ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অস্ত্র নাকি অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু এই সরকার গত সাত বছরে একটা অস্ত্র অতি ব্যবহার করছে, কিন্তু অস্ত্রটার ধার রয়ে গেছে আগের মতোই। অস্ত্রটি হল – কোন কারণে সরকার অস্বস্তিতে পড়লে আরেকটা বড় ঘটনা ঘটিয়ে সেটাকে ধামাচাপা দেয়া, আর বড় কোন ডামাডোলের মধ্যে অন্য একটা কাজ করে নেয়া যেটা নিয়ে সরকার সমালোচনার মধ্যে পড়তে পারে।

কিছুদিন আগে নিখোঁজ হওয়া আই টি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা গতকাল রাতে বাসায় ফিরেছেন, তার চাচার কথা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে বাসায় ফিরিয়ে দিয়ে যায় (বিস্তারিত দেখুন)। একটা মানুষকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেল, কয়েকদিন তাদের জিম্মায় রাখলো, কিন্তু সেটা কেউ স্বীকার করলো না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, “তাকে গ্রেফতার করা হয়ে থাকতে পারে” (বিস্তারিত দেখুন)। কিন্তু এরপর কোন খবর নেই আর।

জোহাকে গুম করার পর নানা কুতর্ক হয়েছে মিডিয়াতে – সে আদৌ কোন আইটি বিশেষজ্ঞ কিনা, সে আদৌ সরকারের নানা সংস্থার সাথে কাজ করেছে কিনা, সেদিন সে ‘চোরের মত’ কেন বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়েছিলেন ইত্যাদি। এসব কোন প্রশ্ন নিয়ে বিতর্কের কোন প্রয়োজন দেখি না এখানে, যদিও গুম হবার আগে তিনি জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরির তদন্তে গিয়ে তিনি দেখেছেন, সেখানকার মানুষদের সম্পৃক্ততা ছাড়া এই চুরি ঘটা সম্ভব ছিল না। আর এটা বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বলার পর থেকে তিনি হুমকি পাচ্ছিলেন।

একটা কথাই আমাদের স্পষ্টভাবে বলা উচিৎ জোহা যদি কোন অপরাধও করে থাকতেন, তাহলে তাকে এভাবে গোপনে তুলে নিয়ে আটকে রাখা যায় না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রকাশ্যে থানায় ডাকা যেতো, এমনকি প্রয়োজনে গ্রেফতারও করা যেতে পারতো। কিন্তু জোহার ওপর মিডিয়ার দারুণ মনোযোগের সময় তাকে তুকে নিয়ে গিয়ে এই দেশের রাঘব-বোয়ালরা দেখিয়ে দিলো, তাদের ক্ষমতার দৌড় এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, কোন কিছুরই আর তোয়াক্কা করে না তারা।

গুম এই দেশের এক ভয়ঙ্কর ব্যাধি হয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে। বহু মানুষ গুম হয়ে যায় প্রতিনিয়ত। পরিবারের মানুষদের কাছ থেকে জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মানুষগুলোকে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আর ফিরে আসেন না তারা। আর অতি বিরল ব্যতিক্রম হয়ে কেউ যদি ফিরেও আসে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। জোহা ফিরে এসেছেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা বলে তার মুখ থেকেও বেরোবে না কোন কথা – জলে নেমে কুমিরের সাথে বিবাদে জড়ানোর মাশুল কী হতে পারে, সেটার সামান্য নমুনা তাকে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে এরই মধ্যে।

আজ “টক অব দ্য কান্ট্রি” হতে পারতো একজন মানুষ ঢাকার প্রাণকেন্দ্র থেকে গুম হয়ে যাওয়া, আর কিছুদিন পরে ফিরে আসা। মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হতে পারতো এই দেশটা ক্রমাগত মগের মুলুক হয়ে উঠছে কিনা, নাকি এর মধ্যেই এটা মগের মুলুক হয়ে গেছে। এই আলোচনাও কেউ কেউ করতে পারতো, নিজের দেশটা মগের মুলুক হওয়া আমরা মেনে নিয়েছি কিনা, বা মেনে না নিলে সেটা ঠেকানোর জন্য আমরা কিছু করতে চাই কিনা। কিন্তু না, কিছু হবে না আজ, কারণ ক্রিকেট।

টি২০ ওয়ার্ল্ড কাপে আজ ভারতের সাথে বাংলাদেশের ‘লড়াই’। দীর্ঘদিন থেকেই আমরা ক্রিকেটকে আর খেলার পর্যায়ে রাখছি না, বানিয়ে ফেলছি ‘লড়াই’, মিডিয়াও ক্রমাগত এসব শব্দ ব্যবহার করে ইন্ধন যুগিয়ে যায়। কেউ কেউ আবার এর মধ্যে আজ প্রতিশোধের গন্ধও খুঁজছেন। তাসকিন আর আরাফাত সানিকে আইসিসি নিষিদ্ধ করার জন্য ভারতীয়দেরকে দায়ী করে আজকের খেলায় তাদের হারিয়ে প্রতিশোধ নিতে চাইছেন অনেকে। তাই আজ আমাদের যাবতীয় মনোযোগ আজ খেলার দিকে। এই ডামাডোলের মধ্যে দেশে এর চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কোন ঘটনা ঘটে গেলেও আমাদের দৃষ্টি যায় না সেদিকে। আমাদের ধূর্ত সরকার এই সময়টিই ব্যবহার করেছে জোহাকে ঘরে ফেরত দেবার কাজে।

একই অস্ত্র বারংবার ব্যবহারেও ভোঁতা হয় না এই দেশে। জাতি হিসাবে আমরা কতোটা ভোঁতা হয়ে গেছি এটা সেটারই প্রমাণ। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে এই দেশ, এই সমাজ প্রতিদিন হয়ে উঠছে আরও বীভৎস, আরও অমানবিক। আমরা হয়তো বুঝতে পারি না, নয়তো মেনে নেই সব, কিংবা নিজেদের দিকে তাকাতে তাকাতে, নিজেদের আখের গোছাতে গোছাতে, নিজেদেরকে নিয়ে মগ্ন থাকতে থাকতে আমাদের আর সময় নেই সমাজ-রাষ্ট্রকে নিয়ে ভাবার। তবে আমি এটা বিলক্ষণ জানি আমাদের চরম নির্লিপ্ততায় আমরা যে সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা বানাতে দিচ্ছি সেটা খুব সহসাই হয়ে উঠবে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব । ওই দানবটা শেষে কী করেছিলো, সেই গল্পটুকু মনে হয় আমরা সবাই জানি।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77