ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আজ সকালে একটা মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ব্রেকিং নিউজ সেটার প্রাথমিক দুঃখবোধ ছাপিয়ে আমাকে আশাবাদীও করে তুললো। ব্রেকিং নিউজটি হলো – আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা এসপি বাবুল আখতারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মর্মান্তিকভাবে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন (বিস্তারিত পড়ুন) । নিত্যকার মতো প্রথম শ্রেণী পড়ুয়া শিশু পুত্রকে স্কুলে দিতে যাবার সময় আততায়ীরা কুপিয়ে এবং গুলি গুলি করে হত্যা করে তাঁকে। শিশু পুত্র পাশে থাকা অবস্থায় এভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ঘটনাটির মর্মান্তিকতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। কিন্তু এই মর্মান্তিক খবরও কেন আমাকে আশাবাদী করে তুললো, সেটা পরে বলছি।

আজকের এই খবর পরিবেশনের সময় এসপি বাবুল আক্তারকে নিয়ে কিছু কিছু পত্রিকা শিরোনামে ‘আলোচিত এসপি….’, ‘সেই এসপি….’ ইত্যাদি লিখেছে – এটা তাঁর পরিচিতির নির্দেশক। কেউ কেউ রিপোর্টের মধ্যেই তাঁর কর্মকান্ড নিয়ে লিখেছেন। ঘাঁটাঘাঁটি করে একটা প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পত্রিকার একটা বিস্তারিত রিপোর্ট পেলাম যেটা বাবুল আক্তারকে চিনতে সাহায্য করবে আমাদের – কী অসাধারণ সৎ, সাহসী, চৌকস পুলিশ অফিসার তিনি। (বিস্তারিত দেখুন – কেন সারা দেশে আলোচিত বাবুল আক্তার?; এসপি হলেন বাবুল আক্তার, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশ সেবার প্রত্যয়)

সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা আর সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন বলেই অল্প সময়ের এ চাকরিজীবনে একবার পুলিশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল-বিপিএম (সাহসিকতা), দু’বার প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম), একবার আইজি ব্যাজ ও চারবার চট্টগ্রাম রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার নির্বাচিত হয়েছেন বাবুল আক্তার। আমার পরিচিত পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই পদকগুলো আক্তারের কষ্টার্জিত পদক।

পুলিশকে নিয়ে আমাদের অভিযোগের কোন শেষ নেই। দেশের আর সব বিভাগ, সার্ভিস যেমনই হোক না কেন, আমরা চাই একটা অসাধারণ পুলিশ বাহিনী। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর যাবতীয় কর্মকান্ডের পেছনে যে তাকে পরিচালনাকারী সরকার দায়ী, তাই মূল দায়ভার যে সরকারকে নিতে হবে, সেটা আমাদের অনেকেরই মনে থাকে না। এই বিষয়ে আমি আগে দু’টো পোস্ট লিখেছিলাম; আগ্রহীদের জন্য লিঙ্কগুলো এখানে আবার দিলাম – পুলিশের কাছে আমার প্রত্যাশা সামান্যই, কারণ…; পুলিশের জন্য ‘অন্যের হয়ে গালি খাওয়া’ ভাতা চাই

পুলিশ বাহিনী নিয়ে আমাদের শত হতাশার গুমোট পরিস্থিতির মধ্যে বাবুল আক্তাররা আমাদের সামনে আসেন সুবাতাস হয়ে। নিত্যকার দায়িত্ব চমৎকারভাবে পালন করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের জঙ্গি দমনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ, এবং সেটাই সম্ভবত কাল হয়েছে তাঁর জন্য। জঙ্গিদের কাছ থেকে ক্রমাগত হুমকি পেয়ে আসছিলেন তিনি। এক প্রতিবেশী নারী বলেছেন তাঁর স্ত্রীও প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতার কথা বলতেন; ‘তারা’ বাসা চিনে গেছে বলে বাসা পাল্টানোর কথা ভাবতেন। তাই যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায় জঙ্গিরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

কোন কাজে কেউ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে গেলে কিছু অসৎ মানুষ সেটাকে দিয়ে উপার্জনের পথ খোঁজে। কিছু সৎ মানুষ এই হুমকির সামনে আপোষ করে, সরে আসে ঝুকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে। কিন্তু একজন বাবুল আক্তার কোনোটাই করেননি, কাজ করে গেছেন সাহস নিয়ে। আক্তারকে নিশ্চয়ই তার শত্রুও স্টুপিড বলবে না, তিনি যা করেছেন জেনেশুনেই করেছেন। জেনেশুনেই নিজের আর পরিবারের ঝুঁকি থাকার পরও মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। প্রমাণ করেছেন সাহসিকতার জন্য পাওয়া বিপিএম পুরস্কারটি সাহসিকতা দিয়েই অর্জিত, কোন তদবিরে নয়।

আক্তারের স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড এটা প্রমাণ করলো , নিজের এবং পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দেশের, দশের স্বার্থে কাজ করেন এমন পুলিশ অফিসার আমাদের দেশে আছেন – এই মৃত্যুতে শোকাহত হবার সাথে সাথে এটাই হল আমার আশাবাদী হবার কারণ। ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আক্তারের মতো পুলিশ অফিসার আমাদের পুলিশ বাহিনীতে আরও আছে। শুধু সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন করে পুলিশকে পেশাদারিত্বের সাথে নিজের মতো করে কাজ করতে দিলে তাঁরা বদলে দিতে পারেন অনেক কিছুই।

বাবুল আক্তারকে সান্ত্বনা জানাচ্ছি না আমি। স্বজন হারানোর এরকম কষ্টে কোন সান্ত্বনাই যন্ত্রণা উপশম করে না ন্যুনতমও। কামণা করি তিনি এই শোক দ্রুত সামলে উঠুন। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পরও আক্তার তাঁর কাজ থেকে সরে আসবেন না; সম্ভবত তিনি আরও বেশী উদ্যম নিয়ে কাজ করবেন। আমি এটাও কামণা করি আক্তারের জীবনে ঘটে যাওয়া বিপর্যয় তাঁর মতো অন্য অফিসারদের মনোবলে চিঁড় ধরাবে না, বরং তাঁদের আরও সাহসী করে তুলবে। স্যালুট বাবুল আক্তার।

আর মাহমুদা, বোন, মৃত্যুর ওপারের জীবনটা কেমন জানি না; জানি না আপনি কেমন আছেন। তবে আমি অনুমান করি আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়ে কষ্টের সাথে সাথে গর্বও বোধ করছেন আপনি – এমন একজন পুলিশ অফিসারের স্ত্রী আপনি যিনি এই রাষ্ট্রের মানুষের ভালোর জন্য কাজ করতে গিয়েছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। আপনার মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা আমরা দীর্ঘকাল স্মরণ করবো, আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আমরা আশাবাদী হবো, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবো। যে কারণে আপনাকে জীবন দিতে হল, আমাদের সবার চেষ্টায় কোনদিন আমরা একটা নিরাপদ, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তৈরি করতে পারবো। পারবোই।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77