ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

মোস্তফা একজন ‘তুচ্ছ’ ট্রাকচালক। প্রায় সব ট্রাক চালক তো বটেই, আমাদের অনেকের চাইতে একজন ভীন্ন মানুষ তিনি। যেখানে বেপরোয়াভাবে ট্রাক চালিয়ে অনেক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে পত্রিকার খবর হন ট্রাকচালকেরা, সেখানে মোস্তফা খবরে এলেন সম্পুর্ন ভীন্ন কারণে। একজন ‘নগন্য’ পোষাক শ্রমিক সুমনও পত্রিকার খবর হয়েছিলেন মাস পাঁচেক আগে, একেবারেই অবিশ্বাস্য এক কারণে। কী সে কারণ সেটায় ফিরে আসবো আরেকটু পরে।

আদিতে মানুষ যে কারণেই রাষ্ট্র বানিয়ে থাকুক না কেন, বর্তমান পৃথিবীতে রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার যন্ত্র। এর ফল স্পষ্ট দারুণভাবে – জগৎ জুড়ে আজ এক শতাংশের বিরুদ্ধে নিরানব্বই শতাংশের প্রতিবাদী আওয়াজ উঠছে। সমাজ/রাষ্ট্রের চরিত্র কিছুটা বুঝে ওঠার পর থেকেই দেখছি, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রটিও হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাশালীদেরই স্বার্থের রক্ষাকবচ। নানাভাবে এর বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি চারিদিকে।

আমাদের রাষ্ট্র অনেক সময়ই কিছু নাগরিকের বা তাঁদের পরিবারের পক্ষে দাঁড়ায়। মাঝে মাঝেই আমরা পত্রিকায় দেখি একে-তাকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। মিলিয়ে দেখলে দেখবো এসব মানুষের মধ্যে এক ধরণের মিল আছে – এরা সবাই কম/বেশী পরিচিত মানুষ; প্রধানত খেলোয়াড়/বিভিন্ন সেক্টরের শিল্পী/সাহিত্যিক। তাই এটা অনেকটা রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে যে, তেমন কোন মানুষ অসুস্থ হলে, মারা গেলে রাষ্ট্রীয় সাহায্যের আবেদন জানানো হবে। আর আমাদের রাষ্ট্রও বারবার প্রমাণ করে দেয়, সে এক শতাংশের পক্ষে।

‘তেলা মাথায় তেল’ দেবার এই মানসিকতা কোন ব্যক্তি দেখালেও দেখতে পারে তার নিজের পকেটের টাকা দিয়ে, কিন্তু জনগণের করের টাকায় তৈরী হওয়া কোষাগারের টাকা খরচ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালীদের এরকম পপুলিস্ট আচরণ করাকে আমি স্রেফ অপরাধ বলে মনে করি। বিষয়টি নিয়ে দু’টো পোস্টও লিখেছি আগে – শিল্পী-সাহিত্যিকদের মর্যাদা কি চাষাদের চাইতে বেশি? এবং হায়! আমি হুমায়ূন আহমেদ নই!

ফিরে আসছি মোস্তফার কথায়। অন্যান্য দিনের মতো মোস্তফা তাঁর ট্রাক নিয়ে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে জানা যায়, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হঠাৎই রাস্তার উঠে আসে মোস্তফার ট্রাকের সামনে। না, মোস্তফা হঠাৎ উঠে আসা ওই মানুষটিকে পিষে ফেলে না, বাঁচাতে চায়, যদিও হঠাৎ ট্রাকের সামনে উঠে আসা মানুষকে বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি না নেবার অধিকার ছিল তাঁর। মোস্তফা ট্রাক ঘুরিয়ে ফেলেন, কিন্তু তাঁর ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে থেমে থাকা আরেকটা ট্রাকের সাথে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। মারা যান মোস্তফা। আমার গল্পে ঐ প্রতিবন্ধী মানুষটি পার্শ্বচরিত্রও না, তবুও পাঠকের কৌতুহল থাকতে পারে ভেবে জানাচ্ছি – তিনিও বাঁচেননি। (বিস্তারিত খবর)।

এবার সুমনের গল্প। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে জানা যায়, ট্রেন লাইনে চলন্ত ট্রেনের সামনে এক শিশুকে দেখতে পেয়ে কোন দ্বিধা না করে তাকে বাঁচাতে ছুটে যান সুমন। শিশুটি বেঁচে যায়, কিন্তু জীবন দেন সুমন। (বিস্তারিত খবর)।

জানি, মোস্তফা বা সুমন যা করেছেন সেটা আমাদের সমাজে প্রচলিত সংজ্ঞায় ‘নায়ক’ হবার জন্য আদৌ যথেষ্ট নয় – কারা এই সমাজের নায়ক, কাদেরকে এই সমাজে নায়ক বানানো হয় সেটা জানি আমরা। কিন্তু আমি মনে করি মোস্তফা আর সুমনই আমাদের সত্যিকারের নায়ক। মোস্তফা আর সুমন জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দেন, এই সমাজটা একেবারে পচে যায়নি। এই সমাজে এখনো কিছু মানুষ আছেন যাঁরা এখনো মানুষকে বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নেন, জীবন দেন; আমাদের মত আরও বেশী নার্সিসিস্ট হতে হতে সমাজটাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন না প্রতিনিয়ত।

আমাদের রাষ্ট্রে একজন ট্রাকচালক বা পোষাক শ্রমিক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসেন, যাপনও করেন দরিদ্রের জীবন। যৌক্তিভাবেই অনুমান করা যায়, তাঁদের অমানুষিক পরিশ্রমের টাকায় কোন রকমে জীবনযাপন করতো তাঁদের পরিবার। এতে কোন সন্দেহ নেই, মোস্তফা আর সুমনের মৃত্যু তাঁদের যার যার পরিবারে অন্ধকার নামিয়ে এনেছে। এই পচে যাওয়া সমাজে সত্যিকারের নায়ক হবার মাশুল দিচ্ছে তাঁদের পরিবার; আধ পেটা খেয়ে, ছেঁড়া কাপড় পড়ে আর বিনা চিকিৎসায় মরে। দুইটি ঘটনার পরই তন্ন তন্ন করে অনেক খবরের কাগজ বা টিভি নিউজের স্ক্রলে চোখ রেখেছি। আশা নিয়ে নয়, আমার বিশ্বাস প্রমাণ করার জন্য – না, আমাদের রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি ওই দুই হতভাগার পরিবারের পক্ষে। আমার বিশ্বাস প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু কী যে খুশী হতাম এটা ভুল প্রমাণিত হলে!

অথচ আমাদের তথাকথিত নায়ক/নায়িকারা অনেক উপার্জন করে, মানুষের দারুণ পাত্তা (বা সন্মান) পেয়ে গাছেরটা খান; আবার ওদিকে অসুস্থতায়/অভাবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গরীব মানুষের ট্যাক্সের পয়সা পেয়ে তলারটাও কুড়ান। এভাবেই রাষ্ট্র ক্রমাগত প্রমাণ করে যায় সে এক শতাংশের পক্ষেই। বাঁকি নিরানব্বই শতাংশের একেবারে নীচের দিকে যারা, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনের খবর রাখা তো দূরেই থাকুক, যখন তাঁদের কেউ সত্যিকারের নায়ক হয়ে হাজির হন আমাদের সামনে, তখনও রাষ্ট্রের কিছু আসে যায় না।

কিছু খারাপ মানুষের খারাপ কাজে, আর কিছু ‘ভালো মানুষ’ এর নিষ্ক্রিয়তার ফল এমন বর্বর রাষ্ট্র। হ্যাঁ, এ আমাদের সবার পাপের ফল। আমার রাষ্ট্রকে বর্বর বলায় কি রাষ্ট্রদ্রোহীতা হয়ে গেল? মনে যে শব্দটা এসেছিল, আমি কিন্তু সেটা লিখিনি, অনেকটা মৃদু একটা শব্দ ব্যবহার করার জন্যই ‘বর্বর’ শব্দটা লিখলাম।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77