ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

যেদিন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ ছিল এসপি বাবুল আক্তারকে পুলিশ ‘তুলে’ নিয়ে গেছে, সেদিন তাঁকে নিয়ে বাংলানিউজ২৪ আর বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিপোর্টটি নিয়ে বহু সচেতন মানুষ ওই পোর্টাল আর পত্রিকাটিকে তুলোধুনো করেছিল। মানি, বাবুলের স্ত্রীর চরিত্রের ওপর যে কালিমা লেপন করা হয়েছে সেটা ঘোর অন্যায়, কিন্তু পুলিশের এসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই ধরণের খবর কি কোন শক্ত সূত্র ছাড়া প্রকাশ করা সম্ভব? ওই পত্রিকা আর নিউজ পোর্টালের না জানার কোন কারণ নেই, বাবুল আক্তারের স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের সাথে পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তো বটেই, সারা দেশের মানুষদের আবেগও জড়িয়ে গিয়েছিল।

ওই পত্রিকার কথা বাদ দেই। অত্যন্ত দায়িত্বশীল অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ২৪ ওইদিনই যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, বাবুল গ্রেফতার হয়েছেন কিনা তার জবাবে তিনি বলেন, “এখনও বলার সময় হয়নি। শিগগিরই জানতে পারবেন।” (বিস্তারিত পড়ুন)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কথায় আমরা কী ইঙ্গিত পাই? আর এসপি পদমর্যাদার একজন মানুষকে রাত একটায় তুলে নিয়ে যাওয়া, তারপর পরিবারের সাথে দীর্ঘ ১৫ ঘন্টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে জিজ্ঞাসাবাদ, এসবের ইঙ্গিত বুঝতে শার্লক হোমস হওয়া লাগে না।

ঐদিন জিজ্ঞাসাবাদের পর বাসায় ফেরার পর থেকে বাবুল অফিসে যাচ্ছেন না, তিনি ছুটিও নেননি। বিডিনিউজ২৪ এর এই রিপোর্টে (বাবুল আক্তারের শ্বশুর ধন্দে) দেখা যায়, বাবুলের শ্বশুর বলছেন, “ডিবি অফিস থেকে ফেরার পর বাবুল একদিনও বাসার বাইরে যাননি। তাকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে। কারও সঙ্গে সে কথা বলে না। শুধু একটা ঘরে থাকে।” এমনকি তাঁর বাড়ির সামনে সবসময় ছয় জন পুলিশ থাকছে কেন সেটা নিয়ে তিনি এখন সন্দিহান – নিরাপত্তার জন্য, নাকি নজরদারী।

আর এখন তো দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিক ওই ঘটনা নিয়ে এমন সব রিপোর্ট প্রকাশ করছে, যাতে বাবুল আক্তারকেই মূল সন্দেহভাজন হিসাবে দেখানো হচ্ছে। এরকম কিছু রিপোর্ট চাইলে চোখ বুলিয়ে নেয়া যায়, যেগুলো দায়িত্বশীল পত্রিকা হিসাবে স্বীকৃত – ১. কার নির্দেশে খুন, জেনেও বলছে না পুলিশ; ২. বাবুল চাকরিতে ফিরছেন না?; ৩. কেন এত গোপনীয়তা

ফেইসবুকে এখন দেখছি কিছু মানুষ এই পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধেও নানা কথা লিখছে। আমরা বীরের পূজা করি, এটাই সমস্যা। না, আমি এটা মোটেও বলতে চাইছি না, বাবুলই নিশ্চিতভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। আবার এটাও মনে করি না, একজন পুলিশ কর্মকর্তা জঙ্গি, চোরাচালানী আর মাদক ব্যবসায়ী দমনে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখলেই তিনি দেবতা হয়ে যান, তিনি আর কোনোভাবেই তার স্ত্রীকে খুন করাতে পারেন না। তিনি পারেন, এবং এখন আমার কাছে অন্তত সেই সম্ভাবনাই অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে।

এতোক্ষণের আলোচনায় হয়তো এটা মনে হচ্ছে বাবুল আক্তার খুনটা করিয়েছেন কিনা সেটাই এই ব্লগের আলোচনার বিষয়বস্তু। না, আসলে সেটা বিষয়বস্তু নয়। প্রথম আলো’র একটা রিপোর্টে (বিস্তারিত পড়ুন) দেখা যায়, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তাদের কয়েকজন প্রথম আলো’কে বলেছেন, গ্রেফতারকৃত ভাড়াটে খুনিদের কাছে এমন সব বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে, সেটা প্রকাশ করতে পুলিশের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে, কারন এর সাথে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন নাকি জড়িত। কেউ কেউ এটাও জানাচ্ছেন, ওই ভাবমূর্তির কারণেই নাকি এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নাকি ভাড়াটে খুনি পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়ে যাবে। এই ইঙ্গিত এর মানে বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না।

পরবর্তী আলোচনার সুবিধার জন্য ধরে নেই বাবুল আক্তারই ভাড়াটে খুনি দিয়ে ওই হত্যাকান্ড করিয়েছেন। আমি তো এটাকে পুলিশের একটা অসাধারণ তদন্ত বলে মনে করবো, যার জন্য পুলিশকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাবো। আর এটা প্রকাশ করায় পুলিশের ভাবমূর্তির সমস্যা হবে কেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না আমার স্বল্পজ্ঞানে।

প্রশ্ন হলো এই দেশে পুলিশের কি দেবতুল্য কোন ভাবমূর্তি আছে? উত্তর হলো – না। অনেক মানুষের কাছে তো পুলিশের ভাবমূর্তি রীতিমত শয়তানতুল্য। আমি অবশ্য পুলিশকে কোনভাবেই দেবতা বা শয়তান মনে করি না। এই সমাজের মানুষ যখন পুলিশ বাহিনীতে যায়, তখন সে এই সমাজ থেকে অর্জিত ভালো-মন্দ সবকিছু নিয়েই যায়। তাই পুলিশের ভালো কাজও আছে, আছে খারাপ কাজও। এটা নিয়ে আমি লিখেছিও – সমাজের সার্বিক নৈতিকতার মান উন্নত না করে শুধু পুলিশ বাহিনীর নৈতিকতা উন্নত হবে, এমন আশা করা স্রেফ আহাম্মকি।

তো সমাজের মানুষের কাছে পুলিশের দেবতুল্য ভাবমূর্তি যদি না ই থাকে তো কিসের ভাবমূর্তি নষ্ট হবার ভয় করছেন তাঁরা? আর দেবতুল্য ভাবমূর্তি যদি তাদের থাকতোও তাহলেও কি এই ঘটনায় বাবুল আক্তারের সম্পৃক্তি পুলিশের ভাবমূর্তি একটুও ক্ষতিগ্রস্ত করতো? আমি সেটা মনে করি না, বরং সেটা পুলিশের ভাবমূর্তি আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারতো বলেই আমার বিশ্বাস। দেশের মানুষ একজন ব্যক্তির অপরাধ পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর নিশ্চয়ই চাপিয়ে দিতো না। বরং মানুষ এটা দেখতো, পুলিশ তাদের নিজ বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অপরাধকেও ছাড় দেয়নি।

দুঃখজনকভাবে দেখছি পুলিশ এই সুযোগটা গ্রহণ করলো না। একজন খুনীকে (যদি তিনি সত্যিই সেটা হয়ে থাকেন) তারা বাঁচিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন! শধুমাত্র পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হবার কারণে এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও শুধু চাকুরী থেকে সরে যাবার শর্তে (প্রথম আলো পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী) কেউ পুলিশের হাত থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে এটা পুলিশের প্রতি মানুষের অনাস্থাই বাড়াবে শুধু। কেউ কি ভেবে দেখেছেন, একজন হত্যাকারীকে কেউ কি কোনোভাবে এমন অপশন দিতে পারে? এটা কতবড় বেআইনী কাজ! তথাকথিত ভাবমূর্তি রক্ষা করার নামে পুলিশ যা করছে, তাতে তাদের ভাবমূর্তি যে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটা আমার মতো একজন স্বল্প বিদ্যা-বুদ্ধির মানুষ বুঝলেও, এতো বড় বাহিনীর এতো জ্ঞানী-গুণীরা সেটা বুঝতে পারছেন না?

পুনশ্চঃ এই পোস্টের অনুকরণে আরেকটা পোস্ট লিখেই ফেলা যায়, যেখানে পুলিশের জায়গায় থাকবে আরেকটা বাহিনী, আর খুন হওয়া মানুষটির নাম সোহাগী জাহান তনু, আর ভাবমূর্তিভীতি থাকবে কমন।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77