ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

স্বাভাবিকভাবেই বেশ কিছুদিন ধরেই দেশবাসী মেতে আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে। এর মাঝেও দুই একটা ঘটনা আমাদের সামনে উঠে আসে, আমাদের মিডিয়া আমাদেরকে দেখায়। আমরাও আলোচনায় মেতে উঠি – আমাদেরও তো আছে (অ)সামাজিক মিডিয়া।

বলছিলাম শতাব্দীর কথা। শতাব্দী নামের মেয়েটি হঠাৎ করেই ছাপিয়ে উঠলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল চুরির ঘটনাকে – যোগাযোগ মন্ত্রীর কাছে শতাব্দী তার যাতায়াতের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করে, তার রুটে মহিলা বাস দাবী করে। আমাদের ‘ফাটাকেষ্ট’ যোগাযোগমন্ত্রী হয়ে উঠলেন সাক্ষাৎ চেরাগের দৈত্য, পরদিনই শতাব্দীর ওই রুটে পাঠিয়ে দেন মহিলা বাস (বিস্তারিত দেখুন – শতাব্দীর জন্য বাসের অপেক্ষা। মূল ধারার মিডিয়াও লুফে নেয় খবরটি, তাই আমাদের সামনে মুহূর্তেই চলে আসে সেটা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনার আলোচনা যেহেতু কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, তাই শতাব্দীর ঘটনাটা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করাই যায়। এই ঘটনায় মন্ত্রী, মিডিয়া আর আমাদের আচরণকে শুধু একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে আটকে না রেখে একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা যাক। মানুষের প্রকাশিত আচরণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা-চরিত্রের অনেক কিছুই প্রকাশ করে, এটা মনোবিজ্ঞানের স্বীকৃত সত্য।

শতাব্দীর জন্য এক দিনের নোটিশে বাস পাঠিয়ে দেয়ার পর অনিবার্যভাবে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে পারতো, কিন্তু আমরা হাততালি দিতে দিতে ভুলে গেলাম সেগুলো। বিআরটিসি’র বাস অসীম নয়, বরং সেটা চাহিদার চাইতে অনেক কম। তো যে বাসটি শতাব্দীর রুটে পাঠানো হলো, সেটা কি ডিপোতে বসে ছিল? যদি সেটা সেখানে বসে থাকে তাহলে প্রশ্ন, সেটা কেন কোন রুটে চলছিল না? বাসটি যদি অন্য রুট থেকে এনে ওই রুটে দেয়া হয়ে থাকে তাহলে প্রশ্ন, যেহেতু বাসটি অন্য রুটে চলছিল, তাই ধরেই নেয়া যায় ওই রুট বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে ওই রুটের যাত্রীদেরকে বঞ্চিত করা হল কেন? আর যদি এটা হয়, শতাব্দীর রুটটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ তবে ওই রুটে এতদিন বাস ছিল না কেন?

ওবায়দুল কাদের আপাদমস্তক একজন রাজনীতিক; স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতি করা মানুষটি এই দেশের মানুষদের মনস্তত্ত্ব চিনেছেন হাড়ে হাড়ে। তাই কাজ না হোক, রাস্তায় দৌড়-ঝাঁপ করে, রেলের কর্মচারীকে চড় মেরে, ড্রাইভারকে কান ধরে উঠবস করিয়ে বহু মানুষের বাহবা পেয়েছেন তিনি, যেমন পেলেন সেদিনও। কিন্তু তাঁর মন্ত্রণালয় আগের ‘আবুল’ মন্ত্রীর চাইতে ভালো চলছে, নিরপেক্ষ মূল্যায়নে সেটা কেউ বলবে না।

মন্ত্রী ‘ফাটাকেষ্ট’ হয়ে রাস্তায় দৌড়ঝাঁপ করছে, করুক। কিন্তু তাঁর পেছনে এত্তো টিভি ক্যামেরা আর সাংবাদিক কেন? বা তারা গেলেও এই প্রশ্ন কেন কেউ করছে না যে, এসব করে মন্ত্রণালয়ের কাজের কোন সুবিধাটা হয়?

শুধু ওবায়দুল কাদের কেন, স্ট্যান্টবাজি করছেন আজ দেশের নীচু থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সবাই – আজ বাংলাদেশে স্ট্যান্টবাজির জয়জয়কার। বলা বাহুল্য স্ট্যান্টবাজির পরিমাণ অবিশ্বাস্য পরিমাণে বেশী সেই সব পর্যায়ে, যেখানে কাজ না করে বাহবা বেশী দরকার হয়, জনগণের সম্পদ লুটপাট করে সততা-নৈতিকতার ভেক ধরতে হয়।

আমাদের মধ্যে কিছু ‘সচেতন’ নাগরিক, যারা এই স্ট্যান্টবাজি পছন্দ করেন না, স্ট্যান্টবাজদের সমালোচনা করেন। আমি কিন্তু স্ট্যান্টবাজদের সমালোচনা করি না। অর্থনীতির অত্যন্ত ব্যাসিক একটা তত্ত্ব হল, বাজারে কোন কিছুর যোগান থাকার অর্থই হচ্ছে ওটার চাহিদাও বাজারে আছে। তাই যে কেউ যখন যে কোন ধরনের স্ট্যান্টবাজি করে, তখন ওই তত্ত্ব অনুযায়ী এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, ওসব আমাদের মত বেশিরভাগ মানুষই ‘খায়’। তাই আমারই যদি খাই কোন কিছু, তো সেটা আমাদেরকে খাওয়ানো হবে না কেন? আর ওবায়দুল কাদের তো রীতিমত নজির স্থাপন করেছেন, তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ না করেও স্ট্যান্টবাজি করে দারুণ জনপ্রিয় মন্ত্রী হওয়া যায়। বলা বাহুল্য, অনাগত দিনে আরো অনেক মন্ত্রী ‘ওবায়দুল কাদের’ হয়ে উঠবেন।

এখন প্রশ্ন মিডিয়া আমাদের এসব খাওয়াতে সাহায্য করে কেন? মূলধারার মিডিয়ার মধ্যে যাঁরা নৈতিকতা খুঁজতে যান, তাদেরকে আমি স্রেফ অর্থনীতি-রাজনৈতিক জ্ঞানশূন্য মানুষ বলে মনে করি। মূলধারার মিডিয়া স্রেফ একটা ব্যবসা, তাই ওটাও আমাদেরকে সেটাই খাওয়ানোর চেষ্টা করবে যেটা আমরা বেশী খেতে চাই। বিষয়টা নিয়ে বেশ কিছুকাল আগে একটা পোস্ট লিখেছিলাম – গুড নিউজ ইজ ‘ব্যাড নিউজ’

অর্থাৎ স্ট্যান্টবাজি যাঁরা করছেন, আর যারা সেটা আমাদের সামনে নিয়ে আসছেন তাঁদের দায়ী করার আগে আমাদের উচিৎ নিজেদের দায়ী করা। আমাদের ওসব ‘খাবার’ চাহিদা না থাকলে ওসব বন্ধ হয়ে যেতোে আপনা আপনিই। তাই সবার আগে দরকার নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তোলা আর এসবকে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা। ‘শিক্ষিত’ শব্দটা সচেতনভাবেই লিখেছি। আমার চারপাশে আমি আসলেই শিক্ষিত মানুষ খুব অল্পই দেখি; দেখি স্রেফ সার্টিফিকেটধারী অসংখ্য মানুষ। দুঃখিত, সার্টিফিকেট দিয়ে শিক্ষিত হওয়া যায় না।

প্রবচন আছে, “কোন জাতি তেমন নেতাই পায়, যেমনটা তারা ডিজার্ভ করে”। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া কথাটা সত্যি। কথাটা মনে হয় মিডিয়ার ক্ষেত্রেও বলা যায়, “কোন জাতি তেমন মিডিয়াই পায়, যেমন তারা ডিজার্ভ করে”। ‘শতাব্দীর জন্য বাস’ কেইস আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে এই সত্যই দেখিয়ে দিয়ে গেল।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77