ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

কিছুদিন আগে দ্য ডেইলি স্টার এর ২৫ বছর পূর্তিতে এর এর সফল সম্পাদক জনাব মাহফুজ আনাম যে কারণে আলোচিত হতে পারতেন, সেটা না হয়ে হলেন সম্পূর্ণ ভীন্ন কারণে আলোচিত হচ্ছেন তিনি। অনেকেই মুখে তাঁর মুণ্ডুপাত করতে করতে এখন সেটাকে মানহানি আর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় এনে ঠেকিয়েছে। মাহফুজ আনামের মন্তব্যে আগুন জ্বলে গিয়েছিল শুরুতেই, কিন্তু অচিরেই ফেইসবুক স্ট্যাটাস লিখে তাতে ঘৃতাহুতি দেন আমাদের ‘ক্রাউন প্রিন্স’। ১/১১ এর সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় যাচাই না করে ডিজিএফআই এর সরবরাহকৃত খবর ছাপানোটা তাঁর ভুল হয়েছে, এই মর্মে স্বীকারোক্তি এই পরিস্থিতি তৈরী করেছে।

মাহফুজ আনামের এই স্বীকারোক্তি সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা, ব্যাপ্তি-চৌহদ্দি নিয়ে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক আলোচনার সূত্রপাত করাতে পারতো। কিন্তু না, ওটা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে ‘বাগে পাওয়া’ মাহফুজ আনামকে একহাত দেখিয়ে দেয়ার চেষ্টায়। মাহফুজ আনাম এটা কেন করেছেন? কেন এতোদিন পরে করেছেন? এখন এটা করার উদ্দেশ্য কী? এই অভিযোগ মাথায় নিয়ে তাঁর কি পদত্যাগ করা উচিৎ না? তাঁর পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া উচিৎ কিনা? তাঁর বিরুদ্ধে কি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হওয়া উচিৎ না? হাজারো প্রশ্ন ভাসছে চারদিকে।

একদিকে সংসদে ‘অনির্বাচিত’ সাংসদরা বিষয়টি নিয়ে ভীষণ সোরগোল তুলে, যাচ্ছেতাই ‘ফাতরা’ কথা বলে ‘খালি কলসি’ সম্পর্কিত আমাদের লোকজ প্রবাদটি মনে করিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে দারুণ ‘বিজ্ঞ’ আওয়ামী সুশীলরা ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ ব্যাখ্যা করছেন জনাব আনামের আচরণের। কেউ কেউ পাল্টা ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন মাহফুজ আনামের দিকে।

যাবতীয় সব প্রশ্ন, আলোচনা শুনতে শুনতে আমার মতো একজন অতি সাধারণ একজন মানুষের মনে কিছু বোকা বোকা প্রশ্ন উঁকি দিলো। যেহেতু এটা ব্লগ, আর আমার মতো কিছু অতি সাধারণ মানুষই এটা পড়ে, বোকা বোকা প্রশ্নগুলো করেই ফেলা যাক। আসলে ওই সময়কার ঘটনাগুলো মাত্র তো কয়েক বছর আগের ঘটনা, তাই এখনো ভুলে যাইনি এখনো। এ কারণেই মাহফুজ আনামকে নিয়ে যা হচ্ছে সেটা দেখে বোকা বনে গেছি; আর বোকা বনে যাওয়া মানুষ বোকা বোকা প্রশ্ন করবে এটাই তো স্বাভাবিক।

১. ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবার পর নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘এই সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল’ উক্তি করেছিলেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গভবনে সেই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি সদলবলে হাস্যোজ্বল মুখে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তো, শুরু থেকেই ১/১১ সরকারের সাথে বর্তমান সরকারের এতো দহরম-মহরম কেন?

২. ওই সরকার ক্ষমতা নেবার পর বর্তমান সরকারী দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সকাল-বিকাল বলা হয়েছে, ওই সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি দেবে তারা। দিয়েছেও। কেন দিয়েছে সেটা?

৩. তর্কের খাতিরে ধরে নেই ১/১১ সরকারের শুরুতে আওয়ামী লীগ বুঝতে পারেনি, তারা অনেক দমন পীড়ন করবে, পরে বুঝেছে সেটা। তো ওই সরকারের শেষে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে কেন তারা ওই সরকারের হর্তাকর্তাদের বিরুদ্ধে একটা মামলা পর্যন্ত করেনি?

৪. ১/১১ এর প্রধান কুশীলবদের একজন ছিলেন সভার ক্যান্টনমেন্ট এর জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ। কেন তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়? কেনইবা প্রথম মেয়াদ শেষ হবার পরে এই সরকার তার চুক্তির মেয়াদ আবার বাড়িয়ে পুরস্কৃত করে?

৫. সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বিপদে ফেলার মতো জবানবন্দি দিয়েছেন (এর অনেক অডিও-ভিডিও আজও পাওয়া যায় ইউটিউবে) তাঁর দলেরই অনেক নেতা। তারা আজ সাংসদ, মন্ত্রী হয়ে দাপিয়ে বেড়ান কেন?

৬. মাহফুজ আনাম ‘মাইনাস টু’ প্রবক্তাদের একজন, তাই খুব খারাপ কাজ করেছেন তিনি। মানলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগের ‘বিরাট’ চার নেতা আমু-তোফায়েল-রাজ্জাক-সুরঞ্জিত (শোনা যায় প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে এদের নামের ইংরেজি আদ্যাক্ষর নিয়ে এদেরকে বলেন ‘RATS’) যারা ‘মাইনাস টু’ কার্যকরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের তিনজন কেন মন্ত্রিত্ব পেয়ে পুরস্কৃত হন?

৭. ডিজিএফআই এর সরবরাহকৃত খবর ছাপিয়েই যদি মাহফুজ আনাম রাষ্ট্রদ্রোহ করে থাকেন, তাহলে মূল সংস্থা ডিজিএফআই এর কর্মকর্তা যারা এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন, তাদের কী করা হয়েছে? নানা সূত্রেই জানা যায়, দল ভাঙার বা মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পেছনে মূল কারিগর ছিল ডিজিএফআই। কোন আইনগত ব্যবস্থা কি নেয়া হয়েছে কারো বিরুদ্ধে?

৮. আজকের বহু ‘সুশীল’ যারা মিডিয়ায় মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে তোপ দাগাচ্ছেন, তাদের অনেকেই ১/১১ এর পর কী বলেছেন, সেটার রেকর্ড পত্রিকা, টিভিতে আছে। কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে? নাকি বর্তমান ‘নাকে খৎ’ মুছে দিয়েছে তাদের অতীত অপরাধ?

৯. যে কাজটি মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করার পর্যায়ের ‘অপরাধ’, সেই কাজের তুলনায় হাজার গুন বড় সব কাণ্ড ঘটানোদের (ওপরে যার কিছু উল্লেখ আছে) বিরুদ্ধে কী করা উচিৎ তাহলে?

১০. মাহফুজ আনাম কী অপরাধ করেছেন, কতোটা অপরাধ করেছেন, তাঁর কী শাস্তি হওয়া উচিৎ এসব নিয়ে আলোচনা করার কোন নৈতিক অধিকার কি বর্তমান সরকারের কারো আছে? আয়নায় নিজেদের মুখ দেখেন না তাঁরা?

১১. শেষ প্রশ্ন – আমার খুব আগ্রহ এটা জানার, ক্ষমতার ‘সিংহাসন’ টায় এমন কী আছে যে ওটায় বসলেই আর সব মানুষকে আহাম্মক আর অকাট মূর্খ বলে মনে হয়?

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77