ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

প্রায় সব ক্রিটিক এর বিবেচনায় পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমার তালিকায় আকিরা কুরোশাওয়া পরিচালিত রশোমন সিনেমাটা থাকেই। কিছু কিছু সিনেমা আমাদের নতুন জীবনবোধে ঋদ্ধ করে, আমার বিবেচনায় তেমনই একটি সিনেমা রশোমন সবার অবশ্যই দেখা উচিৎ। মাস্টারপিস আর্টের শরীর গুরুত্বপূর্ন, তবে আজ সেই আলোচনায় না গিয়ে আজকের পোস্টের সাথে প্রাসঙ্গিক এই সিনেমার প্লট নিয়ে খুব সংক্ষেপে কিছু কথা।

জনৈক সামুরাই তার স্ত্রীকে নিয়ে বনের মধ্য দিয়ে যাবার সময় কুখ্যাত ডাকাত দ্বারা আক্রান্ত হয়। সামুরাই এর স্ত্রীকে ডাকাত ধর্ষণ করে (বিষয়টা অবশ্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়) এবং সামুরাইকে খুন করে। এখানে তিনজন মানুষ ঘটনার সাথে জড়িত, আর ওই বনে যাওয়া একজন কাঠুরিয়াও আছে যে ঘটনাটা দেখেছে। ওইদিন ওই বনে ঠিক কী ঘটেছিল সেটা ওই চারজন মানুষের বয়ানে জানাটাই হলো রশোমন সিনেমার প্লট। মজার ব্যাপার হলো একই ঘটনা চারজনের বয়ানে ভীন্ন। তিনজন ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল, কিন্তু যে একজন ‘নিরপেক্ষ’ দর্শক, তার বয়ানও একজনের সাথে মেলে না, এমনকি সে দাবী করে ঘটনায় জড়িত তিনজনই মিথ্যে বর্ণনা দিয়েছে। এবং আমরাও জানতে পারি না, আসলেই কে সত্য বলেছে, বা আসল সত্যটা কী?

সত্য সাবজেক্টিভ, এটাই রশোমন সিনেমার দার্শনিক থিম (পরিচালক কিছুটা ভিন্ন ধরণের কথাও বলেছেন)। সত্যের অবজেক্টিভিটিকে দারুণ শক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এই সিনেমায়। এই সিনেমায় বিষয়টাকে এতো অসাধারণভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, একই ঘটনার নানা সাবজেক্টিভ বয়ান দেবার নামই হয়ে গেছে “রশোমন এফেক্ট”। অনেক সিনেমা, গল্প, উপন্যাস পরবর্তীতে “রশোমন এফেক্ট” ব্যবহার করেছে।

আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বেশ খানিকটা পরে। বেড়ে ওঠার সময় থেকে পাঠ্য বইয়ে, চারপাশের মানুষদের কাছ থেকে, মিডিয়ায় এবং অবশ্যই আমাদের দেশের “রাজনৈতিক” দলগুলোর কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নানা বয়ান শুনে আসছি। বলাই বাহুল্য, বয়ানগুলোর মধ্যে নানা দিকেই অমিল আছে। এক সময় এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব অবাক লাগতো, একই ঘটনার এতো রকম বয়ান কেন? এতো রকম বিশ্লেষণ কেন? সময় গেল, জীবন বুঝতে শুরু করলাম, জানতে শুরু করলাম মানুষের চিন্তার ধরণ সম্পর্কেও। তাই আজ বুঝি, এটাই তো হবার কথা, এটাই তো রশোমন এফেক্ট – মানুষ তার মতো করে তার সুবিধামত বয়ানই তৈরি করে। তাই আজ আর অবাক হই না, যখন দেখি খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া বা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় রা মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে বালখিল্য মন্তব্য করেন। আগেও অবাক হইনি যখন আওয়ামী লীগের লোকজনও যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা রকম বালখিল্য মন্তব্য করেছিল।

না, আমি এই পোস্টে কোনক্রমেই এই আলোচনায় ঢুকছি না, কার কোন মন্তব্য কতোটা ফালতু, কতোটা মিথ্যা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা দেখে কিছু কথা লিখছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বয়ান ক্ষমতাসীন পক্ষের পছন্দ হচ্ছে না বলে, তারা এবং তাদের পক্ষের ‘সুশীল’রা ডিনায়াল ল করার কথা বলছে। সামনে উদাহরণ আনছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদি নিধনের সংখ্যা বিতর্ক ধামাচাপা দেয়ার জন্য করা “ল এগেইনস্ট হলোকাস্ট ডিনায়াল” এর। এটা অবশ্য জনগণ খুব কমই জনতে পেরেছে যে, এই আইন নিয়ে নানা বিতর্ক আছে শুরু থেকেই। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে কিছু দরকারী তথ্য – এটা বলবৎ হয়েছে শুধুমাত্র এই দেশ গুলোতে: Austria, Belgium, Czech Republic, France, Germany, Hungary, Israel, Liechtenstein, Lithuania, Luxembourg, Netherlands, Poland, Portugal, Romania, Slovakia, and Switzerland। হলোকাস্ট ডিনায়াল পৃথিবীর আর সব দেশে বেআইনি নয়। জাপান, ইতালির মত নাৎসিদের পক্ষের শক্তির কথা বাদ দিলাম, এমনকি ব্রিটেন, রাশিয়া আর আমেরিকার মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বিরোধী শক্তিও এই আইন করেনি। কেন? এমনকি এই আইন থাকা কিছু দেশে এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু হয়েছে অসাংবিধানিক বলে।

আরো মজা আছে, যেসব মানুষ হলোকাস্টকে ডিনাই করেছে সেসব মানুষের গায়ে এন্টি-সেমিটিক (আক্ষরিকভাবে এর মানে হলো সেমেটিক ভাষা ভাষীদের প্রতি বিদ্বেষ, তবে পারিভাষিকভাবে ইহুদী বিদ্বেষ) তকমা লাগিয়ে তাকে যাচ্ছেতাই অপমান করার একটা চর্চা আছে ডিনায়াল ল করার প্রবক্তাদের মধ্যে। আমাদের দেশেও বিশেষ এক পক্ষের বয়ানের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের কোন ইতিহাস বলতে চাইলে তাকে রাজাকার/স্বাধীনতাবিরোধী তকমা লাগিয়ে গালিগালাজ নিত্যকার রেওয়াজ। বিএনপি ওয়ালাদের কথা বাদই দেই, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং উপ-অধিনায়ক, এ কে খন্দকার বা তাজউদ্দীন কন্যা শারমীন তাঁদের বইয়ে ক্ষমতাসীনদের বয়ানের সাথে সাংঘর্ষিক কথা বলে রীতিমত স্বাধীনতাবিরোধী তকমা পেয়েছিলেন। ক্ষমতাসীনদের বয়ানের বাইরে কথা বলাই রাজাকার খেতাবপ্রাপ্তির জন্য যথেষ্ঠ? এখানে যুক্ত করতে চাই হলোকাস্ট ডিনাই কারীদেরকে এন্টি-সেমিটিক আখ্যা দেয়া নিয়ে নোয়াম চমস্কির একটা উক্তি “I see no antisemitic implications in denial of the existence of gas chambers, or even denial of the holocaust”।

হাওয়ার্ড জিন, বিখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ, নানা কারণে বিখ্যাত হলেও তাঁর সবচাইতে আলোচিত কাজ হিসাবে বিবেচনা করা হয় ১৯৮০ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই “A People’s History of the United States” কে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের সময় থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের ওপর শত শত বই আমেরিকায় থাকলেও তিনি আরেকটি বই লিখার তাগিদ বোধ করেছিলেন। কারণ সম্পর্কে জিন বলেছিলেন, আমেরিকার প্রচলিত ইতিহাস হচ্ছে গুটিকতক এলিট এর রচিত তাদের পছন্দের ইতিহাস, এখানে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নেই, অনেকগুলো বিকৃত করা হয়েছে। তাই গণমানুষের কাছে গোপন বা বিকৃত করা ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে নিয়ে আসা দরকার। ওই বইয়ে তিনি সেটা করেছিলেন। তবে স্বার্থে আঘাত লাগা সেইসব এলিট গেল গেল রব তুলেছিল, এমনকি জিনকে আমেরিকাবিরোধী তকমাও দেয়া হয়েছিল; কিন্তু কেউ সেই বইকে আইন করে বন্ধ করার কথা বলেনি। আজ আমেরিকার ইতিহাসের ওপর লিখা অসংখ্য বইয়ের ভিড়ে ওই বইটির অনেক উঁচুতে অভস্থান করে, কোন নোংরা সমালচনা বা তকমা সেটাকে আটকাতে পারেনি।

দলবাজির বাইরে আমরা সাধারণ মানুষরা চাই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর সবদিক থেকে আলো পড়ুক। এভাবে ওই ইতিহাসের অনেক অন্ধকার দিক উন্মোচিত হবে। স্বপ্ন দেখি দলবাজি না করা কোন মানুষ একদিন এই দেশের সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি “আ পিপলস হিস্ট্রি অফ লিবারেশন ওয়ার” লিখবেন যেটা সত্যিকার ইতিহাসের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছবে। আবার এটাও জানি, কিছু মানুষ ওই পিপল’স হিস্ট্রির বাইরে কিছু বলতে চাইলে নিশ্চয়ই অনেকে আবার ডিনায়াল ল করে তাদের দমানোর চেষ্টা করতে চাইবে – বেঁচে থাকলে সেদিনও ওই আইন করার বিরুদ্ধে কলম ধরবো।

ইতিহাসের নামে যে কেউ (সে যতো প্রভাবশালী/বিখ্যাত হক না কেন) যাচ্ছেতাই বললেই সেটা যেমন ইতিহাস হয়ে যায় না, তেমনি ডিনায়াল ল বানিয়ে সত্যি ইতিহাসকেও ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস এটাকে বারবার প্রমাণ করেছে, কিন্তু আমরা সেটা থেকে শিখছি না। তাই ইতিহাস নিয়ে পুরনো প্রবাদটির চর্বিত চর্বণ আবার – “ইতিহাসের সবচাইতে বড় শিক্ষা হল, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না”।

facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77