যতোটা সক্ষমতা দেখিয়েছেন, সেটা এখন কোথায়? জানা একটা তথ্য আবার দেই – এই ‘চাঞ্চল্যকর’ হত্যায় জড়িত র‍্যবে করা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা, যার একজন কর্ণেল পদমর্যাদার। তার চাইতেও বড় কথা কর্ণেল সাহেব আওয়ামী লীগের এক ডাকসাইটে নেতার (এবং মন্ত্রী) জামাতা।

ওই নারায়নগঞ্জেরই আরেক ‘চাঞ্চল্যকর’ ত্বকী হত্যা নিয়ে মিডিয়া আর জনগণের আগ্রহ, চাপ কি কম ছিল? কিন্তু এখানেও বিচারে শম্বুকগতি। এখানেও একটা জানা তথ্য উল্লেখ করে রাখি – ত্বকী হত্যার সাথে জড়িত বলে অভিযুক্ত হয়েছে নারায়নগঞ্জের সবচাইতে প্রভাবশালী পরিবারটি। যার সবচাইতে আলোচিত সদস্যটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে গো হারা হেরে গেলেও থাকেন বহাল তবিয়তে আর আইভীর পথে ক্রমাগত কাঁটা বিছিয়ে চলেন।

কিছুদিন আগে জনৈকা মহিলা এমপি’র পুত্র বখতিয়ার জ্যামে বিরক্ত হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি করে একজন সিএনজি আর একজন রিক্সাচালককে হত্যা করে। বলা বাহুল্য এটাও দারুণ চাঞ্চল্য তৈরি করে মিডিয়ায় আর আমাদের মধ্যে। সেই মামলায় কত কার্যদিবস গেল আমরা কি খবর রেখেছি? সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের অগ্রগতি কদ্দুর? এই মামলায় কি মিডিয়া আর জনগণের চাপ ছিল না?

এটর্নি জেনারেলের ভাষায় মিডিয়া আর জনগণের চাপে নাকি মামলার রায় দ্রুত হয়। কথাটা খণ্ডিত – এই কেইস স্টাডিগুলো দেখে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, মিডিয়া আর জনগণের চাপে বিচার দ্রুতগতির হতে পারে, যদি অপরাধীদের মধ্যে প্রভাবশালী কেউ না থাকে। কামরুল-ময়না, আর শরীফ-মিন্টুরাই এই দেশের আদালতের ত্বরিত গতি দেখে, কারণ অপরাধীদের মধ্যেও এরাই প্রান্তিক; এরা কেউ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, এমপি না, এমনকি তাদের নিকট আত্মীয়ও না।

আর বিচার বিভাগ কেন পপুলিস্ট আচরণ করবে। যে হত্যা চাঞ্চল্যকর না, যে হত্যায় মিডিয়া আর জনগণের চাপ জারি থাকে না, সেই সব হত্যা মামলা কি চলতেই থাকবে অনন্তকাল? কেন হত্যার শিকার আরেক শিশুর বাবা আহাজারি করে বলেন, ‘আমার তো ভিডিও নাই, আমি কি দ্রুত বিচার পাব?’ অন্তত বিচার বিভাগ কি সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারেন না, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান? নাকি তাঁরাও জানেন এগুলো সব কথার কথা। হাওয়া বুঝে সিদ্ধান্ত নেবেন কোন মামলার সুরাহা কতদিনে করবেন?

কাল রায়ের পর আমাদের এটর্নি জেনারেলের সাথে সুর মিলিয়েছে প্রায় সব পত্রিকা, টিভি চ্যানেল – অতি দ্রুত রায় হবার কারণে দেশের বিচার ব্যবস্থায় কালকের দু’টো রায় একটা মাইলফলক (বলা বাহুল্য, কথাটা পজিটিভ অর্থে বলা)। আমিও মনে করি এই রায় আমাদের বিচার ব্যবস্থায় একটা মাইলফলক, কিন্তু এটা অত্যন্ত খারাপ একটা মাইলফলক।

এই রায় আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে এই আপনি যদি অন্যায়ের শিকার হন, আর সেটা নিয়ে মিডিয়া আর জনগন সেটা নিয়ে যথেষ্ট হাউকাউ না করে তবে বিচার পেতে পেতে যুগ কেটে যাবে। যদি সেটা নিয়ে মিডিয়া আর জনগন যথেষ্ট হাউকাউ করে, তাহলে আপনি দ্রুত বিচার পেতেও পারেন। এর মধ্যেও একটা বিশাল কিন্তু আছে, মিডিয়া আর জনগন যতই হাউকাউ করুক না কেন আপনার কাছের কাউকে যদি প্রভাবশালী কেউ, বা তাদের পরিবারের কেউ হত্যা করে, তবে আপনি দেখবেন, এই দেশের বিচারের গতি শামুকের বা কচ্ছপের। এমনকি সেই গতিতে বিচার পেলেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা তো আছেই শেষ রক্ষাকবচ হিসাবে (এই সরকারের আমলেও এটা ঘটেছে বেশ কয়েকবার)। ওরা বেঁচেই যায়।

এই রাষ্ট্রযন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা সবকিছু প্রভাবশালীদের পক্ষেই। তাদের অপরাধের ক্ষেত্রে মিডিয়া, জনগণের হাউকাউ অহেতুক কোলাহল ব্যতীত কিছু নয়।

facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77