ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আমরা কি খেয়াল করেছি আমাদের দেশে ১৫ লাখ ‘আধুনিক দাস’ আছে? আমরা কি জানি এই একবিংশ শতাব্দীতে ৭ শতাংশ জিডিপি’র দেশে উন্নয়নের প্রদীপের নীচে কী নিকষ কালো আঁধার?

জিপিএ ৫ প্রাপ্ত স্টুডেন্ট দের নিয়ে একটি টিভি চ্যানেলের রিপোর্ট গত কয়েকদিন ধরেই ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এমনকি এই মুহূর্তে ব্লগের দিকে খেয়াল করলে দেখবো বেশিরভাগ পোস্টই ওই বিষয়ের নানা দিককে তলিয়ে দেখা নিয়েই লিখিত। এটা স্বাভাবিক। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, এবং মিডিয়ার নৈতিকতা নিয়ে ‘স্বাস্থ্যকর’ একটা বিতর্ক চলেছে, চলছে মূলধারার আর সামাজিক মিডিয়ায়।

এই দেশের বেশিরভাগ মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য আছে, তারা একটা বিষয় নিয়ে মেতে উঠলে সেটার আগে বা পরে ঘটা অনেক বিষয় থেকে তার মনোযোগ সরে যায়। আমাদের বর্তমান সরকার এই কৌশল ব্যবহার করছে – একটা ঘটনা দিয়ে আরেকটা চাপা দেয়া। তবে আজ যে বিষয় নিয়ে লিখছি, সেটা ঘটেছে কো-ইন্সিডেন্টালি।

ওই ভিডিওর ডামাডোলের মধ্যেই মিডিয়ায় ছোট করে খবর এসেছে ১৫ লাখ বাংলাদেশি দাসের জীবন যাপন করছেন। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন তাদের ‘গ্লোবাল স্লেভরি ইনডেক্স’ রিপোর্টে জানিয়েছে এটা। এই অবস্থান পৃথিবীতে চতুর্থ। (বিস্তারিত দেখুন)

যারা কারখানা, খনি বা খামারে নামমাত্র মজুরিতে দাসের মতো শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন, দালালের খপ্পরে পড়ে বাধ্য হচ্ছেন যৌনকর্মীর জীবন যাপনে, এ যুগেও যাদের ঋণ শুধতে না পেরে কাটাতে হচ্ছে গোলামের জীবন, অথবা বাবা-মায়ের ঋণের দায় মাথায় নিয়ে যাদের জন্ম হচ্ছে কৃতদাসের মতো- তাদের সংখ্যা ধরেই এ সূচক তৈরির কথা জানিয়েছে ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন।

সব সরকারের সময়ই ‘উন্নয়ন’ এর ফানুস ওড়ায় স্রেফ কতগুলো অর্থনৈতিক সূচক দেখিয়ে – জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি। এটা সত্য, কিছু অর্থনৈতিক সূচকের এক রকম বৃদ্ধি ঘটছে, কিন্তু যে রকম পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমাদের বসবাস তাতে এর মূল সুফল পায় সমাজের এক শতাংশ মানুষ।

এই ব্যবস্থার প্রবক্তারা বলেন ওপরের তলার মানুষের কাছে সম্পদ ঘনীভূত হলে সেখান থেকে ‘Trickle down’ করে সমাজের গরিবের কাছেও পৌঁছবে। কিন্তু এই চুঁইয়ে পড়া সম্পদ যে অতি সামান্য বলে আদৌ কার্যকরী না, সেটা বহু আগেই প্রমাণিত। পৃথিবী জুড়ে ‘ওয়েলফেয়ার স্টেইট’ ছাড়া সব দেশেই একই চিত্র – অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল সুফলভোগী কোনভাবেই সমাজের নিচুতলার মানুষ না।

সেজন্য অনেক অর্থনীতিবিদ পুঁজিবাদী ঘরানার মধ্যে থেকেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসাবে সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলেন। অমর্ত্য সেন, জোসেফ স্টিগলিৎস, পল ক্রুগম্যানের মতো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে হালের বেস্ট সেলিং বই ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ের লেখক অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটিও সম্পদের সুষম বন্টনের কথা বলেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসাবেই।

কিন্তু না, আমাদের মতো দেশে, যেখানে প্রায় সব এমপি ই ব্যবসায়ী, সেখানে আমাদের সরকার কার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। তাই বহু বছর ক্রমাগত ৬ শতাংশ বা তার বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়েও আমাদের সামনে ১৫ লাখ আধুনিক দাসের খবর ভেসে আসে।

প্রতিবারের মতো আবারো এদেশের বাজেট দেয়া হয়েছে আজ; বলাই বাহুল্য প্রতিবারের মতো গতানুগতিক বাজেট। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নামকাওয়াস্তে কিছু বরাদ্ধ আছে এবারও। ছিল গতবারও। ১৫ লাখ দাস আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সেই বরাদ্ধ কতো অপ্রতুল, কতো হাস্যকর! যে দেশ প্রকান্ড সেতু, সড়ক, বন্দর, ফ্লাইওভার বানায় তার যথেষ্ট টাকা হয় না এই দাসদের জীবনমান উন্নয়নে সাহায্য করতে।

আমরা যারা ব্লগে লিখি, ফেইসবুকিং করি তারা বা তাদের আপনজন নিশ্চয়ই ওই ১৫ লাখের মধ্যে নেই, তাই ওই রিপোর্টে আমাদের কী ই বা আসে যায়। তাই এটা নিয়ে ফেইসবুকে, ব্লগে মাতামাতি নেই; এর ফলে ওই মানুষগুলোর জন্য কিছু করার জন্য সরকারের ওপর কোন চাপ তৈরী হয় না। প্রচন্ড চাপে না পড়ে এই দেশের সরকার সমাজের প্রান্তিক মানুষদের জন্য কোন কাজ করবে এটা প্রত্যাশা করা স্রেফ বাতুলতা।

আমি নিশ্চিতভাবেই জানি, আমাদের সরকার ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি দেখিয়ে উন্নয়নের ফুটানি করেই যাবে, আর আমরা তাতে বিমোহিত হতেই থাকবো; আমাদের খেয়ালই থাকবে না দেশে ১৫ লাখ দাসের অস্তিত্ব আছে। আমি বা আমার আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে কেউ তো নেই ওই ১৫ লাখের মধ্যে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77