ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

ব্লগের শুরুতেই এটা স্পষ্ট করে নিচ্ছি, আমি ফুটপাথে হকারদের দোকান থাকার পক্ষে নই কোনভাবেই। এই শহরে আপনি কোন বাহনে চড়ছেন, সেটা নির্ধারণ করে আপনি রাস্তায় কতোটা আরামে বসে থাকবেন, গতি না – পাবলিক বাসে হলে ঘামতে ঘামতে অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকবেন, আর এসি গাড়ি থাকলে সেটা আরামে রাস্তায় বসে থাকার নিশ্চয়তা আছে, কিন্তু সময়মত গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নেই। ঢাকা শহরের মবিলিটির এই অবস্থায় হাঁটা ছাড়া আপাতত আর কোন উপায় নেই, এটা নিশ্চিত। তাড়া থাকুক না থাকুক, জ্যাম দেখলেই আমি হাঁটা শুরু করি। ফুটপাথগুলো বেদখল হয়ে থাকায় এই হাঁটা যে কী কষ্টকর, সেটা আমি জানি। তাই আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি ফুটপাথগুলো ব্যবহৃত হওয়া উচিৎ তার মূল উদ্দেশ্যেই।

গত বেশ কিছুদিন থেকে ঢাকায় হকার উচ্ছেদ চলছে। মূল সড়ক থেকে শুরু করে পাড়ার অলিগলিতেও চলছে এই উচ্ছেদ। ওদিকে ঢাকার গুলিস্তানে তো হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পর পর দুই দিন মারাত্মক সংঘর্ষের পর একটি মার্কেট বন্ধই ঘোষণা করা হয়েছে আজ; গ্রেফতার করা হয়েছে ২০০ জনকে (বিস্তারিত দেখুন)। ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পক্ষে হলেও সেটা যে প্রক্রিয়ায় হচ্ছে সেটা মর্মান্তিক, অমানবিক, বিভৎস; তাই এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করছি আমি। অবাক হয়ে দেখি টিভি টক শোতে বা পত্রিকার কলামে কেউ এই মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলছেন না!! এমনকি ফেইসবুকেও নেই কোন উল্লেখযোগ্য আলোচনা। ‘নিচুজাত’দের কপালে এই ই তো থাকার কথা – মেনেই নিয়েছি আমরা।

বাস্তবতাটা আদৌ সুন্দর না, কিন্তু আমাদের বড় শহরগুলোর ফুটপাথগুলো দখল করে হকাররা দোকান বসাবেন, এটা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। খোঁজ নিলেই দেখা যাবে অসংখ্য মানুষ তাদের কৈশোর, যৌবন কাটিয়ে বৃদ্ধ হয়েছেন ঢাকার ফুটপাথে দোকান করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়িত এই পেশায়; আর তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন ধারণ করতে পেরেছে অন্তত আরো ৫/৬ গুণ মানুষ। ব্যবসাটা ফ্রিও করতে পারেন না। ফুটপাথে দিনপ্রতি অনেক পরিমাণ টাকা তাদের দিতে হয় – বেশ কিছুকাল আগে একটা পত্রিকা হিসেব কষে দেখিয়েছিল প্রতি বর্গফুট জায়গার জন্য ফুটপাথে যে পরিমাণ ‘ভাড়া’ দিতে হয়, সেটা ঢাকা শহরের অনেক অভিজাত মার্কেটের চাইতে বেশি। এই বিপুল টাকা প্রাথমিকভাবে ভাগ করে নেয় ক্ষমতাসীন দলের পান্ডা আর পুলিশ। আর এই খাতে প্রতিদিন যেহেতু উত্তোলিত হয় কোটি কোটি টাকা, আর মানুষের চলাচলের সমস্যা করেও যেহেতু এই ব্যবসা টিকে আছে বহু যুগ, তাই এই টাকার বখরা যে রাষ্ট্রের অনেক ওপর পর্যন্ত যায়, এটা বুঝে নিতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না।

হকার উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা অনেক দেখেছি, খেলাটা মাঝে মাঝেই হয়। উচ্ছেদ হবে তারা, আবার কয়েকদিন পরে এসে বসবে, মাঝ থেকে গরীব মানুষগুলোর মোটা কিছু টাকা খসবে, যেটা আবার নতুন করে বসার ‘পজেশন ফি’। আমি এটা বলছি না, এবারও একই খেলা হচ্ছে, আলোচনার সুবিধার্থে ধরেই নিলাম এবারের উচ্ছেদ ‘সহি নিয়তে’ – ফুটপাথ চিরকালের জন্য দখলমুক্ত করার জন্যই করা হচ্ছে। কিন্তু এটা কি যৌক্তিক? মানবিক? কখনোই না।

আসুন একটা বিড়ালের কথা ভাবি। একেবারে শিশু অবস্থায় ওটাকে আপনি রাস্তায় দেখে মায়ায় পড়ে গিয়ে বাসায় নিয়ে আসেন। বিড়ালটা আপনার বাসায় বড় হয়ে ওঠে দিনে দিনে; নিজেদের জন্য খাবারের পাশাপাশি ওর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন আপনি। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই দেখেন, ওটা আপনার শখের সব জিনিসপত্রে মল-মূত্র ত্যাগ করে নষ্ট করছে। বাসায় এসবের পেছনে সময় দিতে দিতে আপনি ক্লান্ত, বিরক্ত। তাই কষ্ট বোধ করলেও একদিন বিড়ালটাকে অনেক দূরে ছেড়ে দিয়ে এলেন।

আপনি ওটাকে বাসায় এনে, পুষে যতোটা মানবিক কাজ করেছেন, এভাবে বাইরে ছেড়ে দিয়ে এসে তার কয়েকগুন অমানবিক কাজ করেছেন। কারণ বাসায় পুষে, খাইয়ে বিড়ালটাকে বাইরে থেকে খাবার খোঁজা শিখতে দেননি আপনি। এখন ছেড়ে দিয়ে তার খাবার প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা তৈরী করলেন। খাবার পেলেও ওই ডাস্টবিনের খাবার তার মুখে রুচবে না সম্ভবত। তাই ওই বিড়ালের জীবন শঙ্কা তৈরী করলেন আপনি। ও নিজে আসেনি, ওকে কিন্তু আপনি নিজে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। আপনি বাসায় নিয়ে না আসলে কিন্তু সে ডাস্টবিনের খাবার কীভাবে খুঁজতে হয় সেটা শিখতো, ওইসব ‘কুখাদ্য’ খেয়ে বেঁচে থাকায় অভ্যস্ত হতো।

এই বিড়ালের মতো আচরণই করছি আমারা আমাদের হকার ভাইদের সাথে। অবৈধ হলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালীরা তাদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে তাদের এই ব্যবসা করতে দিয়েছে, তাই অসংখ্য দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্ভর করে এই ব্যবসার ওপর। এইভাবে জীবিকা অর্জন করায় তারা অভ্যস্ত, এই পরিমাণ উপার্জনের ওপর তাদের পরিবারের ন্যুনতম প্রয়োজন মেটানো নির্ভর করে। এখন তাদেরকে হঠাৎ উচ্ছেদ করে অসংখ্য মানুষের জীবনের এই অনিশ্চয়তা তৈরী করাটা কি ভয়ঙ্কর নৃশংসতা না? এরা কি এই দেশের নাগরিক না? টাকা খেয়ে অবৈধভাবে এদেরকে ফুটপাথে বসতে না দিলে কি ওরা নয় কোন উপায়ে জীবিকা অর্জন করতো না? উচ্ছেদ করার আগে কি সেই সময়টুকু তাদের দেয়া উচিৎ না?

সিটি কর্পোরেশন যদি সত্যিই চায় ফুটপাথ হকার মুক্ত হবে তাহলে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে পারতো এক বছর বা ন্যূনতম ছয় মাস সময় পর নির্দিষ্ট দিন থেকে কেউ আর ফুটপাথে বসতে পারবে না। আর এই আল্টিমেটাম যে কথার কথা না, সেটা প্রতি মাসে নিয়মিত প্রচার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করা যেতো। এর এই সময়ে এই মানুষগুলো যেমন নিজের চিন্তা করতে পারতো, সাথে সরকারেরও উচিৎ হতো এদেরকে পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া। এটা হলে এই উচ্ছেদ অনেকটাই মানবিক চেহারা পেতো। কিন্তু রাষ্ট্র এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লাঠি, টিয়ার গ্যাস, আর রাবার বুলেট নিয়ে।

অবশ্য হকার পুনর্বাসনের জন্য যতো ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন, সেটা টোটকা হিসাবেই থেকে যাবে যতদিন আমরা ভাববো না কেন এরা ঢাকায় ছুটে আসে। চরম কেন্দ্রীভূত একটা শহরের কপালে কি এই থাকারই কথা না? সতের কোটি মানুষের দেশে ঢাকার মতো কয়েকটি শহর নেই কেন? গ্রামীন অর্থনীতির অবস্থা কি যথেষ্ট সন্তোষজনক? গ্রামে কেন উপার্জন হয় ঢাকার অর্ধেক? সবকিছু মিলিয়ে সে আরেক বিশাল আলোচনা। করা যাবে আরেকদিন।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77