ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দীর্ঘকাল থেকেই পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কাউকে যদি কোনভাবে চুরি, ডাকাতি বা পকেটমারির মতো কোন অপরাধের সময় হাতে নাতে ধরে ফেলা যায়, তাহলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা আমাদের ‘নৈতিক’ এমনকি ‘আইনগত’ অধিকার বলেই আমরা বেশিরভাগ মানুষ মনে করি। ‘আইনগত’ অধিকার এজন্য বলছি, সাধারণ মানুষ তো এসব মৃত্যুতে উচ্চবাচ্চ করেই না, কোনোদিনও দেখিনি একটা পিটিয়ে মারার ঘটনায় আমাদের পুলিশ সিরিয়াসলি তদন্ত করছে বা মামলা করছে।

অবশ্য কয়েক বছর আগে শবে বরাতের রাতে গাবতলীতে ছয় তরুণকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় বেশ উচ্চবাচ্চ হয়েছিল, কারণ ওরা অপরাধী ছিল না। মিডিয়াও ছিল দারুণ সরব। কিন্তু পিটিয়ে মেরে ফেলা মানুষটি যদি হয় কোন অপরাধে অভিযুক্ত, তাহলে সেটা পত্রিকায় আসে খুব ছোট, গুরুত্বহীন একটা খবর হিসাবেই। কোনোদিন কোন পত্রিকাকে দেখিনি পিটিয়ে মারার এই চর্চার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। কোনোদিন কোন টক শো’তে দেখিনি কোন ‘বিজ্ঞ’ আলোচক এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, বিচার চাইছেন। একজন অপরাধীর নাম কী অবলীলায় মানুষের তালিকা থেকে কেটে দেয় আমরা! তাই ওদের মানবাধিকারের ব্যাপারে কথা বলার কেউ নেই! এর ফল ফলতে শুরু করেছে।

জঙ্গি দমনে পুলিশ সাধারণ জনগণের হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দিচ্ছে বেশ কিছুদিন হলো। যতোই ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এর পোশাক এর গায়ে চড়ানো হোক, শুরু থেকেই এই উদ্যোগের নানা সমালোচনা হচ্ছে নানা মহল থেকে। এই লাঠি-বাঁশি মূল উদ্দেশ্য সাধনে কতটা কাজ করবে, বা এই লাঠি-বাঁশি প্রাপ্তরা সেটাকে অন্য কী কী কাজে ব্যবহার করবে সেটাও এক বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। সেটা এই ব্লগের আলোচ্য বিষয় না। আলোচ্য বিষয় হলো, আম জনতার হাতে এই লাঠি-বাঁশি তুলে দিতে গিয়ে পুলিশের উঁচু কর্তাদের কিছু মন্তব্য।

প্রথম ঘটনা কয়েকদিন আগের, হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দেবার অনুষ্ঠানে মেহেরপুর জেলার পুলিশ সুপার বলেন, ‘মেহেরপুর জেলায় কোনো সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না। আপনাদের পাহারারত অবস্থায় কোনো সন্ত্রাসীকে যদি হাতে পেয়ে যান, তাহলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবেন। এর জন্য আপনাদের কোনো হয়রানীর শিকার হতে হবে না’। (বিস্তারিত দেখুন)।

কালকের খবরে দেখা যায়, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মানুষের হাতে লাঠি-বাঁশি তুলে দেবার অনুষ্ঠানে বলেন, ‘কয়েকজন সন্ত্রাসী মারা গেলে দেশের কিছুই ক্ষতি হবে না। সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী জন্ম দেয়। তারা কখনও ভালো হতে পারে না। সন্ত্রাসী দমনে আপনাদেরই ভূমিকা নিতে হবে। এ কাজে পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা করবে’। (বিস্তারিত দেখুন)। এসপি সাহেবের মতো সরাসরি পিটিয়ে মেরে ফেলার কথা না বললেও, সাধারণ কান্ডজ্ঞানেই এটা বোঝা যায়, ডিআইজি সাহেবও মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পরামর্শই দিচ্ছেন।

পরবর্তী আলোচনার আগে একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আপনি কাউকে খুব অপছন্দ করেন, কিন্তু সামনাসামনি তাকে সেরকম আচরণ দেখান না, ভালো আচরণ করেন, যাতে মনে না হয় আপনি তাকে অপছন্দ করেন। একদিক থেকে দেখলে এটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে বলাই যায় ওই মানুষটিকে আপনি পছন্দ না করলেও অন্তত কেয়ার করেন। পিটিয়ে মারা নিয়ে পুলিশের অবস্থান আমরা জানি; শুরুতেই বলেছি, কোন একটা ঘটনায় কোন উল্লেখযোগ্য পুলিশি একশন আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু এতোদিন পুলিশকে দেখিনি এমন প্রকাশ্য আহ্বান জানাতে, মানে পুলিশ দেশের মানুষকে বা আইন ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও কেয়ার করতো। আজ যখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাও না, সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা এমন আহ্বান জানান, তখন বোঝা যায় তাঁরা কতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আদৌ কেয়ার করছেন না তাঁরা।

একটা সহজ অঙ্ক বলে দেয় সহকর্মী বাবুল আক্তারের স্ত্রীর খুন হওয়া পুলিশকে এতোটা বেপরোয়া করে তুলেছে। ওই ঘটনার পর ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের নামে অনেকগুলো খুন করা হয়েছে, আর এখন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে পিটিয়ে মানুষ খুন করতে!

যে কোন বিচারেই বাবুল আক্তারের স্ত্রীর খুন হওয়া একটা অমানবিক ঘটনা, যেটা দেশের সব মানুষের মতো আমাকেও স্পর্শ করেছে, ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। সেটা নিয়ে আমি লিখেছিও – এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ায় যে কারণে আশাবাদী আমি। কিন্তু এর মানে এই নয় একটা পেশাদার বাহিনী আবেগের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে, এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো করে নিয়ে যাচ্ছেতাই করবেন, আর মানুষকে যাচ্ছেতাই করতে বলবেন। এমনকি এসব কথা কোন ‘রক্ত গরম’ জুনিয়র অফিসার বলছেন না, বলছেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ম্যাচিওরড পুলিশ কর্মকর্তারা।

আর নিজেদের ওপর হামলার কারণে যদি পুলিশ এসব করার বৈধতা পেয়ে যায়, তাহলে তো নানা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এসেই যায় এসব ঘটনার পর, বাবুল আক্তারের স্ত্রীর মৃত্যুর আগে আরও ৪৭ টি কুপিয়ে খুন হয়েছে এই দেশে। তখন তো পুলিশকে এতোটা দৃশ্যমান একশনে যেতে দেখা যায়নি, এখন নিজেদের মানুষের মৃত্যুই কি তাহলে….। যাক সে আরেক আলোচনা; থাকুক এখন।

এই পিটিয়ে মারার আহ্বান কি এই দেশের প্রশাসনযন্ত্রের চরিত্রের অবনমনের খুব শক্ত প্রমাণ নয়? কিন্তু আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখি, সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের এমন সব আহ্বানে কোন বড় আলোচনা, প্রতিবাদ নেই কোন ফোরামে! অনেক সময় পত্রিকায় দেখি আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক খবর দেখে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমটো) রুল দেন। এই খবর কি চোখে পড়েনি কোন বিচারপতির? বা কোন আইনজীবী কি এটা বিচারপতিদের গোচরে আনতে পারলেন না? কোন সুয়োমটো নেই কেন? কী করছে আমাদের মানবাধিকার সংস্থাগুলো?

কোথায় যাচ্ছে এই রাষ্ট্র?

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77