ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

এটা মোটামুটি নিশ্চিত সুমাইয়া বাঁচবেন না। উত্তরার গ্যাস দুর্ঘটনায় ছারখার হয়ে যাওয়া পরিবারটির গৃহকর্ত্রী সুমাইয়া। কাল পত্রিকায় তাঁর মুমূর্ষু অবস্থায় বলা কিছু কথা আলোচিত হয়েছে আমারদের মিডিয়ায়, এবং ‘সামাজিক’ মাধ্যমে। যদিও ওইসব মাধ্যম ভেসে গিয়েছিল বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে – মার্চ মাসে পাকিস্তানকে হারানো, প্রধানমন্ত্রীর খেলা দেখা, দলের জেতা দেখে তাঁর কেঁদে ফেলা এসব নিয়ে কত্তো মাতামাতি! দীর্ঘদিন থেকেই দেখছি ক্রিকেট-উন্মাদনা সবকিছু থেকে ফোকাস সরিয়ে নিয়ে যায় আমাদের, তাই এটাকে একটা ‘আফিম’ বলেই বিবেচনা করি আমি। এটা নিয়ে একটা পোস্টও লিখেছিলাম কিছু কাল আগে – সময় হল ‘ক্রিকেট আফিমে’ বুঁদ হয়ে দেশপ্রেমিক সাজার। আজকের বিষয় অবশ্য ভীন্ন, যাওয়া যাক সুমাইয়ার কথায়।

ওইদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “ওর বাবার (স্বামীকে বুঝিয়েছেন) কোলে পিচ্চিটা। সাততলা থেকে দৌড়ে নামছি আর চিৎকার করছি। প্রথমে চারতলা ও পরে তিনতলায় ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়লাম। ওরা দরজা খুলল। আমাগো দেইখ্যা দরজাগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। সব স্পষ্ট মনে আছে। বিল্ডিংয়ের নিচে নামলাম। দেখলাম কত মানুষ। কেউ এগিয়ে আসল না। সবাই তাকাইয়্যা রইল। পুরা কাপড় তো পুইড়্যা গেল। একটা চটের বস্তা দিয়া শরীরটা জড়াই। আল্লাহ মাফ করুন। মানুষ কত অমানবিক। বিল্ডিংয়ের মহিলারা একটা চাদরও আগাইয়্যা দিল না। বললাম আমি মহিলা; অন্তত একটা চাদর দেন। কিচ্ছু দিল না। নইলে ওদের একটা চাদর বা তোষকই পুড়ত। আমার বাচ্চারা তো বাঁচত। একটা মানুষও সাহায্য করেনি”। কী ভয়ঙ্কর হাহাকার মেশানো তাঁর শেষ বাক্যগুলো, “মানুষ এরকম হয়। এ কী রকম খারাপ। কেউ কারও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না। এটা একটা কথা”। বিস্তারিত খবর – ‘নইলে একটা চাদরই পুড়ত, আমার বাচ্চারা তো বাঁচত’

দুঃখিত সুমাইয়া, আপনার ওপর যা হয়েছে, তাতে আপনি অবাক হলেও আমি অবাক হইনি একেবারেই। আমি বিশ্বাস করি এটাই হবার কথা ছিল – এ আমার, আপনার ‘পাপ’ এর ফল।

আমার জীবনের একটি ঘটনা দেখে আসি। আমার চেহারায় ‘বড়লোক’ ভাব তো নেইই, বরং বেশ একটা গরীব ভাব আছে, কিন্তু তবুও আমি কেন যেন ছিনতাইকারীদের বেশ নিয়মিত টার্গেট – এখন পর্যন্ত পাঁচ বার ছিনতাই হয়েছে আমার। কারণটা সম্ভবত এই, আমাকে দেখলে মনে হয়, টাকা না থাকুক, অন্তত ছিনতাই এর সময় এই লোক ঝামেলা করবে না। কী সঠিক তারা!

একবারের ছিনতাই নিয়ে বলি, যেটায় আমি নিজেও অবাক হয়েছিলাম। বেশ কয়েক বছর আগে সকাল দশ টার দিকে আমার ছিনতাই হয় মৎস্য ভবন মোড়ের একটু আগে। আমার রিক্সায় একজন উঠে, বাঁকি কয়েকজন ঘিরে ধরে আমাকে ছিনতাই করলো। আশপাশে কতো মানুষ, দেখলোও বেশ ক’জন; কেউ কিছু বললো না। পরিচিত মানুষরা যখন এই ঘটনা শুনেছেন, প্রায় সবাই ক্ষোভ দেখিয়ে বলেছেন, এই দিনে-দুপুরে এমন ঘটনা অথচ একজন মানুষও এগিয়ে এলো না। আমার কিন্তু আশপাশের মানুষদের ওপর একফোঁটা ক্ষোভও হয়নি। আমার সামনে কোনোদিন ছিনতাই হতে দেখিনি, কিন্তু হলে কি আমি বাধা দিতে এগিয়ে যেতাম? সম্ভবতঃ না। তাই আমার ছিনতাই এর সময় উপস্থিত মানুষদের ওপর আমার কোন ক্ষোভ ছিল না।

কেউ কেউ বলতে পারেন, ছিনতাইকারিকে বাধা দিতে গেলে নিজের জীবনের ঝুঁকি তৈরী হতে পারে, তাই….. এর বিরুদ্ধেও শক্তিশালী যুক্তি আছে, কিন্তু তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম কথাটা। এবার তাহলে প্রশ্ন, রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত বা কোন অসুস্থতায় অজ্ঞান কোন মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তো আর যাই হোক প্রাণের ঝুঁকি নেই। কিন্তু না, এই কাজটাও করেন খুব কম মানুষই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় দেখেছি জরুরী বিভাগে অনেক বেশী মানুষ মারা যায়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আহত/অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে আনতে অনেক দেরি হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে থাকার পর একজন সত্যিকার মানুষ তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। কিছুদিন আগে ব্লগার অভিজিৎ রায় কে রাস্তায় কুপিয়ে ফেলে চলে যাবার পরও একই ঘটনা ঘটেছিল।

গায়ে আগুন জ্বলতে থাকা সুমাইয়াকে দেখেও দরজা বন্ধ করে দেয়াটাও এরকমই ব্যাপার। আজ সুমাইয়া জ্বলছেন বলে হতাশ বোধ করছেন, কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো হলে? অন্য প্রতিবেশী গায়ে আগুন নিয়ে নামছেন, সেটা দেখে সুমাইয়া কি দরজা খুলে তাঁকে বাঁচাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন? হয়তো পড়তেন, হয়তোবা পড়তেন না। পড়লে তিনি হতেন হাতে গোনা কিছু মানুষের একজন, কিন্তু এটা স্রেফ ব্যতিক্রম, সমাজের চেহারা না। এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যতিক্রম কখনো সমাজের চরিত্র ঠিক করে দেয় না।

মাঝে মাঝেই দেখি, মিডিয়ায় এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অনেক ‘সচেতন’ মানুষ সমাজের এই মর্মান্তিক পরিবর্তনে অবাক হন; আমি অবাক হই না। আমি জানি যে সমাজ উন্নতি বলতে বোঝে যেভাবেই হোক অঢেল টাকা বানানো, আলিশান গাড়ি বাড়ি করা, ইউরোপ আমেরিকায় ছুটি কাটানো; যে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা আমাদের জানান দেশ উন্নত হচ্ছে, তার প্রমাণ আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, দেশে সেতু, ফ্লাইওভার হচ্ছে, কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই সমাজে ক্রমাগত বেড়ে চলা বৈষম্য নিয়ে, সেই রাষ্ট্রে, সেই সমাজে নিরন্তর বেড়ে চলে মানুষের অবদমন, আর তাই এরকম ঘটনা একেবারেই ভবিতব্য। সাথে ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়ার’ মতো ‘সামাজিক’ মাধ্যমগুলো তো আছেই, যার মাধ্যমে আত্মকেন্দ্রীকতার (নার্সিসিজম) চর্চা হয় প্রতি মুহূর্তে। বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় আর সব প্রবৃদ্ধির মতো মানুষের আত্মকেন্দ্রীকতা, নির্মমতা, নৃশংসতার প্রবৃদ্ধি হবে আরও অনেক বেশী হারে।

আমরা ভুলে যাই, আমাদের সমাজকে ‘আমরা’র সমাজ থেকে একটা ‘আমি’র সমাজে পরিণত করেছি আমরা। এই পরিবর্তনের চাকাকে আবার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়া না গেলে কোনভাবেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব না। কীভাবে সেটা সম্ভব সেটা আরেক বিশদ আলোচনা; সেটা করা যাবে আরেকদিন।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77