ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মাস পাঁচেক আগের কথা, রাজন নামের এক শিশু কাঁপিয়ে দিয়েছিল আমাদের সবাইকে। রাজনকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে, তার মুখে “আমি মরি যাইয়ার, আমারে কেউ বাঁচারে বা” আহ্বান আমাদের ভেতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল। কী ঝড়টাই না আমরা বইয়ে দিয়েছিলাম (অ)সামাজিক মাধ্যমে!

এর কিছুদিন পরেই আবার আরেক শিশু দৃশ্যপটে – রাকিব। এক দোকানে কাজ ছেড়ে অন্য দোকানে কাজ করার ‘অপরাধে’ তাকে আগের দোকানে ডেকে এনে মেরে ফেলা হয় তার মলদ্বারে কমপ্রেসড বাতাস দিয়ে, যেটা চাকার টায়ারে দেয়া হয়। না, রাকিবের ওই ঘটনার ভিডিও ছিল না, তবুও এই ঘটনাও আমাদের ‘বিবেক’কে বেশ নাড়া দেয়। আনকোরা নতুন একটা পদ্ধতিতে একটা শিশুকে মেরে ফেলা আমরা মেনে নিতে পারিনি। তার ওপর মাত্রই কিছুদিন আগে রাজনকে মেরে ফেলা জনিত ক্ষত আমাদের মনের মধ্যে রয়েই গিয়েছিল।

মানুষের অবিশ্বাস্য তীব্র প্রতিক্রিয়া আমাদের বিচার বিভাগের টনকও নড়িয়ে দেয়। বিদ্যুৎ গতিতে ওই দুই হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক রায় হয়ে যায় নিম্ন আদালতে। দ্রুততম সময়ে ওই মামলার আপিলও শেষ হবে, খুব দ্রুতই ওই আসামীরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে, জানি।

কিন্তু বীভৎস নানা উপায়ে অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে প্রান্তিক শিশুদেরকে নির্যাতন করার ইতিহাস বেশ প্রাচীন, তুচ্ছ ঘটনায় পিটিয়ে মেরে ফেলাও ততোটা সময়েরই ঘটনা। কিন্তু ওই দু’টি ঘটনায় আমরা দারুণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলাম। বাস্তবে কি আমরা আমাদের সমাজকে একটা সত্যিকার মানবিক সমাজ হিসাবে দেখতে চাই? সমাজের মানুষদের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সত্যিই কাজ করতে চাই? সম্ভবতঃ না।

এবার আসি সাম্প্রতিক সময়ে – খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার খবর উল্লেখ করছি।
ঝিনাইদহে তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা
দোকানে কাজ না করায় কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা!
প্রতিশোধ নিতেই শিশু আজিমকে গলা কেটে হত্যা

কয়েকজন শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে, গলা কেটে আর পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ কী অবিশ্বাস্য রকম নিশ্চুপ! অন্য ঘটনাগুলোর কথা বাদই দেই, শুধুমাত্র পারিবারিক বিরোধের কারণে ঘরে ডেকে এনে তিন তিনটি শিশুকে একসাথে পুড়িয়ে মারার ঘটনা আমাদের ‘বিবেক’কে এক ফোঁটাও নাড়া দিলো না! কই আমরা তো ফেইসবুক ভরিয়ে ফেললাম না প্রতিবাদে!

তবে কি ওই ঘটনাগুলোর ভিডিও আমরা দেখিনি তাই? নাকি পিটিয়ে, পুড়িয়ে আর গলা কেটে মারা মলদ্বারে কমপ্রেসড বাতাস ঢুকিয়ে মারার মতো অভাবনীয় কোন পন্থা না সেজন্য? নাকি রাজন-রাকিবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর ভাঁড়ার শূন্য করে ফেলেছি? নাকি আসলেই এই সমাজকে একটা মানবিক সমাজ হিসাবে গড়ে তোলার ইচ্ছে আমাদের মনের গভীরে নেই, তাই?

এসব দেখি ক্রমাগত, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাগুলো মনে পড়ে যায়। কী অসাধারণভাবেই না তিনি আমাদের চরিত্র বুঝতে পেরেছিলেন! আসুন, সবার জানা কথাগুলো আরো একবার পড়ে নেই –

“আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না। আড়ম্বর করি, কাজ করি না। যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না। যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না। ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না। আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না। সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি। পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সন্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তি বিহ্বল হইয়া ওঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য”।

facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77