ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দলীয় কর্মীর মতো খালেদা জিয়ার বাড়ি ঘেরাও করেও (মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদে) সম্ভবত শেষ রক্ষা করতে পারলেন না তিনি। হ্যাঁ, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের কথা বলছি, যিনি এই মুহূর্তে দেশের সবচাইতে আলোচিত দুই জন মানুষের একজন (অপরজন ডেইলি ষ্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম)। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আর আওয়ামী সমর্থক কিছু ‘সুশীল’ ছাড়া প্রায় সবাই মাহফুজ আনামের পক্ষে দাঁড়ালেও শামসুদ্দিন হয়ে পড়েছেন একেবারেই বন্ধুহীন।

 

এমনকি সরকারও তাকে এখন আর তাঁকে ওউন করছেন না; এর প্রমাণ এটর্নী জেনারেলের এই সমালোচনা (বিস্তারিত)। গতকাল শামসুদ্দিন চৌধুরী আছেন বলে একটা অনুষ্ঠানেই যাননি মাননীয় আইন মন্ত্রী (বিস্তারিত)। আর গতকালই সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীও গতকাল এক সভায় বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন, এবং প্রচন্ড কঠোর সমালোচনা করেছেন (যৌক্তিকভাবেই) শামসুদ্দিন চৌধুরীর (বিস্তারিত দেখুন)। এখানে একটা তথ্য খুব প্রাসঙ্গিক না হলেও গুরুত্বপূর্ণ – বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাই তিনি বিএনপি জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন বলে অভিযোগ শামসুদ্দিন চৌধুরী বা আর কেউ খুব সহজে করবে বলে মনে হয় না।

 

শামসুদ্দিন চৌধুরী কী করেছেন, কী করছেন সেটা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। একের পর এক নজিরবিহীন কাণ্ড তিনি ঘটাচ্ছেন – প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখা, আর সেটার কপি গণমাধ্যমের হাতে তুলে দেয়া, প্রধান বিচারপতির সাথে টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ডিং মিডিয়ায় ফাঁস করা, গণমাধ্যমের টক শো’তে এসে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করা, সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চাওয়া, প্রধান বিচারপতিকে রাজাকার বলা ইত্যাদি। অন্য সব অভিযোগের কথা বাদ দিলেও তিনি যখন এই অভিযোগ করেন, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা শান্তি কমিটির সদস্য তখন এই তিনি এই দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর সন্মান নর্দমায় ফেলে দেননি? তাঁরা একজন রাজাকারকে এই দেশের প্রধান বিচারপতি পদে বসিয়েছেন? আর এটা যদি সঠিক হয়, তাহলে শুধু প্রধান বিচারপতির কেন, তার তো উচিৎ তাঁর নিয়োগকর্তাদের পদত্যাগ চাওয়া, তাঁরাই তো একজন ‘রাজাকার’কে দেশের আইন বিভাগের সর্বোচ্চ পদে বসিয়েছেন। চাইবেন তিনি?

 

এই দেশের সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমাদের আতঙ্কের কারণ হলো নজিরবিহীন কাণ্ডগুলোর কোনটাই ভালো নয়, সব নজিরই নোংরা। এই ‘ভদ্র’লোকের কাণ্ড কারখানা দেখে আমাদের এই ভয়ের যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে – কোন সব মানুষ এই দেশের বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে আমাদের বিচার করেন, যার পর আর কোন আইনী প্রক্রিয়া নেই, বিবেকই শেষ কথা। মানি, আপিল বা হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতি এই লোকের মতো নন। কিন্তু শামসুদ্দিন চৌধুরী যে কারণে এমন বেপরোয়া, সেরকম পরিস্থিতি আমাদের বিচার ব্যবস্থায় আছে, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

 

মেরী শেলীর বিখ্যাত উপন্যাস “ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস” এ বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মৃত ব্যাক্তির মধ্যে প্রাণসঞ্চার করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করে সেটা এক মৃত ব্যাক্তির উপর প্রয়োগ করলে মৃত ব্যাক্তি ঠিকই বেঁচে উঠে, কিন্তু পরিনত হয় এক ভয়ঙ্কর দানবে (দানবটির নাম এই উপন্যাসে না থাকলেও যারা উপন্যাসটি পড়েননি বা এর গল্প সম্পর্কে ধারণা নেই তারা ভুল করে দানবটিকেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বলেন)। পরিহাসের বিষয় হলো, এক পর্যায়ে এই দানবের হাতেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সহকারী, ভাই, স্ত্রী, অন্য অনেক মানুষ এবং সবশেষে ফ্রাঙ্কেনটাইন নিজেই মারা যায়। এই গল্পের কারণেই কখনো কারো সৃষ্টি যখন সৃষ্টিকর্তারই বিপদ ডেকে আনে, তখনই এই দানবের কথা ফিরে আসে বারংবার। আজ শামসুদ্দিন চৌধুরী ‘দানব’ হয়ে উঠে তাঁর সৃষ্টিকর্তাকে বিপদে ফেলছেন; হ্যাঁ, এটাই হবার কথা ছিল।

 

এ বিচারপতি প্রথমবার আওয়ামী লীগের আমলে (১৯৯৬-২০০১) নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপির খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় শাসনকালে (২০০১-২০০৬) তাকে আর স্থায়ী করা হয়নি। কিন্তু হাসিনা সরকার তার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৮-২০১৪) তে এসে তাকে পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে এনে স্থায়ী করেন, যদিও গোড়া থেকেই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী এই মানুষটি সম্পর্কে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল।

 

হাইকোর্ট বিভাগে থাকার সময়ই তিনি ‘উল্টোপাল্টা’ আদেশ দেয়া শুরু করেন – যখন তখন এই সমাজের নানা সন্মানিত মানুষকে আদালতে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করেছিলেন তিনি। ওই সময়ই জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকাররের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নেয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করে কী গোলমালটাই না বাঁধালেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে সংসদের অনির্ধারিত দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদের মতো সাংসদগণও তাকে ‘স্যাডিস্ট’ বলে মন্তব্য করেন (কাল সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীও স্পষ্টভাবেই বলেছেন, শামসুদ্দিন চৌধুরী প্রমাণ করেছেন তিনি স্যাডিস্ট)। তাঁর সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষমতা আবার সংসদের হাতে নিয়ে আসার দাবীও উঠেছিলো। ওই সময়ের ঘটনা আবার একটু ফিরে দেখতে চাইলে দেখুন – বিচারপতি মানিককে অপসারণের দাবি সংসদে; ‘সংসদের কাজ আইন প্রণয়ন করা, বিচার করা নয়’

 

ওই ঘটনার পর অবশ্য তার ‘কেশাগ্র’ স্পর্শ করা দূরেই থাকুক, তিনি দেখিয়ে দেন তার সরকারি সংযোগ কতোটা মজবুত। সেটা এতটাই মজবুত ছিল যে, যে স্পিকারের বিরুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা উচিৎ বলে মত প্রকাশ করেছিলেন, সেই স্পিকার এডভোকেট আব্দুল হামিদই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তাকে আপীল বিভাগে নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একজন ‘স্যাডিস্ট’ মানুষকে জেনে শুনে কেন দেশের বিচার ব্যবস্থার একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়োগ দেয়া হলো? শামসুদ্দিন চৌধুরীকে দানবে পরিণত করার ষোলকলা সেদিনই পূর্ণ হয় বলেই আমার বিশ্বাস। আর সেই দায় কি সরকারের একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষদের ওপর বর্তায় না?

 

বিচারপতি থাকা অবস্থায় তিনি তার আওয়ামী লীগ সংযোগের পূর্ণ পরিচয় দিতে শুরু করেন। বিভিন্ন রায় বা আদেশে তিনি যেসব কথা বলতেন, যেগুলো বিচারপতি তো দূরের কথা বিচার বিভাগের যে কোন পদে থেকেই দেয়া সংগত নয় বলে যে কোন নিরপেক্ষ নাগরিকই মনে করে। এরপর তিনি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জনাব চৌধুরী। সেই বিতর্কের বিষয়বস্তু নিয়ে বেশী আলোচনা করছি না; এখনো বেশ ‘গরম’ বলে ওটা আমাদের কম-বেশি জানা আছে, পোস্টের আগের অংশে এই ব্যাপারে কিছুটা উল্লেখ করা আছে।

 

সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে বিচারপতির আসন অলঙ্কৃত করাটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও রয়েছে। কিন্তু দলীয় রাজনীতির ধ্বজাধারী আইনজীবীগণও একবার বিচারপতি হয়ে গেলে তাদের শপথের সপক্ষে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এটা এতো ন্যাক্কারজনকভাবে হয়েছে যে বিচারপতি নিয়োগে যোগ্যতা, নৈতিকতা এসব ধর্তব্যের মধ্যে এসেছে খুব কমই। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রবীন আইনজীবীদের একজন ব্যারিস্টার রফিকুল হককে আমি টিভির টক শো’তে বলতে শুনেছি, তাঁরা জানেন, বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের ওটা আওয়ামী কোর্ট, আর ওটা বিএনপি কোর্ট”। কয়েক বছর আগে প্রধান বিচারপতির মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ‘বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় প্রলয় ঘটে গেছে’। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় প্রলয় ঘটা যতোটা যতোটা না ভয়ের কথা, তার চাইতেও অনেক বেশী ভয়ের কথা, সেই প্রলয় বন্ধ তো হচ্ছেই না, সেটা আরও দির্ঘায়িত হচ্ছে, আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। শামসুদ্দিন চৌধুরীর ঘটনা সেটা আরেকবার আমাদের সামনে প্রকাশ্য করে দিলো।

 

শামসুদ্দিন চৌধুরি বিচার বিভাগ থেকে চলে যাবার সময় যে বিতর্কের জন্ম দিলেন তাতে এটা আবার প্রমাণিত হল যে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য, দলান্ধ বা স্বার্থান্ধ লোকদের বিচার বিভাগে নিয়োগ করলে সেটা যেমন বিচারপ্রার্থীদের সন্তুষ্ট করতে পারে না, তেমনি সরকারের জন্যও বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। বিচারপতি শামসুদ্দিন তার গোটা চাকরিজীবনে যে সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যেসব বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এবং প্রধান বিচারপতির মতো পদটিকে যেভাবে ছোট করার চেষ্টা করেছেন, তাতে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের শরীরের একটি স্থায়ী কাঁটা হিসেবেই বিবেচিত হবেন। এমন চর্চা যে শুধু আওয়ামী লিগই করেছে, সেটা না একই চর্চা করেছে বিএনপিও। তাদের সময় জাল সার্টিফিকেট দিয়ে বিচারপতি হবার নজিরও দেখেছে এই দেশ।

 

দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে একজন শামসুদ্দিন চৌধুরির দাপিয়ে বেড়ানো আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার এক গভীর ক্ষতকে নির্দেশ করে। ক্ষমতায় গিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয়করণ এতোটাই সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে যে, এর কবল থেকে রক্ষা পায় না দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ও।

 

একটা দানব তৈরি করার জন্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে খুব বেশী দায়ী করা যায় না, তিনি ভুলক্রমে ওই দানব তৈরি করেছিলেন। কিন্তু জেনেশুনে দিনের পর এমন লোককে বিচারক নিয়োগ করে, যাচ্ছেতাই স্পর্ধা দেখাতে দিয়ে এমন ‘দানব’ তৈরি করার দায় অবশ্যই এই সরকারের। এক ‘দানব’ শামসুদ্দিন চৌধুরীকে আপাতত থামিয়ে দিয়ে কোন লাভ হবে না, যদি সরকার এই ‘দানব’ তৈরির পরিস্থিতি জারি রাখে। আমি জানি ক্ষমতায় গিয়ে স্রেফ নিজেদের আখের গোছানোই যাদের কাজ, আমাদের সেই সরকারগুলো এই পরিস্থিতি জারি রাখবে, আর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব ফিরে আসবে নতুন কোন রূপে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77