ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিষয়টা মিটে গেছে আপাতত। ব্যবসায়ী মহলের শক্ত প্রতিবাদের মুখে এনবিআর র‍্যাবের প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছে (বিস্তারিত), প্রস্তাবটি ছিল – ভ্যাট আদায়ে যুক্ত হতে চায় র‍্যাব। বিষয়টি মিটে গেলেও এই ঘটনাটা আলোচনার দাবী রাখে। কারণ র‍্যাবের ভ্যাট আদায়ের দায়ীত্ব পালন করতে চাওয়া আসলে একটা রোগের উপসর্গ, রোগ নয়। রোগটার যদি চিকিৎসা না করা হয়, সেটা আবার নতুন কোন উপসর্গ নিয়ে হাজির হবেই আমাদের সামনে।

 

RAB

র‍্যাবকে কোন কাজে সম্পৃক্ত করার আগে আমাদের প্রথমেই ভাবতে হবে র‍্যাবের সৃষ্টি করা হয়েছিল কেন। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুলো কী কী? র‍্যাবের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, তাদের মিশন হল – “সন্ত্রাস দমন ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা”। ওয়েবসাইট অনুযায়ী তাঁদের কাজ – আভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা; অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ, বিস্ফোরক এবং এই ধরণেরক্ষতিকারক দ্রব্য উদ্ধার; অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা; আইন শৃংখলা পরিস্থিতি রক্ষায় অন্যান্য আইন শৃংখলাসহায়তা প্রদান করা; যে কোন সংঘটিত অপরাধ ও অপরাধীদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করা; সরকারী আদেশ অনুসারে যে কোন অপরাধের তদন্ত করা; অন্যান্য যে কোন সরকারী দায়িত্ব কর্তব্য। তাই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে যৌক্তিক প্রশ্ন আসেই, ভ্যাট আদায় করা করা কি তবে র‍্যাবের কাজ?

র‍্যাব এই প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি দিয়ে বলেছে যে তারা ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালণা করেছে খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল ইত্যাদি কাজে। আমি মনে করি, এসব কাজ আসলে র‍্যাবের কিনা তাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে এখনই। যারা এসব ভেজালের কাজ করেন, তারা গোপনে করেন। তারা অস্ত্রশস্ত্র কিংবা বোমা সাথে নিয়ে এ কাজ করেন বলে মনে হয় না। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর হাতে কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক গ্রেফতার, সাজা কিংবা উদ্ধার হওয়া কোন স্থানেই তো অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র তো দূরের কথা, তাদের আক্রমণে কোন পুলিশ কিংবা র‍্যাবের কোন সদস্য মারা যেতে বা আহত হতে। তাই এ কাজগুলোর জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিনির্ভর বলে দাবিকৃত র‍্যাবের প্রয়োজন কেন? তাহলে তো এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এসেই যায়, আমাদের নিয়মিত পুলিশ বাহিনীর কাজ কী?

আমি কোনভাবেই মনে করি না, র‍্যাবের মূল কাজগুলো ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে কিংবা তাদের কাজের অভাব পড়েছে। কারণ পত্রিকার পাতা খুললে সন্ত্রাসীদের খুন জখম, হত্যা সন্ত্রাস এখনও আমাদের আতঙ্কিত করে। গত বছরটি পুরোটাই ছিল জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্ন নাশকতা, খুন, বোমাবাজি, চাপাতিবাজি কিংবা বড় বড় নেতা বা ব্যক্তিত্বদের খুন করার পরিকল্পনার বছর। যেখানে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ দেশে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেখানে সেই দিকে মনোনিবেশ না করে র‍্যাব ভ্যাট আদায়ের মতো একটি আটপৌরে কাজ করতে চায়, যে কাজটি কাজটি তাদের নয়! যদি র্যা ব মনে করে, তারাই এজন্য যোগ্য সংগঠন, তবে এনবিআরকে বিলুপ্ত করে র‍্যাবের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যায়।

এখানে আরেকটা বিষয় যুক্ত করা দরকার, মাঝে মাঝেই পত্রিকায় দেখতে পাই, র‍্যাবের কিছু কিছু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এটা-ওটা করেছে। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝি না, কোন ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে কোন পুলিশ অফিসার কিংবা সংগঠনের কমান্ডে কাজ করে? বিষয়টি যদি এমনই হয়, র‍্যাবের অধীনে যদি আদালত থাকে, তাহলে দেশের সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ কিংবা জেলা পুলিশে অধীনেও কিছু ম্যাজিস্টেট পদায়ন করে তাদের নিজস্ব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার অনুমতি দিচ্ছি না কেন আমরা? আর বিষয়টি যদি এমনই দাঁড়ায়, তাহলে দেশে বিচার ব্যবস্থা বলে আর কিছু থাকবে না, দেশটা সত্যিকার অর্থেই একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হবে (আশংকা করি এর মধ্যেই দেশ সেই পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে)।

র‍্যাবের সমালোচনাগুলো সরিয়ে রাখলেও ইতোমধ্যে র‌্যাবের কারণে আমাদের নিয়মিত পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা কমছে কিনা সেই প্রশ্নও আলোচিত হচ্ছে। সেখানে র‍্যাব আরো যতো বেশী অন্যান্য কাজে জড়িত হবে, ওই সব সংস্থার সক্ষমতা ততোই প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে। এভাবে আমরা কোনকালেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবো না, আর সেটা করা না গেলে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেবার কথা বলে যে আমরা ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাই ক্রমাগত, সেটা স্রেফ দ্বিবাস্বপ্ন হয়েই থাকবে।

র‍্যাব যদি এলিট ফোর্সেই হয়ে থাকে, তবে তাকে এলিট হিসেবেই থাকতে দেয়া উচিৎ। আটপৌরে পুলিশিং কিংবা অপুলিশি কার্যক্রমে র‍্যাবকে যদি নিয়োগ করা যায়, র‍্যাব অতিসত্তর একটি মামুলি ফোর্সে পরিণত হবে। আর যদি র‍্যাবের নির্ধারিত কাজগুলো শেষ হয়ে থাকে এবং তাদের কোন কাজই না থাকে তবে তাদের একটি সংগঠন হিসেবে এটাকে টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতাও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

র‍্যাব কেন এসব করছে সেটা বোঝার জন্য আমাদের ক্ষমতার অন্তর্নিহিত প্রবণতা সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে। ক্ষমতার অন্তর্নিহিত প্রবণতাই হলো সেটা আরো বেশি ক্ষমতা চায়। ক্ষমতার অন্তর্নিহিত প্রবণতাই হলো সেটা স্বেচ্ছাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত হতে চায়। তাই একটা রাষ্ট্রে কারো হাতে যদি একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকে, তাহলে সেটা ক্রমান্বয়ে আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবেই। ১৯৯০ পরবর্তী আমাদের ‘গণতান্ত্রিক’ শাসনের সময় আমরা দেখেছি একজন ব্যক্তি যখন একই সাথে দল, সরকার, সংসদ এর প্রধান হচ্ছেন, তখন থেকেই দেখি রাষ্ট্রের যাবতীয় সব ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আর সেই কেন্দ্রীভবন ক্রমাগত বাড়ছে। কোন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠমো নির্ধারনের মতো অতি মামুলি বিষয়ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সমাধান হয় না।

২০১৪ সালের জানুয়ারির পর থেকে যে সরকার এই দেশে বহাল আছে সেটার আইনী ভিত্তি থাকলেও কোন নৈতিক ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না। সরকারের অনেক মন্ত্রী/সরকার দলীয় নেতা বাইরে অনেক আত্মবিশ্বাসীর মতো ভাণ ধরলেও সরকার এটা না বোঝার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। তাই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সরকার নির্ভর করছে প্রশাসন, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর ওপর। তাই পুলিশ বাহিনী অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ক্ষমতাশালী অবস্থায় আছে। আর ক্ষমতার চরিত্র অনুযায়ী পুলিশ আরো বেশী ক্ষমতা চাইছে এবং অনিবার্যভাবেই সেটার মধ্যে স্বেচ্ছাচারী হবার প্রবণতা বাড়ছে; বাড়ছে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত হবার প্রবণতাও। এটা যে শুধু র‍্যাব করছে সেটা না, করছে নিয়মিত পুলিশ বাহিনীও।

এবারের পুলিশ সপ্তাহে সরকারের কাছে তাদের দাবী-দাওয়ার ফিরিস্তি দেখলেই সেটা স্পষ্ট। বিভাগীয় সুযোগ-সুবিধার কথা বাদ দিলেও মেডিক্যাল কলেজ আর ব্যাংক চাওয়াটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন তাঁরা? অবশ্য এদেশের আর্মি মেডিক্যাল কলেজ, ভার্সিটি, ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে ক্যাব পর্যন্ত চালায়, তো পুলিশ সেটা চাইবে না কেন? কথায় কথায় নানা বিষয়ে (যৌক্তিকভাবেই) পাকিস্তানের সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা, কিন্তু বাহিনীগুলোর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চাওয়ার ‘পাকিস্তানী মানসিকতা’র সমালোচনা করে না আমাদের ‘সুশীল’ সমাজ।

এই দেশের ক্ষমতাশালীরা মানুক বা না মানুক সংবিধান অনুযায়ী এই দেশের একজন মালিক মনে করি নিজেকে; তাই আমি চাই, এই দেশে ক্ষমতার সব কেন্দ্রের মধ্যে একটা ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে – হোক সেটা দেশের সর্বোচ্চ পদধারী, কিংবা র‍্যাব। এজন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে রকম প্রতিষ্ঠান, নাগরিকরা থাকেন ওয়াচ ডগের ভূমিকায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সরকারগুলোর রাজনীতির নামে ক্ষমতা দখল করে স্রেফ নিজেদের আখের গোছানোর মহোৎসবে এই দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া তো অনেক দূরের কথা, সেটা দিনে দিনে আরো বেশী ভারসাম্যহীন হয়ে উঠছে। সময় এসেছে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার। আমরা যেন যেন ভুলে না যাই Edward Dalberg Acton এর সেই বিখ্যাত উক্তি

“Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely”

পূনশ্চঃ আমার একটা ব্যক্তিগত দুঃখবোধের জায়গা হলো কিছুদিন আগেই ডিসি দের যাবতীয় ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করে রাখার মানসিকতার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ নিয়ে একটা পোস্ট লিখেছিলাম (ডিসি-এসপি দ্বন্দ্ব এবং পোস্টকলোনিয়ালিজম নিয়ে কিছু কথা), কিন্তু আজ একই ধরণের অভিযোগ করছি আমি র‍্যাব (পুলিশ) এর বিরুদ্ধে। আসলে ক্ষমতার প্রবণতা এটাই, আর সেই ক্ষমতা ভারসাম্যহীন হলে তো কথাই নেই।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77