ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাবা-মা কে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ঐশীর ফাঁসির রায় হয়েছে ক’দিন আগে। সেটা নিয়ে পত্রিকায় বড় বড় শিরোনাম, টিভিতে আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানীদের কত বিশ্লেষণ! আমরাও আমাদের মত করে বিশ্লেষণ করে যাচ্ছি ঐশীর ফাঁসি ন্যায়বিচার হয়েছে, নাকি হয়নি। উল্লেখ্যোগ্য ব্যাপার হল, আমাদের যাবতীয় আলোচনা হচ্ছে কিন্তু ঐশীকে বাবা-মায়ের খুনী হিসাবে ধরে নিয়েই। এই দেশের অসংখ্য মানুষ যোগ দিয়ছেন ঐশীর দলে। এইদিক বিবেচনা করলে ঐশী সৌভাগ্যবান, ভয়ঙ্কর অপরাধের পরও সে ন্যায়বিচার পেয়েছে কিনা সেই বিবেচনাবোধ মানুষের কাছে সে পাচ্ছে।

না, এই পোস্টের বিষয় ঐশী না, ঐশী এখানে স্রেফ একটা কেইস স্টাডি। এটুকু আলোচনা দরকার ছিল এই দেশের ‘বিবেকবান’ মানুষদের দ্বিচারিতা দেখাতে। এই রাষ্ট্রে দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ায় একটা নিয়মতান্ত্রিক বিচারে একজন মানুষের বিচার হবার পরও সেই বিচারের ন্যায়ানুগতা নিয়ে আমরা আলোচনা করি, ঐশীর পক্ষে দাঁড়াই। অথচ এই দেশেই আবহমান কাল থেকে অসংখ্য মানুষকে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-পকেটমারির মত অপরাধের অভিযোগে যে অসংখ্য মানুষকে মেরে ফেলছি স্রেফ পিটিয়ে, সেই খবর আমাদের নাড়া দেয় না মোটেও। না, নাড়া দেয় না, কথাটা মনে হয় ঠিক না; ওসব খবর আমাদের চোখে পড়লে আমরা বরং খুশিই হই, ভাবি, যাক এই দেশ থেকে কয়েকটা চোর-ডাকাত তো অন্তত কমলো। আমাদের অনেকেরই জন্য তেমন সুসংবাদ মাঝে মাঝেই পত্রিকার পাতায় আসে, যেমন আসলো কালও – ফরিদপুরের গ্রামে ডাকাতি, গণপিটুনিতে নিহত চার ডাকাত। হ্যাঁ, আরো চারজন ডাকাত কমেছে এই দেশে।

জনগণ চোর-ডাকাতকে কেন পিটিয়ে মেরে ফেলছে, সেটা নিয়ে নানা রকম সমাজ-মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়াই যায়, মাঝে মাঝে দেনও অনেকে। কিন্তু যে কোন ব্যখ্যাই মানুষের এই আচরণকে নৈতিক বা আইনি বৈধতা দেয় না। যুগের পর যুগ ধরে এই দেশের মানুষরা এই বর্বর, মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, এটা মেনে নেয়া যায় না কোনভাবেই। কিন্তু ভয়ঙ্কর সত্য হল, এই হত্যাকাণ্ডের এক ধরণের সামাজিক বৈধতা তৈরি হয়েছে। এই সমাজে যদি কেউ দাবী করে যে সে ডাকাত পিটিয়ে মারায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তাহলে সে প্রায় সবার চোখে খুনী হওয়া দূরেই থাকুক, হবে হিরো।

মানুষের এই মানসিকতার চাইতেও মর্মান্তিক ব্যাপার হল, এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দিচ্ছে স্বয়ং রাষ্ট্র!  যুগের পর যুগ এভাবে পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে কিন্তু কোন একটা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হল না। কয়েক বছর আগে গাবতলীতে শবে বরাতের রাতে কয়েকজন তরুণকে পিটিয়ে মেরে ফেলা নিয়ে মিডিয়ায় ‘চাঞ্চল্য’ তৈরি হওয়ায় পুলিশের কিছু নড়াচড়া দেখা গিয়েছিল, কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত হালে পানি পায়নি। ওদিকে এই চাঞ্চল্য তৈরি হওয়ার কারণটাও আমাদের অমানবিকতার একটা এক দারুণ প্রমাণ। গাবতলীর ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহতরা ডাকাত ছিল না, তারা ছিল ঢাকা থেকে নেশা করতে যাওয়া ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ। নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে মারা জাগ্রত করেছিল আমাদের বিবেককে, তাই ওই গণপিটুনি ছিল ‘চাঞ্চল্যকর’। ওটা পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল। ওই ছয় তরুণ সত্যি সত্যি ডাকাত হলে অনিবার্যভাবেই সেটা হতো পত্রিকার এক কোনার একটা খবর।

ভীষণ কষ্ট হয় পিটুনি খেয়ে মরে যাওয়া চোর-ডাকাতগুলোর জন্য। যারা মানুষের বাড়িতে গিয়ে ডাকাতি করে, ভীড় বাসে পকেট মারে, সেইসব চুনোপুঁটি অপরাধি ধরা পড়লে তাদের কপালে মরণ লিখা থাকে। অথচ এই রাষ্ট্রের সবচাইতে বড় অপরাধীরা বসে থাকে রাষ্ট্রের সবচাইতে বড় পদগুলোতে, যাদের তুলনায় মার খেয়ে মরে যাওয়া ওই মানুষগুলোর অপরাধ তো কিছুই না। অপরাধীদেরকে মওকা মত পেলে পিটিয়ে মেরে ফেলা জায়েজ আছে, এই ধারনা যদি আরো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে থাকা সবচাইতে বড় ডাকাতদেরকে ধরেও কি তাহলে জনগণ একই কাজ করবে?

মানুষই যদি যার যার প্রাপ্য তার মত করে বুঝিয়ে দিতে শুরু করে তাহলে তো স্বয়ং রাষ্ট্রই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র কি বুঝতে পারছে না, এইসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে নির্লিপ্ততা দেখিয়ে রাষ্ট্র প্রকারান্তরে নিজের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে? এটা জনগণের সাথে রাষ্ট্রের কি চুক্তির লংঘন নয়?

একজন চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারী যদি হাতেনাতে ধরাও পড়ে তাকে কি পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়? ডাকাতি বা ছিনতাই এর শাস্তি কি মৃত্যুদণ্ড? এমনকি যে অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (যেমন হত্যা) সেই অপরাধীকেও কি পিটিয়ে মেরে ফেলা জায়েজ? মেরে না ফেলে ভয়ঙ্কর পিটুনি দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা যাবে? একজন অপরাধী, সে যত ভয়ঙ্করই হোক না কেন, সে কি এই রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? তার কি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাবার অধিকার নেই? অপরাধীর কি মানবাধীকার নেই? যারা গণপিটুনি দিয়ে মানুষকে হত্যা বা আহত করে তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে না? তাদের কি কোন শাস্তি এই রাষ্ট্র দেবে না?

কেউ করুক বা না করুক আমি ওপরের প্রশ্নগুলো করছি। কেউ চাক বা না চাক, আমি আমাদের এই অপরাধীদের রাষ্ট্রের কাছে ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার চাই। যে যাই ভাবে ভাবুক, তাদের এই অধিকারের পথে বলতে চাই, “আমি ডাকাতের দলে আছি, আমি পকেটমারের দলে আছি”। কনক আদিত্যর যে গানের কথা অনুসরণ করে এই শিরোনাম লিখা হয়েছে (গানের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভীন্ন), তার মধ্যেই আছে একটা আহ্বান – “তুমিও থাকো বন্ধু হে”।

চোর-ডাকাত-পকেটমার-ছিনতাইকারীদের পিটিয়ে মেরে ফেলার প্রতিবাদের দলে থাকার জন্য আমিও জানাতে চাই ওই আহবানটা্ই – “তুমিও থাকো বন্ধু হে”।

facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77